জার্মানিতে কট্টর ডানপন্থীদের জয়, ইউরোপের রাজনীতিতে পরিবর্তনের আভাস

অনলাইন ডেস্ক

জার্মানির পূর্বাঞ্চলীয় স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যের নির্বাচনে বড় জয় পেয়েছে কট্টর ডানপন্থী দল অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি)। এই ফলকে শুধু জার্মানির আঞ্চলিক রাজনীতির ঘটনা হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, আগামী বছর ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে কট্টর ডানপন্থী দলগুলোর উত্থানের ইঙ্গিত মিলেছে এ ফলাফলে।

রোববারের নির্বাচনে স্যাক্সনি-আনহাল্টে বড় ব্যবধানে এগিয়ে যায় এএফডি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও নাৎসি আমলের ভয়াবহ ইতিহাসের কারণে জার্মানিতে কট্টর ডানপন্থী রাজনীতির প্রতি দীর্ঘদিন ধরেই বিশেষ সতর্কতা রয়েছে। ফলে দেশটির একটি রাজ্য নির্বাচনে এএফডির এমন সাফল্য ইউরোপজুড়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপে গত এক দশক ধরে অভিবাসনবিরোধী ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির জনপ্রিয়তা বাড়ছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, বেকারত্ব, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে কট্টর ডানপন্থী দলগুলো নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে।

ইউরোপবিষয়ক বিশ্লেষক মুজতবা রহমানের মতে, ইউরোপের উন্নত দেশগুলো বর্তমানে এক ধরনের রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সরকারগুলো মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ও অন্যান্য উদ্বেগের কার্যকর সমাধান দিতে না পারায় ভোটারদের একটি অংশ বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির দিকে ঝুঁকছে।

জার্মানিতে মের্ৎসের জন্য চাপ

স্যাক্সনি-আনহাল্টের নির্বাচনী ফল জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের জন্যও অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে। তাঁর নেতৃত্বাধীন মধ্য-ডানপন্থী ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নের তুলনায় এএফডি দ্বিগুণেরও বেশি ভোট পেয়েছে।

তবে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় আসন থেকে কিছুটা পিছিয়ে থাকতে পারে এএফডি। ফলে সবচেয়ে বেশি ভোট পেলেও দলটির পক্ষে সরকার গঠন করা কঠিন হতে পারে। অন্য দলগুলো ইতোমধ্যে এএফডির সঙ্গে জোটে যেতে অনাগ্রহের কথা জানিয়েছে।

এএফডির বিরুদ্ধে উগ্র ডানপন্থী অবস্থান এবং নাৎসি আমলের বক্তব্যকে প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। দলের কয়েকজন নেতার বক্তব্য নিয়ে অতীতেও বিতর্ক হয়েছে। জার্মানির গোয়েন্দা সংস্থাও দলটিকে উগ্রপন্থার সন্দেহে পর্যবেক্ষণে রেখেছে।

তারপরও নির্বাচনী সাফল্য মের্ৎসের নেতৃত্ব নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলতে পারে। দলের ভেতর থেকে পরাজয়ের দায় তাঁর ওপর চাপানো হলে চ্যান্সেলরের রাজনৈতিক অবস্থান আরও দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ফ্রান্সে লে পেনের দিকে নজর

জার্মানির পর ইউরোপের নজর এখন ফ্রান্সের দিকে। আগামী বসন্তে দেশটিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা। বর্তমান প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ আর নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না।

এ পরিস্থিতিতে কট্টর ডানপন্থী ন্যাশনাল র‌্যালির নেতা মারিন লে পেন শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। বিভিন্ন জনমত জরিপে প্রথম দফার ভোটে তিনি অন্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় এগিয়ে আছেন।

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ফ্রান্সে কট্টর ডানপন্থীরা ক্ষমতায় এলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাজনৈতিক ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। কারণ ফ্রান্স ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেশ এবং পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র।

এদিকে ফ্রান্স ও জার্মানির মূলধারার দলগুলো দীর্ঘদিন ধরে কট্টর ডানপন্থীদের সঙ্গে জোট না করার যে নীতি অনুসরণ করেছে, সেটিও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

স্পেন ও যুক্তরাজ্যেও বাড়ছে ডানপন্থী চাপ

স্পেনেও কট্টর ডানপন্থী ভক্স পার্টির প্রভাব বাড়ছে। দুর্নীতির অভিযোগ, অভিবাসন ইস্যু এবং অর্থনৈতিক চাপের কারণে ক্ষমতাসীন সমাজতন্ত্রীদের জনপ্রিয়তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে ভবিষ্যৎ জোট সরকারে ভক্সের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশ্লেষকেরা।

যুক্তরাজ্যেও একই ধরনের রাজনৈতিক টানাপোড়েন চলছে। নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন রিফর্ম ইউকে দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করলেও দলটির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। আরও ডানপন্থী একটি নতুন দল ফারাজের ভোটব্যাংকে ভাগ বসানোর চেষ্টা করছে।

অরবানের পরাজয় কি ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে?

তবে ইউরোপে কট্টর ডানপন্থীদের উত্থান যে একমুখী, এমনটাও নয়। গত এপ্রিলে হাঙ্গেরির দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী ভিক্তর অরবান নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন। ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকার পর তাঁর পরাজয় মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য কিছুটা স্বস্তির বার্তা দিয়েছে।

ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনির ক্ষেত্রেও দেখা গেছে ভিন্ন কৌশল। নব্য ফ্যাসিবাদী শিকড় থাকা সত্ত্বেও ক্ষমতায় এসে তিনি ইউক্রেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো ইস্যুতে তুলনামূলক মধ্যপন্থী অবস্থান নিয়েছেন। তবে তাঁর চেয়েও বেশি ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তির উত্থান তাঁকে অভিবাসন ইস্যুতে আবার কঠোর অবস্থান নিতে বাধ্য করছে।

সব মিলিয়ে জার্মানির সাম্প্রতিক নির্বাচন ইউরোপের সামনে একটি বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে অর্থনৈতিক চাপ, অভিবাসন ও প্রচলিত রাজনীতির প্রতি অসন্তোষ কি কট্টর ডানপন্থীদের আরও শক্তিশালী করবে, নাকি মূলধারার দলগুলো সময় থাকতেই ভোটারদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারবে?

আগামী বছর ফ্রান্স, স্পেন ও ইতালিসহ ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর নির্বাচন সেই প্রশ্নের উত্তর অনেকটাই স্পষ্ট করে দিতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights