জেনারেল ওয়াকার ম্যাজিকে গণমানুষের উচ্চাশা

দেড় বছরের মধ্যে যেন দেশে নির্বাচন হয় সেই ব্যবস্থা করার স্পষ্ট বার্তা ছিল সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের। সেটি ছিল গেল সেপ্টেম্বরের ২৪ তারিখে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে। এর বাংলা ভার্সনে কোনো কোনো গণমাধ্যমের তরজমা ছিল ১৮ মাস। দেড় বছর মানে ১৮ মাস হলেও বছরের চেয়ে ‘মাস’ বেশি কমিউনিকেটিভ বিবেচনায় রাজনৈতিক মহলে তাঁর বার্তাটি ম্যাজিকের মতো কাজে দেয়।

বড় রকমের একটা জিজ্ঞাসার জবাব মেলে তাঁর কথায়। কবে কখন নির্বাচন—এই প্রশ্নের মোটামুটি একটা সড়কচিত্র দেখা দেওয়ায় তপ্ত রাজনীতিকে তা কিছুটা শীতল পরশ দেয়। সেই দৃষ্টে দেড় বছর বা ১৮ মাসের মধ্যে বলতে তা আগামী মার্চ মনে করা যায়।
সাক্ষাৎকারটিতে এ কথাও ছিল, ‘যা-ই হোক না কেন’ সরকারকে সমর্থন দিয়ে যাবে সেনাবাহিনী।

একই সঙ্গে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করবে না—এই প্রতিশ্রুতিও ছিল। সরকারকে সমর্থন দিয়ে যাওয়ার সমান্তরালে ঐতিহাসিক সহযোগিতাও করে যাচ্ছে বাহিনীটি। রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ না করার ওয়াদাও রাখছে। বাড়তি হিসেবে ভূমিকা রাখছে দেশের গণতন্ত্রায়ণে।

গত আগস্টের শুরুতে হাসিনার বিরুদ্ধে ছাত্র নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভে জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান ও সেনাবাহিনী বাধা দেয়নি। এতে শেখ হাসিনার ভাগ্য নির্ধারণ হয়ে যায়। এনে দেয় জাতীয় ঐক্য ও গণতন্ত্রের বাতাবরণ। এর মধ্য দিয়ে সেনাবাহিনী ও বাহিনীপ্রধান জেনারেল ওয়াকারের ভূমিকা শুধু স্বাধীন বাংলাদেশে নয়, বিশ্ব ইতিহাসেও নতুন পালক যোগ করে। তা অতীত ও বর্তমানের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ ইতিহাসেরও পাঠ-পঠন হয়ে থাকবে।

হবে গবেষণাও। তখন সেনাপ্রধান সেই ভূমিকা না নিলে কেবল আরো প্রাণহানিসহ গৃহযুদ্ধ নয়, এর চেয়েও বেশি কিছু হয়ে যেতে পারত। ঘুরছিল স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাতের সমূহ শনির শঙ্কাও।

