চীন ছাড়লেন ট্রাম্প অর্জন শূন্য

প্রতিদিন ডেস্ক

তিন দিনের চীন সফর শেষে গতকাল বেইজিং ছেড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ সফরের মধ্য দিয়ে তিনি কী অর্জন করলেন তা নিয়ে এখন সারা বিশ্বে চলছে নানা বিশ্লেষণ। তবে বেশির ভাগ পর্যবেক্ষকই বলছেন, ট্রাম্প চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকলেও বাস্তব অর্জন হয়েছে ‘যৎসামান্যই’। সূত্র : রয়টার্স। বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, ২০১৭ সালের পর এই প্রথম কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট চীন সফর করলেন। ওয়াশিংটনের প্রধান কৌশলগত ও অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বেইজিংয়ের সঙ্গে বৈঠক থেকে ট্রাম্প তাৎক্ষণিক সাফল্য আশা করেছিলেন, বিশেষ করে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে নিজের কমে যাওয়া জনপ্রিয়তা বাড়াতে চেয়েছিলেন। এ কারণে পুরো সফরে তিনি অস্বাভাবিকভাবে সংযত ছিলেন এবং তার বেশির ভাগ মন্তব্যই ছিল শি জিনপিংয়ের ব্যক্তিত্ব ও আতিথেয়তার প্রশংসা ঘিরে। বিশ্লেষকদের মতে, অ্যাপল, এনভিডিয়া, বোয়িং, অ্যাক্সনমবিল, সিটিগ্রুপ, টেসলা, মেটা ইত্যাদির মতো বহু প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহীরা ট্রাম্পের সফরসঙ্গী ছিলেন। সফরের আগে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল যে, এটি ‘চীনকে আরও উন্মুক্ত করার’ একটি বড় সুযোগ হতে পারে। কিন্তু সফর শেষে দেখা গেল, প্রত্যাশিত বড় কোনো বাণিজ্যচুক্তি হয়নি, নতুন শুল্ক সমঝোতা হয়নি, প্রযুক্তি নিষেধাজ্ঞা শিথিল হয়নি, এমনকি দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক কাঠামোগত বিরোধেরও দৃশ্যমান সমাধান আসেনি। ফলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের বড় একটি অংশ এখন প্রশ্ন তুলছেন ট্রাম্পের এই সফর কি শেষ পর্যন্ত ‘যত গর্জে তত বর্ষে না’ এর উদাহরণ হয়ে গেল? অনেকে মনে করেছিলেন, অর্থনৈতিক ধীরগতির কারণে চীন এবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বড় চুক্তিতে আগ্রহী হবে। কিন্তু বাস্তবে বেইজিং অনেক বেশি সতর্ক অবস্থানে ছিল। অর্থাৎ এই সফরের আগে যে ধরনের ‘মেগা ডিল’ নিয়ে আলোচনা চলছিল, বাস্তবে তার বড় অংশ অধরাই রয়ে গেল।

ট্রাম্পের সফরের আরেকটি বড় প্রেক্ষাপট ছিল ইরান সংকট। যুক্তরাষ্ট্র চাইছিল, চীন যেন তেহরানের ওপর প্রভাব খাটিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করতে সাহায্য করে। কিন্তু বিশ্লেষকেরা বলছেন, চীন এ ক্ষেত্রে খুব সীমিত সহযোগিতার কথা বলেছে। কারণ ইরান মধ্যপ্রাচ্যে বেইজিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। চীন একদিকে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা চায়, অন্যদিকে তারা ইরানের সঙ্গে সম্পর্কও নষ্ট করতে চায় না। ফলে ইরান প্রশ্নেও ট্রাম্পের এই সফর থেকে নাটকীয় কোনো অগ্রগতি আসেনি। এ বিষয়ে ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ প্যাট্রিসিয়া কিম বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে ইরান নিয়ে চীনের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট কোনো পদক্ষেপের প্রতিশ্রুতি আসেনি।’ আবার বোয়িং চুক্তির ব্যাপারেও প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। ট্রাম্প দাবি করেন, চীন ২০০টি বোয়িং বিমান কেনার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। তবে বাজারে প্রত্যাশিত প্রায় ৫০০ বিমানের চুক্তির তুলনায় এটি অনেক কম হওয়ায় বোয়িংয়ের শেয়ার ৪ শতাংশের বেশি পড়ে যায়। এ ছাড়া কৃষিপণ্য বিক্রি ও ভবিষ্যৎ বাণিজ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে কিছু অগ্রগতির কথা বলা হলেও বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। চীনে এনভিডিয়ার উন্নত ‘এইচ২০০’ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চিপ বিক্রির বিষয়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি বলেও ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, যদিও প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং শেষ মুহূর্তে সফরে যোগ দিয়েছিলেন।

বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিরল খনিজ রপ্তানি নিয়েও অচলাবস্থা কাটেনি। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের জবাবে চীন গুরুত্বপূর্ণ বিরল খনিজের ওপর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছিল। এতে মার্কিন চিপ নির্মাতা ও মহাকাশ শিল্পে সংকট তৈরি হয়। চলতি বছরের শেষ দিকে এই বাণিজ্যিক যুদ্ধবিরতি বাড়ানো হবে কি না, সেটিও এখনো নির্ধারিত হয়নি বলে জানান যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার।

সূত্র মতে, তাইওয়ান ইস্যুতে শি জিনপিংয়ের সতর্কবার্তা সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে দেখা হচ্ছে। চীনের উপকূল থেকে মাত্র ৮০ কিলোমিটার দূরের স্বশাসিত দ্বীপ তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ড দাবি করে বেইজিং। প্রয়োজনে সামরিক শক্তি ব্যবহারের হুমকিও দিয়ে আসছে তারা। এই জায়গা থেকে চীনকে সরানো যায়নি। বিশ্লেষকদের মতে, এবারের এ সফরের মূল অর্জন সম্ভবত গত অক্টোবরে ?দুই নেতার শেষ সাক্ষাতে হওয়া ‘ভঙ্গুর’ বাণিজ্য যুদ্ধবিরতি বহাল থাকা। ওই চুক্তির কল্যাণে ট্রাম্প চীনা পণ্য আমদানিতে তিন অঙ্কের ঘরে থাকা শুল্ক স্থগিত রাখতে রাজি হন, অন্যদিকে শিও বিরল খনিজ সরবরাহে বাধা কঠোর করার পথ থেকে সরে আসেন। ওই চুক্তির মেয়াদ এ বছরের পরের দিকে শেষ হওয়ার কথা; মেয়াদ বাড়বে কি না- সে বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে ব্লুমবার্গ টিভিকে বলেছেন সফরে ট্রাম্পের সঙ্গী হওয়া মার্কিন বাণিজ্য দূত জেমিসন গ্রির। সব মিলিয়ে দুই নেতা খুব বেশি চুক্তিতে উপনীত না হলেও উভয়েই সম্পর্কের ‘স্থিতিশীল ভিত্তি’ নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন; শি একে ‘বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ’ সম্পর্ক হিসেবে অভিহিতও করেছেন।

বিশ্লেষকদের হিসাব অনুযায়ী, ট্রাম্পের এই সফরকে পুরোপুরি ব্যর্থ বলা যাচ্ছে না। কয়েকটি ক্ষেত্রে সফরটি ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছে। প্রথমত, দুই দেশ অন্তত সরাসরি সংলাপ চালিয়ে যেতে রাজি হয়েছে। দ্বিতীয়ত, বাণিজ্যযুদ্ধ আরও বড় সংঘাতে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি আপাতত কমেছে। তৃতীয়ত, ব্যবসায়ী মহলে একটি বার্তা গেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন পুরোপুরি অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার পথে যাচ্ছে না। এ ছাড়া, সম্ভাব্য জ্বালানি আমদানি, বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ ক্রয় এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ ফোরাম গঠনের আলোচনা ভবিষ্যতের জন্য একটি ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

ইরান নিয়ে ধৈর্য হারাচ্ছেন ট্রাম্প : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরান ইস্যুতে তিনি ধৈর্য হারাচ্ছেন। গত বৃহস্পতিবার চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে ইরান যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা ও ইরানি বাহিনীর আরব আমিরাত উপকূলের কাছে একটি জাহাজের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার খবর প্রকাশের পর তিনি এ মন্তব্য করেন। শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক শেষে ফক্স নিউজের হ্যানিটি শোতে একটি সাক্ষাৎকার দেন ট্রাম্প। বৃহস্পতিবার সাক্ষাৎকারটি সম্প্রচার হয়। সেখানে ট্রাম্প ইরানকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আমি আর বেশি ধৈর্য ধরব না। তাদের একটি চুক্তিতে আসা উচিত।’ ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের গোপন মজুত হস্তান্তরের বিষয়ে ট্রাম্প বলেন, ‘আসলে জনসংযোগ ছাড়া এটি খুব প্রয়োজনীয় বলে মনে করি না। তবে এটি আমাদের হাতে থাকলে স্বস্তি বোধ করব।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights