জবিতে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ৯ হাজার নারী শিক্ষার্থী: স্যানিটেশন ও চিকিৎসা সেবায় চরম অব্যবস্থাপনা
এনায়েতুল্লাহ এলিট, জবি প্রতিনিধি
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি) অধ্যয়নরত প্রায় ৯ হাজার নারী শিক্ষার্থী মৌলিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়ে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন। ক্যাম্পাসে নারীদের জন্য নেই পর্যাপ্ত ও মানসম্মত শৌচাগার, বিশ্রামাগার কিংবা ব্রেস্ট ফিডিং কর্নার। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র মেডিকেল সেন্টারে চিকিৎসক সংকট ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এছাড়াও প্রশাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের এই সমস্যাগুলোকে ‘ছোট বিষয়’ হিসেবে উপেক্ষা করারও অভিযোগ উঠেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, শহীদ সাজিদ ভবনের নিচতলায় নারী শিক্ষার্থীদের কেন্দ্রীয় কমনরুমটির অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। সেখানে বসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় অধিকাংশ সময় শিক্ষার্থীদের দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। কমনরুমের ভেতরের পরিবেশও অস্বাস্থ্যকর। বিশেষ করে ফ্যানগুলো নিয়মিত পরিষ্কার না করায় ধুলাবালি জমে থাকে। যার ফলে ফ্যান চালু করলে ধুলোবালি ছড়িয়ে যাওয়ার মাধ্যমে অনেক শিক্ষার্থী, বিশেষ করে যাদের অ্যাজমা বা শ্বাসকষ্ট রয়েছে, তারা স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছেন।
এছাড়া কমনরুমটিতে নেই মা ও শিশুদের জন্য আলাদা কোনো ‘ব্রেস্ট ফিডিং’ বা দুগ্ধপান কর্নার। ফলে ক্যাম্পাসে আসা নবজাতক ও মায়েরাও স্বাস্থ্যঝুঁকি ও বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন। পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর যুগেও গত এক মাস ধরে কমনরুমে ওয়াইফাই সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় শিক্ষাসংক্রান্ত জরুরি কাজে ব্যাঘাত ঘটছে। নারীদের স্যানিটারি ন্যাপকিন সংগ্রহের জন্য স্থাপিত একমাত্র ভেন্ডিং মেশিনটিতেও রয়েছে অব্যবস্থাপনা; প্রায়ই ন্যাপকিন পাওয়া যায় না এবং টাকা এন্ট্রি করতে গিয়ে যান্ত্রিক ত্রুটির মুখে পড়েন শিক্ষার্থীরা।
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী একজন নারী শিক্ষার্থী জানান, “এই অপরিচ্ছন্নতার কারণে মাঝে মাঝেই শ্বাসকষ্ট জনিত সমস্যায় পরতে হয় তাকে। তিনি বলেন, কমন রুমে কর্মরত যারা আছেন তারা তাদের দায়িত্ব সঠিক ভাবে পালন না করার কারণে এমন সমস্যার সৃষ্টি হয়।”
অন্যদিকে, রফিক ভবনের নিচতলায় অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র মেডিকেল সেন্টারটির অবস্থাও হতাশাজনক। সেখানে মানসম্মত সেবা না পাওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অসুস্থ হলেও তারা অভিজ্ঞ চিকিৎসকের দেখা পান না। শিক্ষার্থীদের দাবি, অনতিবিলম্বে কমনরুমের সংস্কার, শৌচাগার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং মেডিকেল সেন্টারে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগের মাধ্যমে একটি সুষ্ঠু ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
এ বিষয়ে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের শিক্ষার্থী খাদিজা কাজী বলেন, “জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হলে মেডিকেল সেন্টারে যায় কিন্তু খুবই দুঃখজনক যে সেখানে কোন অভিজ্ঞ চিকিৎসক নেই। আছে একজন ফার্মাসিস্ট। ফলে শিক্ষার্থীরা সুচিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি নিজস্ব এম্বুলেন্স রয়েছে যেটি সম্পর্কে বেশিরভাগ শিক্ষার্থী অবগত নয়। ফলে আমরা প্রয়োজনের সময় সুবিধা পাচ্ছি না।”
শহীদ সাজিদ ভবনের নিচতলায় নারীদের কেন্দ্রীয় কমন রুমটি পরিদর্শন করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জকসু) নব-নির্বাচিত কার্যনির্বাহি সদস্য ফাতেমা অউরিন জানান, “বিষয়টি খুবই হতাশাজনক এতো গুলো শিক্ষার্থীর জন্য একটি মাত্র শৌচাগার তাও এতো অপরিষ্কার এটা কোন ভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়, এতে শিক্ষার্থীরা সাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছেন আমরা খুব দ্রুতই এর যথাযথ ব্যবস্থা নিবো।”
তিনি আরও বলেন, “ইতিমধ্যেই আমি এবং সাস্থ্য ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক নূর মোহাম্মদ ভাই আমরা অনেকগুলো ডিপার্টমেন্টে গিয়ে ওয়াশরুমগুলো পরিদর্শন করেছি যেগুলোর অবস্থা আরও হতাশাজনক। আমরা খুব দ্রুতই এগুলো ক্লিন করার ব্যবস্থা করব এবং শিক্ষার্থীরা যে অভিযোগ গুলো করেছেন তা তদন্ত করে সঠিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।”
মেডিকেল সেন্টারের দুরবস্থা নিরসনে করণীয় সম্পর্কে জকসুর সাস্থ্য ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক নূর মোহাম্মদ জানান, “মেডিকেল সেন্টারে দুইজন চিকিৎসক ছিলেন তবে বর্তমানে একজন চিকিৎসক আছেন যিনি একই সাথে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট স্টাফ হওয়ায় তাকে বিভিন্ন মিটিংয়ে থাকতে হয়। জকসু থেকে ইতিমধ্যে ভিসি বরাবর আবেদন করা হয়েছে যেন দ্রুতই অভিজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়ানো হয় একই সাথে নারীদের যে হল সেখানেও কোন মেডিকেল সেন্টার নেই। আমরা দাবি জানিয়েছি যেন সেখানে অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে একটি মেডিসিন ও গাইনি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের নিয়োগ দেওয়া হয় এবং চিকিৎসা সেবা দেওয়ার সময়টা যেন আরও বাড়ানো হয়। যেন শিক্ষার্থীরা ২৪ ঘণ্টাই সেবা নিতে পারেন।”