সেই বিবেচনায় দেশ, জাতি, গণতন্ত্র উদ্ধারের পাশাপাশি জাতীয় ঐক্যের পক্ষে কোরামিনের কাজ করেছেন এই সেনাপ্রধান। সাক্ষাৎকারটিতে ধৈর্যের প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দিয়েছিলেন তিনি। সেখানে আজ বড় ব্যত্যয়। তিনি নিজে ধৈর্যের চূড়ান্ত নমুনা দেখিয়ে যাচ্ছেন। নানা উসকানিতেও ধৈর্য হারাচ্ছেন না। তাঁকে এবং সেনাবাহিনীর ধৈর্যচ্যুতি ঘটানোর মতো হেন কুকর্ম-উসকানি নেই, যা গত সাত-আট মাসে না করা হয়েছে। যার কোনো কোনোটি অকথ্য পর্যায়ের। এসবের উদ্দেশ্যই ছিল প্রথমত সেনাবাহিনীকে জনতার বা রাজনীতিকদের মুখোমুখি করা। দ্বিতীয়ত, সেনা-জনতার ইস্পাতকঠিন জাতীয় ঐক্যে বিভেদ ঘটানো। সব ষড়যন্ত্র-কুমন্ত্রণাই ভণ্ডুল হয়ে গেছে জেনারেল ওয়াকারের ধী, মেধা, উপলব্ধি, পেশাদারির গুণে। শান্তিকামী বিভিন্ন মহলের মধ্যে তাঁকে নিয়ে আরেকটি উচ্চাশার পারদ জাগছে। নির্বাচন নিয়ে রাজনীতিকরা ক্রমেই মতভিন্নতায় ভুগছেন। অবিশ্বাস দানা বাঁধছে। আবার অনৈক্য ভর করছে। নির্বাচন প্রশ্নে চলমান এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্ক ও জাতীয় ঐক্য বানচালের ষড়যন্ত্রের রাশ টেনে ধরার একটি উদ্যোগও নিতে পারেন সেনাপ্রধান। নির্বাচন যেন ১৮ মাসের মধ্যে হয় সেই ভূমিকা রাখার কথা তো তিনি দিয়েছেনই।

চৌকস সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকারের চব্বিশের ম্যাজিক রক্তপাত থেকে বাঁচিয়ে দেশকে একটি পথরেখা দিয়েছে। তাঁর ক্ষমতালিপ্সা নেই, তা-ও প্রমাণ হয়েছে। চাইলে এ ক্ষমতার লিপ্সা চরিতার্থ করার পর্যাপ্ত সুযোগ ছিল। এখনো আছে। কিন্তু তিনি সেই পথের পথিক নন। প্রধান উপদেষ্টা নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূসও ক্ষমতার মোহমুক্ত। প্রধান উপদেষ্টা পরিচয়ের বাইরেও তাঁর যশ-খ্যাতি দুনিয়াজোড়া। ক্ষমতার সাধ থাকলে তা সেই ওয়ান-ইলেভেনেই পারতেন। এখনো তিনি যত দ্রুত সম্ভব ক্ষমতার এই ভার থেকে মুক্ত হয়ে আপন জগতে ফিরতে চান বলে বারবার জানাচ্ছেন। কিন্তু নির্বাচন আয়োজনে দেরির কারণে অবান্তর কথা রটছে। এগুলো যত না কথা, তার চেয়ে বেশি কুকথা। সেনাপ্রধান ও সরকারপ্রধান দুজনকেই এসব কুকথা হজম করতে হচ্ছে।

সরকারপ্রধানের ওয়াদা ডিসেম্বর থেকে জুনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের। আর সেনাপ্রধানের ১৮ মাসের মধ্যে নির্বাচনের ব্যবস্থা করার টাইম ফ্রেমে হিসাব করলে দাঁড়ায় আগামী মার্চে। দুজনের কথার মাঝে ফের নেই। জোর করেও তফাত আবিষ্কার করা কঠিন। তার পরও বিবাদ-বিভেদ বাঁধানো, নতুন গণ্ডগোল পাকানোর অপচেষ্টায় কমতি নেই। আট মাস আগে রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে যে ঐক্য ছিল, সেখানে এখন আবার মরীচিকার স্তর। অবান্তর কথার খই ফোটানোর ধুম, যা সুন্দর আগামীর পথরেখাকে পিছু টানছে। এ বিষয়ে সতর্কতা প্রশ্নে কিংবদন্তি হয়ে আছেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার। ধৈর্য না থাকলে, ঐক্য রক্ষা না হলে পস্তাতে হবে, লাউড অ্যান্ড ক্লিয়ারে তা তিনি আগেই বলে রেখেছেন। সতর্ক করেননি বলে পরে যেন তাঁকে দোষ দেওয়া না হয়, সেই বার্তা দিয়েছেন।

তাঁর জায়গা থেকে তিনি আর কী করতে পারেন? আর কী করার আছে তাঁর? অনেকে মনে করেন, এখনো চাইলে করণীয় আছে তাঁর। জুলাই-আগস্টে দেশজুড়ে নিষ্পত্তিহীন প্রশ্ন ছিল—এসব কী হচ্ছে, সামনে কী হবে? দেশটা কোথায় যাবে? অনেকেই রাজনীতি-অর্থনীতিসহ গোটা দেশের ভবিষ্যৎ আল্লাহর ওপর হাওলা করে দিয়েছিলেন। মনে করা হচ্ছিল, বান্দার হাতে আর কিছু নেই। কঠিন ওই সময়ে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার তপ্ত মাঠকে এমন একটি ফয়সালায় স্বস্তি দেবেন, তা অনেকের ধারণার মধ্যেও ছিল না। এখনকার অনৈক্য-অস্থির পরিস্থিতি দুঃখজনক সত্য। কিন্তু জুলাই-আগস্ট পরিস্থিতির মতো তপ্ত নয়। যত দ্রুত সম্ভব একটি নির্বাচন আয়োজনে নিশ্চয়ই তাঁর ভূমিকা রাখার অবকাশ রয়েছে বলে প্রত্যাশা অনেকের। সেই সঙ্গে অপেক্ষাও।

বিশ্বায়নের যুগে রাজনীতি, অর্থনীতি, কূটনীতি, সমরনীতি, নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্বকে আলাদা করা যায় না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সেনাবাহিনীর ভূমিকা সব সময়ই প্রাসঙ্গিক। কখনো কখনো আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতেও। ২০২৪ সালে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে সেনাবাহিনী যেভাবে অংশীজন হয়েছে, তা সংগত কারণেই বাহিনীটির ওপর প্রত্যাশা বাড়িয়ে দিয়েছে। সেনাপ্রধান ওয়াকারের ওপর ভরসার পারদটি তাই উচ্চমুখী। হিরো হয়েও তিনি যে হিরোইজম চর্চা করছেন না, এটিও এক তাৎপর্য। দায়িত্বশীল অবস্থান থেকে সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বাইরে রাখার সুবিবেচনা যেন একান্তই তাঁর। একটি দায়িত্বশীল ও পেশাদার সেনাবাহিনীর গণতন্ত্রের পক্ষে এমন অবস্থান তাঁকে শুধু জীবন্ত কিংবদন্তিই করেনি, বাহিনীর মর্যাদাও বাড়িয়েছে। আর সঠিক সময়ের সঠিক সিদ্ধান্ত জাতীয় ঐক্যের সঙ্গে দেশের গণতন্ত্রের পথকে করেছে প্রশস্ত। ভবিষ্যতে বাংলাদেশে গণতন্ত্র কতটা সুসংহত হবে, তা রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর নির্ভর করে। তাই বলে সেনাবাহিনীর দায়িত্ব শেষ হয়ে গেছে, তা নয়। চব্বিশে এমন ভূমিকার সুবাদে গণতন্ত্রায়ণ ও নির্বাচনে সেনাবাহিনী ও সেনাপ্রধানের করণীয় অনেক কিছু রয়েছে। তা করছেও।

সামগ্রিক অনিবার্য পরিস্থিতিতে ম্যাজিস্ট্রেসি সক্ষমতা নিয়ে এখনো মাঠে আছে সেনাবাহিনী। আর আছে বলেই সম্ভাব্য অনেক বিপদ থেকে রক্ষা। জননিরাপত্তা, অনাকাঙ্ক্ষিত অরাজকতা প্রতিরোধ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের কারসাজি রুখে দেওয়া, মিল-কারখানা সচল রাখা, রাষ্ট্রের কেপিআই এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনাগুলোকে রক্ষা, সড়ক-মহাসড়ক বাধামুক্ত রাখা, অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার, বিদেশি কূটনীতিক ও দূতাবাসগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিতের কাজ সেনাবাহিনী যেভাবে করে যাচ্ছে, তা বিবেকবানরা উপলব্ধি করছেন মর্মে মর্মে। ঘটা করে এসবের কোনো প্রচার নেই। সেনাবাহিনী প্রচারে অভ্যস্তও নয়। মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার, বিভিন্ন চিহ্নিত অপরাধী ও নাশকতামূলক কাজের ইন্ধনদাতা-পরিকল্পনাকারীদের গ্রেপ্তারের পুলিশি কাজও করে চলছে সেনাবাহিনী। ক্ষতবিক্ষত, দুমড়েমুচড়ে যাওয়া পুলিশকে কাজে ফেরানো এখনো কঠিন কাজ। অন্যান্য বাহিনী একটু একটু করে পেশাদার হয়ে উঠছে। তাদের স্বাভাবিক করে তুলতে বাড়তি শ্রম দিতে হচ্ছে সেনাবাহিনীকে। দেশপ্রেম ও আস্থার ফল এখানেই।

বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের লক্ষ্যে নেওয়া পদক্ষেপ সম্পর্কে সেনাবাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা উঠে এসেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসংঘসহ বিশ্বসভার সদস্যদের প্রতিক্রিয়ায়ও। সেনাবাহিনী সেদিন শুধু রাজনৈতিক ফয়সালায় ভূমিকা রাখেনি, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায়ও দেশপ্রেমের স্বাক্ষর রেখেছে। এমনকি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিভিন্ন সময়ে আহতদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থাও করেছে। দেশের বিভিন্ন সিএমএইচে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে। গুরুতর আহত কয়েকজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশেও পাঠিয়েছে। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পর এখন সুষ্ঠু, অবাধ নির্বাচনেও সেনাবাহিনীর অভিযাত্রার এত আকাঙ্ক্ষা।

সেনাবাহিনীর সময়োপযোগী পদক্ষেপের সমান্তরালে সেনাপ্রধানের কিছু মন্তব্য তাঁর বাহিনীর সদস্যদের আরো আশাবাদী করে তুলেছে। সেনাবাহিনী রাজনৈতিকভাবে কোনো হস্তক্ষেপ করবে না উল্লেখ করে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, ‘আমি এমন কিছু করব না, যা আমার সেনাবাহিনীর জন্য ক্ষতিকর হয়। আমি একজন পেশাদার সৈনিক। আমি আমার সেনাবাহিনীকে পেশাদার রাখতে চাই।’ সরকারের প্রয়োজন অনুযায়ী সারা দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, নতুন স্বপ্নের বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখার কথাও বলেছেন জেনারেল ওয়াকার। জাতির পরম আস্থা ও ভালোবাসার প্রতীক বাংলাদেশ সেনাবাহিনী রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠার সঙ্গে দেশ গঠনেও নিরবচ্ছিন্ন ভূমিকার একটি নতুন দৃশ্যায়ন ঘটল এবার। এবারের পটপরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে কী রকমের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি হয়েছে, কত সড়ক-মহাসড়কে অবরোধ হয়েছে, কত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে, সরকারি সংস্থা অথবা অফিসসংক্রান্ত জটিলতা হয়েছে, অনেকেরই এসংক্রান্ত ধারণা নেই। সেনা সদস্যরা সেগুলো ফয়সালা করেছেন। টঙ্গীর ইজতেমা ময়দানে অপ্রীতিকর ঘটনার সমাধানও করেছেন। বড়দিন, পূজা, মাহফিল, ওরস, রাসমেলা, নবান্ন উৎসবসহ গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আয়োজন শান্তিপূর্ণভাবে উদযাপনে দায়িত্ব পালন করেছেন। কাজগুলো সচরাচর পুলিশের। কিন্তু পুলিশবাহিনীর দুর্গতির কারণে সেনাবাহিনীকে চালাতে হয়েছে এসব কর্মধারা। সশস্ত্র বাহিনীর ক্যাপ্টেন ও তদূর্ধ্ব পদবির কর্মকর্তারা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা নিয়ে কাজ করছেন কোনো হাঁকডাক বা শোডাউন ছাড়াই। তাঁরা মাঠে না থাকলে দৃশ্যপট কেমন হতো, তা এখনো কারো কারো উপলব্ধির বাইরে।

লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট, ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights