জ্বালানিসংকটের টেকসই সমাধান খুঁজছে সরকার
মানিক মুনতাসির
দেশে চলমান জ্বালানিসংকট এখন শুধু সাময়িক সরবরাহ ঘাটতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি অর্থনীতি, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প কার্যক্রমে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। দেশি গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পে চাহিদা বৃদ্ধি, এলএনজির ওপর বাড়তি নির্ভরতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ অনিশ্চয়তার মধ্যে সরকার দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই জ্বালানিনিরাপত্তার পরিকল্পনা নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে দেশি গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, এলএনজি আমদানির উৎস বহুমুখীকরণ, নতুন টার্মিনাল এবং জ্বালানি মজুতসক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। সংকট সমাধানে দেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে কাজ করছে সরকার। এর অংশ হিসেবে, জ্বালানিনিরাপত্তা বিষয়ে পরামর্শ এবং সংকটকালে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে গত জুনে উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি, ভোলা থেকে গ্যাস পরিবহন, নতুন এফএসআরইউ এবং স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনালসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এ কমিটির বিবেচনায় রয়েছে। বর্তমান সংকট মোকাবিলায় চলতি সপ্তাহেই কমিটির জরুরি বৈঠক ডাকা হয়েছে। এদিকে এলএনজি আমদানির উৎস বহুমুখীকরণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্টদের। একই সঙ্গে জ্বালানি আমদানির অর্থের সংস্থান যাতে কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত না হয়, সেদিকে অর্থ বিভাগের নজর রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি এলএনজি আমদানির বাড়তি ব্যয় বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও চাপ তৈরি করছে। এজন্য জ্বালানি মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দিয়েছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে জ্বালানি আমদানির অর্থের সংস্থানের ক্ষেত্রে যেন কোনোরকম সংকট না হয় সেদিকে তীক্ষè দৃষ্টি রাখছে অর্থবিভাগ। গত মঙ্গলবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অনির্ধারিত আলাপের সময় এ ধরনের নির্দেশনা দেন। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যা সমাধানে দ্রুত গতিতে দুর্বল কোনো সিদ্ধান্ত না নিয়ে বরং টেকসই এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খুঁজে বের করার নির্দেশনা দেন।
গ্যাসের স্বাভাবিক ঘাটতি ১১০ কোটি ঘনফুট : পেট্রোবাংলার হিসাবে, স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। বিপরীতে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ থাকে প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ স্বাভাবিক সময়েই দৈনিক ঘাটতি প্রায় ১১০ কোটি ঘনফুট। দেশি উৎপাদন কমে যাওয়ায় আমদানি করা এলএনজি এখন গ্যাস সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠেছে। তবে সাম্প্রতিক সংকটে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে। চলতি মাসের মাঝামাঝিতে এলএনজি সরবরাহে বিঘ্নের কারণে জাতীয় গ্রিডে মোট গ্যাস সরবরাহ প্রায় ১৯৩ কোটি ঘনফুটে নেমে গেছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ১৮৭ কোটি ঘনফুট। এ ছাড়া, এলএনজি থেকে সরবরাহও স্বাভাবিক সময়ের প্রায় ৩০০ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানায়। চলমান এ জ্বালানিসংকট আরও তীব্র হয় মহেশখালীতে ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুনের পর। ২১ জুলাই আগুনে এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত টার্মিনালটি বন্ধ হয়ে যায়। এতে প্রতিদিন প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। আগস্টের শুরুতে একটি রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট আংশিক চালু হলে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ১১ কোটি ৫০ লাখ ঘনফুট গ্যাস যোগ হয়। টার্মিনালটির স্বাভাবিক সক্ষমতা প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ কোটি ঘনফুট।
এলএনজি আমদানি বাড়ছে : সংকট মোকাবিলায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা ছিল ১১৫টি কার্গো। এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার ও ওমান থেকে এবং বাকি অংশ স্পট মার্কেট ও স্বল্পমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে সংগ্রহের পরিকল্পনা করা হয়। আগের অর্থবছরে আমদানি করা হয়েছিল ৯৪টি কার্গো। ১১৫টি কার্গোর পরিকল্পিত আমদানি ব্যয় প্রায় ৫৭ হাজার ৯২৮ কোটি টাকা ধরা হয়েছিল। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের পর সেই হিসাব পাল্টে যায়।
বাড়ছে আমদানি ব্যয় : বিকল্প উৎস থেকে স্পট মার্কেটে এলএনজি কেনায় ব্যয়ও বেড়েছে। মার্চে দুটি কার্গোর দাম ছিল যথাক্রমে ২৮ দশমিক ২৮ ও ২৩ দশমিক ০৮ ডলার প্রতি এমএমবিটিইউ, যা বছরের শুরুতে ছিল ১০ ডলার। এ পরিস্থিতিতে সরকারকে বাড়তি ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। মে মাসে ১১টি এলএনজি কার্গো আমদানির পরিকল্পনাও করা হয়েছিল। এর মধ্যে মাত্র তিনটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির এবং আটটি স্পট মার্কেট থেকে সংগ্রহের কথা ছিল। এদিকে সংকট মোকাবিলায় আগস্টে আরও পাঁচটি এলএনজি কার্গো আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এসব কার্গোতে মোট ১৬ মিলিয়ন এমএমবিটিইউ এলএনজি থাকবে। পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা বলেছেন, বাড়তি কার্গোগুলো গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সংগ্রহ করা হচ্ছে। মজুত বাড়ানো হচ্ছে : গ্যাসের পাশাপাশি জ্বালানি তেলের মজুত বাড়াতেও সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। ৯০ দিনের কৌশলগত মজুতের লক্ষ্যে অতিরিক্ত ৪ লাখ ৮০ হাজার টন জ্বালানি তেল আমদানির সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৩ লাখ ৯০ হাজার টন ডিজেল এবং ৯০ হাজার টন জেট ফুয়েল। আমদানিতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৭ হাজার ৬৭২ কোটি টাকা।
দেশি গ্যাস অনুসন্ধানই স্থায়ী সমাধান : জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে দেশের গ্যাসসংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। নতুন গ্যাসকূপ খনন, পুরোনো কূপের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, সমুদ্রভাগে অনুসন্ধান এবং গ্যাস সঞ্চালন অবকাঠামোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
পাশাপাশি নতুন এফএসআরইউ ও স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের মাধ্যমে সরবরাহ অবকাঠামো শক্তিশালী করতে হবে বলে মনে সরকার।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, সব মিলিয়ে সরকারকে এখন দ্বিমুখী কৌশল নিতে হচ্ছে। একদিকে জরুরি ভিত্তিতে এলএনজি ও জ্বালানি তেল আমদানি করে বিদ্যুৎ ও শিল্প খাত সচল রাখা। অন্যদিকে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, এলএনজির উৎস বহুমুখীকরণ, নতুন টার্মিনাল এবং কৌশলগত মজুত বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানিনিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তবে আমদানিনির্ভরতার কারণে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং ভর্তুকির বোঝা কমাতে দেশি জ্বালানি উৎপাদন বাড়ানোই হবে সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
