জিয়াউর রহমান হত্যা, রাষ্ট্রের ইতিহাস ও নিজের রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে আবু খলিকুজ্জামানের বক্তব্য

নিউইয়র্কপ্রবাসী চিন্তাবিদ, লেখক ও সামাজিক কর্মী আবু খলিকুজ্জামান সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস, বিশেষ করে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ এবং নিজের দীর্ঘ সামাজিক কর্মকাণ্ড নিয়ে একটি দীর্ঘ বক্তব্য দিয়েছেন।

তার বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ জুড়ে রয়েছে তার পিতা ডিএসপি মুকাররম হোসেনের ভূমিকার দাবি। আবু খলিকুজ্জামানের ভাষ্য অনুযায়ী, তার বাবা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের সময় তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদনসহ বিস্তারিত নথি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিয়েছিলেন। তিনি দাবি করেন, এসব নথির মধ্যে একটি ৫৭ পৃষ্ঠার বিস্তারিত প্রতিবেদনও ছিল, যা দীর্ঘদিন প্রকাশিত হয়নি।

আবু খলিকুজ্জামানের অভিযোগ, তার বাবা তদন্তের বিষয়ে নিজের অবস্থানে অটল থাকায় পরবর্তীতে প্রশাসনিক চাপের মুখে পড়েন এবং তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। তবে এসব দাবির বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য সরকারি নথি বা আদালতের প্রকাশিত রেকর্ড এই বক্তব্যের সঙ্গে যুক্ত করা হয়নি।

সম্প্রতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড নিয়ে নতুন করে আলোচনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, কেন কয়েক দশক পর কিছু নথি বা তথ্য সামনে আসছে এবং এত দীর্ঘ সময় এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়নি। তার মতে, বাংলাদেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো নিয়ে আরও স্বচ্ছ তদন্ত ও জনসম্মুখে তথ্য প্রকাশ প্রয়োজন।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ নিয়েও আবু খলিকুজ্জামান তার নিজস্ব ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে জনগণের আত্মত্যাগ ও মুক্তিযোদ্ধাদের ভূমিকা ছিল প্রধান। একই সঙ্গে তিনি ভারতের ভূমিকা, আঞ্চলিক রাজনীতি এবং স্বাধীনতার পরবর্তী কূটনৈতিক বাস্তবতা নিয়েও তার মতামত প্রকাশ করেন।

তার দীর্ঘ বক্তব্যের আরেকটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে “ঐক্যবদ্ধ বাংলা” ধারণা। তিনি বলেন, বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ভিত্তিতে বাঙালিদের মধ্যে ঐক্যের প্রয়োজন রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে বিভক্ত বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের সাংস্কৃতিক বন্ধনকে তিনি ভবিষ্যতের আলোচনার বিষয় হিসেবে তুলে ধরেন।

আবু খলিকুজ্জামান নিজের রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের স্মৃতিচারণ করে জানান, তরুণ বয়সে তিনি বিভিন্ন প্রকাশনা ও সামাজিক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি “ক্যাম্পাস” নামে একটি মাসিক পত্রিকা এবং “দেশ বিচিত্রা” নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রতিষ্ঠার কথা উল্লেখ করেন।

আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শান্তি, মানবিক মূল্যবোধ ও আন্তঃধর্মীয় সংলাপ নিয়েও তিনি তার কাজের কথা তুলে ধরেন। তার দাবি, ৯/১১ হামলার পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি ও নিরাপত্তার পক্ষে এবং বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরতে বিভিন্ন কর্মসূচি আয়োজন করেছিলেন।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান, যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং নিউইয়র্কের বিভিন্ন সরকারি সংস্থা তার মানবিক কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতি দিয়েছে। এসব দাবির কিছু অংশের বিষয়ে পৃথক নথি বা স্বীকৃতির বিস্তারিত তথ্য প্রয়োজন।

নিজের পরিচয় সম্পর্কে আবু খলিকুজ্জামান বলেন, তিনি একজন বাংলাদেশি হিসেবে গর্বিত এবং একই সঙ্গে মানবিক মূল্যবোধকে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে স্থান দেন। তার বক্তব্যে ধর্মীয় সম্প্রীতি, শান্তি, মানবাধিকার এবং বাংলাদেশের স্বাধীন অস্তিত্ব রক্ষার বিষয়গুলো বারবার উঠে এসেছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে জ্ঞান, দক্ষ নেতৃত্ব, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা এবং জনগণের ঐক্যের ওপর।

জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, আঞ্চলিক রাজনীতি এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আবু খলিকুজ্জামানের বক্তব্য নতুন করে কিছু প্রশ্ন সামনে এনেছে। তবে এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হলে প্রয়োজন ঐতিহাসিক দলিল, সরকারি নথি, আদালতের রেকর্ড এবং স্বাধীন গবেষণার ভিত্তিতে যাচাই।

ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো নিয়ে মতভেদ থাকলেও, তথ্যের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষ অনুসন্ধানই পারে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সত্যকে আরও স্পষ্ট করতে।

2nd part:

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড, ডিএসপি মুকাররম হোসেনের ভূমিকা ও কিছু অপ্রকাশিত প্রশ্ন

