টাঙ্গাইলে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ভুল রিপোর্ট, চিকিৎসকের সতর্কতায় রক্ষা পেল রোগীর পা

অনলাইন প্রতিবেদক

টাঙ্গাইলে একটি পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ভুল এক্স-রে রিপোর্টের কারণে এক রোগীর চিকিৎসা জটিলতায় পড়ার আশঙ্কা দেখা দিলেও শেষ পর্যন্ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সতর্কতায় সম্ভাব্য বড় ধরনের ক্ষতি থেকে রক্ষা পেয়েছেন ওই রোগী। ঘটনার পর ডায়াগনস্টিক সেন্টার কর্তৃপক্ষ নিজেদের ভুল স্বীকার করে সংশোধিত রিপোর্ট প্রদান করেছে।

জানা যায়, ডাক্তারের পরামর্শে গত ১৫ জুলাই রাতে টাঙ্গাইলের সাবালিয়ায় একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে প্লাস্টার করা বাঁ পায়ের দুটি অ্যাঙ্গেল থেকে এক্স-রে করা হয় সাদিয়া আক্তার বৃষ্টি নামের এক রোগীর। বিষয়টি জরুরি হওয়ায় এক্স-রের ফিল্ম নিয়ে তাৎক্ষণিক অর্থোপেডিক সার্জন ডা. মো. মনিরুজ্জামান সুমনের কাছে যান রোগীর স্বজন। ফিল্ম দেখে তিনি সেটি পুনরায় ডায়াগনস্টিক সেন্টারে জমা দিয়ে রিপোর্টসহ আসতে বলেন। তার পরামর্শ অনুযায়ী ফিল্মের পাশাপাশি দুর্ঘটনার দিন (৮ দিন আগে) করা এক্স-রের রিপোর্ট ও ফিল্মও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে জমা দেওয়া হয়।

পরদিন রাতে ওই ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে রিপোর্ট সংগ্রহ করে আবার ওই ডাক্তারের কাছে গেলে তিনি রিপোর্ট দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেন। তার ভাষ্য, এক্স-রের ফিল্মে স্পষ্টভাবে ফ্র্যাকচার দেখা গেলেও রিপোর্টে ‘নরমাল’ উল্লেখ করা হয়েছে। এত পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে এমন ভুল রিপোর্ট কীভাবে দেওয়া হলো—এ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

পরে চিকিৎসকের পরামর্শে রোগীর স্বজন পুনরায় ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে বিষয়টি জানালে কর্তৃপক্ষ রিপোর্ট পুনর্মূল্যায়নের জন্য সব এক্স-রের ফিল্ম আবার জমা নেয়। প্রায় তিন ঘণ্টা পর তারা প্রথম রিপোর্টে ভুল থাকার বিষয়টি স্বীকার করে নতুন রিপোর্ট প্রদান করে। সংশোধিত রিপোর্টে রোগীর পায়ে ফ্র্যাকচার রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।

ঘটনাটি তাৎক্ষণিকভাবে ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পাবলিক রিলেশনস অফিসার কাজল হোসেনকে জানানো হলে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং রোগীর স্বজনকে জানানো হবে বলেও আশ্বাস দেন। তবে অভিযোগ অনুযায়ী, ঘটনার কয়েকদিন পেরিয়ে গেলেও এ বিষয়ে রোগীর স্বজনকে কোনো অগ্রগতি জানানো হয়নি।

এদিকে সংশোধিত রিপোর্ট নিয়ে পুনরায় বিশেষজ্ঞ ওই চিকিৎসকের কাছে গেলে তিনি ফ্র্যাকচার নিশ্চিত করে রোগীকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে নির্দেশনা দেন।

রোগীর স্বামী নাহিদুর রহমান হিমেল বলেন, রিপোর্ট রিভিউ করার জন্য রেডিওলজি বিভাগে জমা দিতে গেলে সেখানে দায়িত্বরত একজন কর্মকর্তা বিষয়টিকে স্বাভাবিক ভাবে নেন এবং জানান এটা অনলাইনে ঢাকায় পাঠানো হয়, ডাক্তার দেখে রিপোর্ট করেন। মাঝেমধ্যে ভুল হতেই পারে। তিনঘণ্টা পর যখন তিনি রিপোর্ট ডেলিভারি কাউন্টারের সামনে এসে আমাকে ফোন করে আপডেট রিপোর্ট ফেরত দেন, তখন আমি তার কাছে রিপোর্ট ভুলের কারণ জানতে চাইলে তিনি আবারও বলেন ‌‘এমন হতেই পারে মাঝে মাঝে’।

হিমেল আরো বলেন, চিকিৎসা নির্ণয়ের ক্ষেত্রে এক্স-রে রিপোর্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি চিকিৎসা-নথি। এই রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই চিকিৎসক চিকিৎসা পরিকল্পনা নির্ধারণ করেন। এমন পরিস্থিতিতে একটি ফ্র্যাকচারকে ‘নরমাল’ উল্লেখ করা শুধু একটি সাধারণ ভুল নয়; এটি রোগীর জীবন ও স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। সংশ্লিষ্ট অর্থোপেডিক চিকিৎসক যদি এক্স-রের ফিল্ম নিজে সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ না করতেন, তাহলে ভুল রিপোর্টের ভিত্তিতে আমার স্ত্রী প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হতে পারতেন। এর ফলে ফ্র্যাকচার আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারত, স্থায়ী শারীরিক ক্ষতি, অক্ষমতা কিংবা দীর্ঘমেয়াদি জটিলতার আশঙ্কা তৈরি হতে পারত।

প্রতিষ্ঠিত ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অনলাইনে কেন ফিল্ম পাঠিয়ে রিপোর্ট তৈরি করা হয় জানতে চাইলে পাবলিক রিলেশন অফিসার কাজল হোসেন বিষয়টির জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এমন ভুল কিভাবে হলো খতিয়ে দেখা হবে।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের টাঙ্গাইল কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আসাদুজ্জামান রুমেল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, এই বিষয়টি গুরুতর। তাদের বিরুদ্ধে আগেও অভিযোগ এসেছিল, সেটা সমাধান করা হয়েছে। লিখিত অভিযোগ দিলে খতিয়ে দেখা হবে।

টাঙ্গাইল সিভিল সার্জন ডা. ফরাজী মুহাম্মদ মাহবুবুল আলম মঞ্জু বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে চিকিৎসা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডায়াগনস্টিক রিপোর্টে এমন ভুল রোগীর চিকিৎসা বিলম্বিত হওয়ার পাশাপাশি গুরুতর শারীরিক জটিলতার কারণ হতে পারে। এ ধরনের অবহেলাপূর্ণ রিপোর্ট প্রদান চিকিৎসা সেবার মান, পেশাগত দায়িত্ব ও রোগীর নিরাপত্তার পরিপন্থী। একই সঙ্গে এটি সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবার প্রতি আস্থা নষ্ট করে এবং ভবিষ্যতে অন্য রোগীদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার আশঙ্কা সৃষ্টি করে। একটি স্বীকৃত ডায়াগনস্টিক সেন্টারের এ ধরনের দায়িত্বহীনতা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তাই এ ধরনের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights