জ্বালানি সংকটের ধাক্কা : থাইল্যান্ডের অর্থনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তা

অনলাইন ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে থাইল্যান্ডের অর্থনীতিতে। এই পরিস্থিতিতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা থাইল্যান্ডের বিভিন্ন সম্পদ বিক্রি করে দিচ্ছেন। এতে দেশটির অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের আশা দুর্বল হয়ে পড়ছে।

প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চানভিরাকুলের নেতৃত্বে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে-এমন আশা ছিল। কিন্তু বর্তমান সংকট ও সিদ্ধান্তহীনতা সেই সম্ভাবনাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে প্রায় ১০০ ডলার প্রতি ব্যারেলে পৌঁছেছে। এতে এশিয়ার দেশগুলোর জ্বালানি নির্ভরতা আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। থাইল্যান্ড সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর একটি। কারণ দেশটি তার প্রায় অর্ধেক তেল ও গ্যাস মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে।

থাইল্যান্ডের সরকারি ঋণ ইতোমধ্যে সরকারের নির্ধারিত ৭০ শতাংশ সীমার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। এর পাশাপাশি যুদ্ধের আগেই দেশটির অর্থনীতি মূল্যপতন (ডিফ্লেশন)-এর মধ্যে ছিল। এই কারণে থাইল্যান্ডের পরিস্থিতি তার প্রতিবেশী অনেক দেশের তুলনায় বেশি কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ঠিক এমন সময় এই সংকট দেখা দিয়েছে, যখন দেশটির অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল। অনেক দিন পর আবার বিদেশি বিনিয়োগকারীরা থাইল্যান্ডে বিনিয়োগ বাড়াতে শুরু করেছিলেন। তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি মাসে বিদেশিরা প্রায় ১.৭ বিলিয়ন ডলারের থাই শেয়ার কিনেছিলেন।

ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চানভিরাকুলের বড় জয়ের পর দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংস্কারের আশা তৈরি হয়েছিল। এর আগে থাইল্যান্ড বহু বছর ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে গেছে। কিন্তু ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দ্রুত বিনিয়োগ কমিয়ে দিতে শুরু করেন। মার্চ মাসে তারা প্রায় ৮২৩ মিলিয়ন ডলারের শেয়ার বিক্রি করে দেন। একই সময়ে বন্ড বাজার থেকেও প্রায় ৭০৫ মিলিয়ন ডলার তুলে নেওয়া হয়। সব মিলিয়ে এটি অক্টোবর ২০২৪-এর পর সবচেয়ে বড় বিদেশি অর্থপ্রবাহের বেরিয়ে যাওয়ার ঘটনা।

এই মাসে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি হওয়ায় থাইল্যান্ডের অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তি এসেছে। এর ফলে থাই শেয়ারবাজার ও মুদ্রা (বাত) দ্রুত বেড়েছে। তবে বিনিয়োগকারীরা এখনো সতর্ক রয়েছেন। কারণ তেলের দাম যদি বেশি থাকে, তাহলে থাইল্যান্ডের অর্থনীতি ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। গ্রাসহপার অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের পোর্টফোলিও ম্যানেজার ড্যানিয়েল ট্যান বলেছেন, ‘অনেক বাজারই এখন দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সংকটের প্রভাবকে অবমূল্যায়ন করছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘বেশি জ্বালানি খরচ মানুষের খরচ কমিয়ে দিতে পারে এবং রপ্তানি ও পর্যটনকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, যা থাইল্যান্ডের অর্থনীতির দুইটি প্রধান ভিত্তি ‘

জেপিমরগানের এশিয়া শেয়ারবাজার কৌশলবিদ খোই ভু বলেছেন, থাই শেয়ারবাজার নিয়ে তাদের ব্যাংক এখনো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। তিনি জানান, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের আগে থাইল্যান্ডে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কিছুটা ভালো করার আশা তৈরি করেছিল। কিন্তু এখন জ্বালানি সংকট নতুন করে চাপ সৃষ্টি করছে, যা স্বল্পমেয়াদে অর্থনীতির জন্য বড় বাধা। তিনি আরো বলেন, জ্বালানি সংকটের পুরো প্রভাব এখনো বাজারে পুরোপুরি দেখা যায়নি। তাই বাজার এখনো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বড় ধাক্কা হিসাব করেনি।

বিশ্লেষক ও বিনিয়োগকারীরা বলছেন, চলমান যুদ্ধবিরতি খুবই ভঙ্গুর হওয়ায় থাইল্যান্ডের সামনে আরেকটি কঠিন বছর আসতে পারে। অন্যান্য এশিয়ান দেশের তুলনায় থাইল্যান্ড বেশি ঝুঁকিতে আছে, কারণ শুধু জ্বালানি নয়, দেশটির জ্বালানি উৎপাদনের বড় অংশই গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। এ ছাড়া তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানিও দিন দিন বাড়ছে। থাইল্যান্ডের অর্থনীতি ইতিমধ্যে দুর্বল অবস্থায় আছে। গত বছর দেশটির প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ২.৪ শতাংশ, যা প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় কম। একই সময়ে টানা ১২ মাস ধরে মূল্যস্ফীতি কমতে থাকায় ফেব্রুয়ারিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার কমাতে বাধ্য হয়েছিল।

অলস্প্রিং গ্লোবাল ইনভেস্টমেন্টসের সিঙ্গাপুরভিত্তিক পোর্টফোলিও ম্যানেজার গ্যারি ট্যান বলেছেন, বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এখন সাধারণ মত হলো থাইল্যান্ড একটি ‘নীতি সংকটে’ রয়েছে। তিনি আরো বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদ বাড়ানোর সুযোগ খুব কম, কারণ এতে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আবার সুদ কমানোরও খুব বেশি সুযোগ নেই। ফলে নীতি কার্যত কঠোর অবস্থাতেই থেকে যাচ্ছে।

সরকারি পরিকল্পনা সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, জ্বালানির দাম প্রতি ১ বাথ বাড়লে থাইল্যান্ডের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ২ বেসিস পয়েন্ট কমে যায়। এই কারণেই ব্যাংকক সরকার জ্বালানি ভর্তুকি বাড়াতে খুব সতর্ক অবস্থানে আছে।

আবার থাই শেয়ারবাজারের একজন বিনিয়োগ ব্যবস্থাপক নাটানোন্ট আরুনিয়াকানান্দা বলেছেন, তেলের দাম বাড়লে মানুষের খরচ কমে যেতে পারে, দেশের চলতি হিসাব ও মুদ্রা (বাত) দুর্বল হতে পারে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি কমানোর প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে এবং ভবিষ্যতে সুদের হার কমানোর সুযোগও সীমিত হয়ে যেতে পারে। যুদ্ধের কারণে থাইল্যান্ডের মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাসও বদলে গেছে। আগে যেখানে দাম কমার প্রবণতা ছিল, এখন ধারণা করা হচ্ছে পরিস্থিতি খারাপ হলে এ বছর গড় মূল্যস্ফীতি ৩.৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।

এটি বড় পরিবর্তন, কারণ বছরের প্রথম প্রান্তিকে মূল্যস্ফীতি ছিল মাইনাস ০.৫৪ শতাংশ (অর্থাৎ মূল্য কমছিল)। দেশটির অর্থমন্ত্রী একনিতি নিতিথানিপ্রাসাত বলেছেন, থাইল্যান্ডের অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো মোকাবিলার জন্য সরকারের হাতে খুব সীমিত সুযোগ বা অস্ত্র রয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, পরিস্থিতি সামলানো এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থাইল্যান্ডের মুদ্রা বাত চাপের মুখে পড়েছে। এ সময় প্রায় ২.৮ শতাংশ দরপতন হয়েছে। তবে গত সপ্তাহে যুদ্ধবিরতির পর কিছুটা ক্ষতি পুষিয়ে নিয়েছে। এশিয়ার অন্যান্য মুদ্রাও দুর্বল হয়েছে। ফিলিপাইনের পেসো এবং ইন্দোনেশিয়ার রুপিয়াও রেকর্ড নিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। তবে ২০২৫ সালে বাহাত প্রায় ৯ শতাংশ শক্তিশালী হওয়ায় থাইল্যান্ড কিছুটা বাড়তি সুরক্ষা পাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

তবুও দেশটি এখন খুব সতর্ক অবস্থায় চলছে। সরকার এখনই জ্বালানি ভর্তুকি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে বিদ্যুতের দাম স্থিতিশীল রাখতে অতিরিক্ত খরচ বহন করছে, যাতে গ্রীষ্মের আগে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকে। অর্থনৈতিক দিক থেকেও চাপ বাড়ছে। থাইল্যান্ডের সরকারি ঋণ এখন জিডিপির প্রায় ৬৬ শতাংশ, যা সরকারের নির্ধারিত ৭০ শতাংশ সীমার খুব কাছাকাছি। এতে বিনিয়োগকারীরা আশঙ্কা করছেন, সরকার ভবিষ্যতে ঋণের সীমা বাড়াতে বাধ্য হতে পারে। যদিও সরকার এখনই তা বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছে।

আবার অ্যাবারডিন ইনভেস্টমেন্টসের নাটানোন্ট আরুনিয়াকানান্দা সতর্ক করে বলেছেন, যদি এই সংকট এপ্রিলের পরও চলতে থাকে, তাহলে এটি শুধু খবরের বিষয় থাকবে না, বরং দেশের দৈনন্দিন অর্থনৈতিক কার্যক্রমকেও প্রভাবিত করতে শুরু করবে।

তথ্য সূত্র- রয়টার্স

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights