টিকা সংকটে হামের বিস্তার

জয়শ্রী ভাদুড়ী

দেশে বাড়ছে হামের প্রকোপ। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা। এরই মধ্যে ঢাকায় একাধিক শিশু মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। হাসপাতালের শয্যা ছাড়িয়ে মেঝে, করিডর পর্যন্ত পৌঁছেছে হামের রোগী।

রোগী সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতালগুলো। গত শনিবার হামে আক্রান্ত হয়ে রাজশাহীতে তিন শিশু এবং ময়মনসিংহে আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও খুলনাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) উপ-পরিচালক ড. মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদ গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, দেশে হামের সংক্রমণ এখন শুধু নির্দিষ্ট কোনো এলাকায় সীমাবদ্ধ নেই। রাজশাহী, খুলনাসহ প্রায় সারা দেশেই এটি ছড়িয়ে পড়ছে। সাধারণত বসন্তকালে শুরু হওয়া এ ধরনের সংক্রমণ প্রায় দুই মাস স্থায়ী হতে পারে। ইতোমধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা ১ হাজার ৫০০ ছাড়িয়েছে। হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সঠিক তথ্য এখনো আমাদের কাছে নেই। তিনি আরও বলেন, সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, নয় মাসের কম বয়সি শিশুদের মধ্যেই এখন বেশি সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে। অথচ এই বয়সে তাদের টিকা নেওয়ার কথা নয়। অর্থাৎ টিকা পাওয়ার আগেই তারা আক্রান্ত হচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় ‘আউটব্রেক রেসপন্স’ হিসেবে আক্রান্ত এলাকাগুলো চিহ্নিত করে সেখানে ব্যাপক টিকা কর্মসূচি চালানো হতে পারে। এমনকি আগে টিকা নেওয়া শিশুদেরও অতিরিক্ত ডোজ দেওয়া হতে পারে। টিকা না নেওয়া শিশুরাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। তাই অভিভাবকদের সময়মতো টিকা নিশ্চিত করতে হবে। শাহরিয়ার সাজ্জাদ জানান, টিকাদানের পরবর্তী কৌশল নির্ধারণ করতে আজ (সোমবার) ন্যাশনাল ইমিউনাইজেশন টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজরি কমিটির বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বর্তমানে রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে সবচেয়ে বেশি হামের রোগী চিকিৎসা নিচ্ছে। ১০০ শয্যার এ হাসপাতালে এখন ১৩০ জন রোগী ভর্তি আছে। অনেককেই করিডর ও বারান্দায় রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। রাজধানীর শনির আখড়া থেকে আট মাস বয়সি সন্তান আবদুল্লাহকে নিয়ে গত ১৯ মার্চ থেকে এ হাসপাতালের দুই নম্বর কেবিনের এক নম্বর বিছানায় আছেন সাবিনা ইয়াসমিন। তিনি বলেন, প্রথমে জ্বর, ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, প্রস্রাবের ইনফেকশন নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলেও পরে জানতে পারি ছেলে হামে আক্রান্ত। ছেলেকে তিন মাস বয়সে টিকা দেওয়া হয়েছিল। এরপর অসুস্থতার কারণে আর টিকা দেওয়া হয়নি। এ হাসপাতালে হামে এক শিশুর মৃত্যুও ঘটেছে। ইপিআইয়ের আওতায় শিশুর ৯ মাস বয়সে এমএমআর-এর প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এবং বিভিন্ন মেডিকেল কলেজের শিশু ওয়ার্ডে হামের রোগীর চাপ অনেক বেশি বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন গতকাল এক অনুষ্ঠানে বলেন, হাসপাতালে সংকট নিরসনে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও করা হচ্ছে। দেশে হামের সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় টিকাদান কর্মসূচির কথা ভাবা হচ্ছে। যেসব শিশু এখনো হামের টিকা পায়নি, তাদের আওতায় আনতে সরকার ৬০৪ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ দিয়েছে। টিকা সংগ্রহ সম্পন্ন হলে সারা দেশে বিশেষ ক্যাম্পেইন চালানোর কথাও ভাবছে সরকার। এসময় রাজশাহী মেডিকেলে কলেজ হাসপাতালে ১১ দিনে ভেন্টিলেশনের অভাবে ৩৩ শিশুর মৃত্যুতে দুঃখ প্রকাশ করেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভেন্টিলেটর সংকট মোকাবিলায় সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছে। চারটি ভেন্টিলেটর মেশিন সোমবারেই পৌঁছে যাবে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী রামেক হাসপাতালে গিয়ে সার্বিক অবস্থা পরিদর্শন করবেন। পাশাপাশি বিভিন্ন জায়গা থেকে আরও ১২টি ভেন্টিলেটর পাওয়ার প্রতিশ্রুতিও পাওয়া গেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত বছর সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে (ইপিআই) বিঘ্ন, টিকার সংকট ও মাঠপর্যায়ের কর্মীদের আন্দোলনের কারণে সময়মতো হামের টিকা না পাওয়াই এ প্রাদুর্ভাবের অন্যতম প্রধান কারণ। সূত্রমতে, ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পঞ্চম সেক্টর প্রোগ্রাম থেকে বের হয়ে আসার পরিকল্পনা করে অন্তর্বর্তী সরকার। সেক্টর প্রোগ্রাম বন্ধ থাকায় ইপিআইয়ের টিকা কেনা হয়নি। ফলে ২০২৫ সালে দেশে ইপিআইয়ের টিকা সংকট দেখা দেয়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিন অ্যান্ড ইমিউনাইজেশনের (গ্যাভি) সিএসও কনস্টিটিউয়েন্সি স্টিয়ারিং কমিটির চেয়ারপারসন ড. নিজাম উদ্দিন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, গত প্রায় এক বছর ধরে ইপিআইয়ের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে ভ্যাকসিনের সরবরাহ ছিল না, আবার কর্মীদের আন্দোলনের কারণে মাঠপর্যায়ে টিকা ঠিকমতো দেওয়া হয়নি। ফলে বহু শিশু টিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

হামে শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ : সম্প্রতি হামে আক্রান্ত হয়ে শতাধিক শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় দুই মন্ত্রীকে সারা দেশ ঘুরে পরিস্থিতি পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত সরকারি দলের সভা শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম মনি।এ সময় তিনি জানান, সরকারি দলের সভায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ব্রিফ করা হয়। সেখানে হামে আক্রান্ত হয়ে শতাধিক শিশুর মৃত্যুর বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসে। তিনি দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন। এ বিষয়ে দুজন মন্ত্রীকে দায়িত্ব দিয়েছেন, সারা দেশ ঘুরে হামের প্রাদুর্ভাবের বর্তমান অবস্থা সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে ব্যবস্থা নিতে।

সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হামে আক্রান্ত হয়ে শিশুমৃত্যুর খবর আসছে। এর মধ্যে শুধু রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই হাম ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে গত তিন মাসে ৬৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এমনকি সারা দেশে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হচ্ছে।

বৈঠকে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান চিফ হুইপ। তিনি বলেন, জুলাই সনদ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সংবিধান সংশোধন করে যা করার, তা-ই করা হবে। সংসদে আলোচনা করে জুলাই সনদ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী তেলের পর্যাপ্ত মজুত থাকা বিষয়ে ৩০০ বিধিতে সংসদ অধিবেশনে বক্তব্য দেবেন বলে জানান তিনি। এ ছাড়া সংসদীয় কমিটির সভায় জ্বালানি তেল নিয়ে কৃত্রিম সংকট নিরসনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, তেলের কোনো সংকট নেই। পর্যাপ্ত তেল থাকার পরও তেল সংগ্রহে যে সংকট চলছে, তা নিরসনের জন্য প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন।

গত শনিবার বিকালে সরকারি দলের সভা শুরু হয়। সন্ধ্যায় ওই সভা মুলতবি করা হয়। সভায় সংসদ অধিবেশনে সরকারি দলের ভূমিকা, সরকারের চলমান কার্যক্রম, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়েও আলোচনা হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights