চীন পারেনি, তবে যেভাবে পারল দক্ষিণ কোরিয়া
অনলাইন ডেস্ক
বিয়ে নিয়ে অনাগ্রহ, সন্তান নেওয়ায় অনীহা, দ্রুত কমতে থাকা জনসংখ্যা। দীর্ঘদিন ধরে এমন বাস্তবতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছিল দক্ষিণ কোরিয়া। কিন্তু সব হিসাব পাল্টে দিয়ে গত বছর দেশটিতে জন্মহারে দেখা গেছে অপ্রত্যাশিত উত্থান। টানা পতনের পর এই পরিবর্তন নিয়ে এখন আলোচনা দেশজুড়ে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় ২০২৪ সালে জন্ম নিয়েছে ২ লাখ ৫৪ হাজার ৫০০ শিশু। আগের বছরের তুলনায় যা ৬ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি। ২০০৭ সালের পর এক বছরে শিশু জন্মের ক্ষেত্রে এটিই সর্বোচ্চ বৃদ্ধির হার। দেশটির তথ্য ও পরিসংখ্যান মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক হিসাবে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটির টোটাল ফার্টিলিটি রেট বা প্রজনন হার ০.৭৫ থেকে বেড়ে ০.৮০ এ দাঁড়িয়েছে। চার বছর পর আবারও প্রজনন হার ০.৮ এর ঘরে ফিরল। প্রায় এক দশকের টানা পতনের পর টানা দুই বছর জন্মহার বাড়ল।
জনসংখ্যাবিদেরা বলছেন, ১৯৯১ থেকে ১৯৯৫ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া ইকো বুম প্রজন্ম এখন ত্রিশের কোঠায়। সন্তান ধারণের জন্য এ সময়কে উপযুক্ত ধরা হয়। বেবি বুমার প্রজন্মের সন্তানদেরই ইকো বুমার বলা হয়।
করোনা মহামারির সময় দীর্ঘদিন বিয়ে কমে গিয়েছিল। আর্থিক অস্থিরতাও প্রভাব ফেলেছিল। এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ায় বিয়ে বাড়ছে। বিয়ের দুই বছরের মধ্যে সন্তান নেওয়ার প্রবণতাও বেড়েছে।
বিয়ে ও সন্তান জন্মদানে সরকারের নগদ অর্থ সহায়তা, আবাসন ভর্তুকি, বর্ধিত মাতৃত্বকালীন ছুটি ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পরিসংখ্যান বলছে, মায়েদের গড় বয়স বেড়ে ৩৩.৮ বছর হয়েছে। গত বছর জন্ম নেওয়া শিশুদের এক তৃতীয়াংশের মায়ের বয়স ৩৫ বা তার বেশি।
লি সু মিন বলেন, নিজেদের গুছিয়ে নিয়ে পরে সন্তান নিতে চেয়েছিলেন। সরকারি সুবিধার কারণে তিনি ছয় বছরের মাতৃত্বকালীন ছুটি নিতে পারছেন। তার স্বামী এক বছরের পিতৃত্বকালীন ছুটি ভোগ করেছেন। তার মতে, আগের তুলনায় ব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় সন্তান লালন পালনের চাপ কম মনে হয়।
তবে উন্নতির পরও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রজনন হার এখনো অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা ওইসিডি দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন। একটি দেশের জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখতে যেখানে ২.১ হার প্রয়োজন, দক্ষিণ কোরিয়া এখনো অনেক দূরে। জন্মের চেয়ে মৃত্যুর হার বেশি হওয়ায় মোট জনসংখ্যা কমছেই।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এই উত্থান সাময়িক হতে পারে। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি পর জন্ম নেওয়া প্রজন্ম সন্তান ধারণের বয়সে এলে সংখ্যা আবার কমে যেতে পারে।
কোরিয়া ইনস্টিটিউট ফর হেলথ অ্যান্ড সোশ্যাল অ্যাফেয়ার্সের গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জন্মবৃদ্ধির পেছনে কেবল জনসংখ্যার আকার নয়, আচরণগত পরিবর্তন বড় ভূমিকা রেখেছে। ত্রিশোর্ধ্ব নারীদের গর্ভে অতিরিক্ত ১০ হাজার ৯২৪টি জন্মের মাত্র ৩ দশমিক ২ শতাংশ বয়সী নারীর সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে। বাকি ৯৬ দশমিক ৮ শতাংশই সন্তান নেওয়ার আগ্রহ বাড়ার ফল।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, দম্পতিদের মধ্যে হয় শূন্য নয় দুই মানসিকতা কাজ করছে। যারা সন্তান নিচ্ছেন, তারা একটিতে সীমাবদ্ধ না থেকে দুটি নিচ্ছেন। ২০১৫ সালে প্রায় ১ লাখ ৬৬ হাজার দ্বিতীয় সন্তান জন্ম নিলেও ২০২৩ সালে তা নেমে আসে ৭৪ হাজারে। ২০২৪ সালে বেড়ে হয়েছে ৭৬ হাজার।
কিম নামের এক নারী জানান, প্রথম সন্তান হওয়ার পর সরকার ২০ লাখ ওন ভাউচার দিয়েছে। দ্বিতীয় সন্তান নেওয়ার ভয় কমেছে। দ্বিতীয়বার গর্ভধারণের পর প্রথম সন্তান ডে কেয়ারে অগ্রাধিকারভিত্তিতে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছে।
আরেক নারী হান বলেন, ক্যারিয়ার হারানোর ভয় ও আর্থিক সংকট আগের তুলনায় কমেছে। আশপাশে বেশি মানুষকে বিয়ে ও সন্তান নিতে দেখে তিনিও মা হওয়ার সিদ্ধান্তে সাহস পেয়েছেন।
সোর্সঃ এএফপি