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে নিহত হন। সেই সময় আমার বাবা জনাব মুকাররম হোসেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (CMP) গোয়েন্দা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত ডিএসপি ছিলেন। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় পুলিশের পক্ষের দায়িত্বও তার ওপর ছিল।

আমার বাবা ছিলেন অত্যন্ত দায়িত্বশীল, সৎ, মেধাবী এবং কর্মনিষ্ঠ একজন পুলিশ কর্মকর্তা। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সতর্ক ও দূরদর্শী। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জীবন নিয়ে সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে তিনি আগেই ধারণা করেছিলেন এবং সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় তথ্য ও সতর্কবার্তা জানিয়েছিলেন। কিন্তু তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে তিনি মনে করতেন।

পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হন।

আমার বাবা এই হত্যাকাণ্ডের প্রাথমিক তদন্তের অংশ হিসেবে ৫৭ (সাতান্ন) পৃষ্ঠার সহায়ক নথিপত্র ও তথ্য-প্রমাণসহ একটি এফআইআর দাখিল করেছিলেন। আমার বড় প্রশ্ন হলো—সেই ৫৭ পৃষ্ঠার এফআইআরে তিনি কী লিখেছিলেন? কী ধরনের তথ্য ও প্রমাণ তিনি উপস্থাপন করেছিলেন?

বাংলাদেশের জনগণের সামনে এই ৫৭ পৃষ্ঠার নথি আসা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি, যাতে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় সম্পর্কে সত্য অনুসন্ধানের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

আমার বাবা বাংলাদেশ পুলিশের একজন অত্যন্ত সম্মানিত কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি সিআইডি ঢাকা, স্পেশাল ব্রাঞ্চ ঢাকা, ডিটেকটিভ পুলিশ ঢাকা এবং এনএসআই ঢাকায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (CMP) প্রতিষ্ঠার সময় তাকে সেখানে বদলি করা হয় এবং তিনি গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার কারণে তাকে এসপি পদে পদোন্নতির জন্য বিবেচনা করা হয়েছিল বলে আমি মনে করি।

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের আগে সম্ভাব্য ষড়যন্ত্র ও নিরাপত্তা ঝুঁকি সম্পর্কে তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ছিল। তিনি এসব বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছিলেন। কিন্তু তার সতর্কবার্তা যথাযথ গুরুত্ব পায়নি বলে তার ধারণা ছিল।

আমার অভিযোগ, পরবর্তীতে তার পদোন্নতি বাধাগ্রস্ত করা হয়। এমনকি তাকে ৫৭ পৃষ্ঠার এফআইআর প্রত্যাহার বা পরিবর্তন করার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আমার বাবা তার অবস্থান থেকে সরে আসেননি। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন যে তিনি এফআইআর পরিবর্তন বা প্রত্যাহার করবেন না।

তিনি তৎকালীন ডিএফআই পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল লতিফের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেছিলেন। তিনি নিয়মিত ডিএফআই ও এনএসআই কার্যালয়ে যেতেন। এক পর্যায়ে তিনি পরিষ্কারভাবে বলেন যে, তিনি তার ৫৭ পৃষ্ঠার এফআইআর পরিবর্তন করবেন না।

আমার বাবা ছিলেন একজন অসাধারণ পুলিশ কর্মকর্তা। ১৯৬৪ সালে তার অসামান্য সেবার স্বীকৃতিস্বরূপ তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান তাকে সম্মাননা প্রদান করেছিলেন। পুলিশ বিভাগে তিনি একজন মেধাবী ও দক্ষ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

তার মৃত্যুর প্রায় দুই মাস আগে আমি রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম। তিনি আমাকে বিস্তারিত কিছু বিষয় জানিয়েছিলেন। কয়েকবার বিরতি নিয়ে তিনি অনেক তথ্য বলেছিলেন। আমি সেগুলো নোট করে রেখেছিলাম। বর্তমানে সেই নোটগুলো আমার লেখার অংশ হিসেবে সংরক্ষিত আছে।

আমি দীর্ঘদিন সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। আমার একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা ছিল—“দেশ বিচিত্রা”। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে প্রকাশিত “ক্যাম্পাস” নামের একটি মাসিক পত্রিকার সঙ্গেও আমি যুক্ত ছিলাম।

আমি নটর ডেম কলেজের ছাত্র ছিলাম এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলাম। ছাত্রজীবনেই গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা এবং পরবর্তীতে ওষুধ উৎপাদন শিল্প প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিলাম।

আমি পাঁচটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান এবং চারটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছি।

কিন্তু ১৯৯৭ সালে আমাকে বাংলাদেশ ছাড়তে বাধ্য হতে হয়। বাংলাদেশে আমার সম্পত্তি রেখেই আমাকে দেশ ছাড়তে হয়েছিল। এটি ঘটে শেখ হাসিনা প্রথমবার ক্ষমতায় আসার পর।

আমার বিশ্বাস, ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো নিয়ে সত্য অনুসন্ধান প্রয়োজন। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের মতো একটি জাতীয় ঘটনার ক্ষেত্রে সব নথি, বিশেষ করে ৫৭ পৃষ্ঠার এফআইআর ও সংশ্লিষ্ট দলিল জনগণের সামনে আসা উচিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights