ট্যাংকের নলে ফুলের মালা

সৈয়দ আবদাল আহমদ

৬ নভেম্বর মধ্যরাতের পর সেনানিবাসে সিপাহিদের অভ্যুত্থান শুরু হলে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ গভীর রাতে ও ভোরে রাজপথে নেমে আসেন। সাধারণ জনগণ ও সশস্ত্র সিপাহিরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কোলাকুলি করেন। বিপ্লবের সবচেয়ে চাক্ষুষ ও আকর্ষণীয় দৃশ্য ছিল সাধারণ মানুষের সেনাবাহিনীর ট্যাঙ্কের নলে ফুলের মালা পরিয়ে দেওয়া। এটি ছিল সামরিক বাহিনীর প্রতি সাধারণ মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থন ও ভালোবাসার এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ।

বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন একটি দিন এসেছিল, যেদিন সামরিক ট্যাংকের নলে সাধারণ মানুষ ভালোবেসে ফুলের মালা পরিয়ে দিয়েছিলেন? ট্যাংক যেখানে যুদ্ধে ব্যবহৃত হয়, সেখানে জনতা ফুল দিয়ে সাজিয়ে দেন সেই অস্ত্র! ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর রাজধানী ঢাকায় সৃষ্টি হয়েছিল এমনই এক রূপকথার মতো দৃশ্যের। এ ঐতিহাসিক ঘটনাটি হলো ‘সিপাহি-জনতার বিপ্লব’।

সে ছিল এক থমথমে সময়। চারদিকে অস্থির অবস্থা। দেশের মানুষ খুব দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছিলেন। ঠিক তখনই অলৌকিক এক কাণ্ড ঘটে যায়! ৬ নভেম্বর রাতের অন্ধকার পেরিয়ে যখন ৭ নভেম্বরের ভোর হচ্ছিল, তখন হঠাৎ করেই ঢাকার সেনানিবাস থেকে বের হতে থাকেন সাধারণ সৈনিক বা সিপাহিরা। আর তাঁদের স্বাগত জানাতে ভোরের আলো ফোটার আগেই রাজপথে নেমে আসেন লাখো লাখো সাধারণ মানুষ।

সেদিন কোনো হিংসা ছিল না, কোনো মারামারি ছিল না। ছিল শুধু দেশের জন্য বুকভরা ভালোবাসা। সাধারণ মানুষ আর সিপাহিরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে আনন্দে মেতে উঠলেন। তাঁরা স্লোগান দিচ্ছিলেন-‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই, দেশ বাঁচানোর বিকল্প নাই!’

বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে সিপাহি-জওয়ানদের কাছে তাঁদের প্রিয় তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান যখন জনতার সামনে এলেন, তখন সবার আনন্দ যেন আর ধরে না। সাধারণ মানুষ আর দেশের সেনারা মিলেমিশে এক হয়ে গেলেন। ঢাকার রাস্তায় সেনাবাহিনীর যে বড় বড় ট্যাংক চলছিল, দেশের কিশোর-তরুণরা ভালোবেসে সেগুলোর ওপর চড়ে বসলেন। আর তখনই ট্যাংকের নলে পরিয়ে দেওয়া হলো গাঁদা ফুলসহ নানা ফুলের মালা! দেশের বিপদে এভাবেই সেদিন সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল।

৬ নভেম্বর মধ্যরাতের পর সেনানিবাসে সিপাহিদের অভ্যুত্থান শুরু হলে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ গভীর রাতে ও ভোরে রাজপথে নেমে আসেন। সাধারণ জনগণ ও সশস্ত্র সিপাহিরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কোলাকুলি করেন। বিপ্লবের সবচেয়ে চাক্ষুষ ও আকর্ষণীয় দৃশ্য ছিল সাধারণ মানুষের সেনাবাহিনীর ট্যাঙ্কের নলে ফুলের মালা পরিয়ে দেওয়া। এটি ছিল সামরিক বাহিনীর প্রতি সাধারণ মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থন ও ভালোবাসার এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ।

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার বিপ্লবের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল সেনাবাহিনীর সাধারণ সিপাহি এবং জনগণের অভূতপূর্ব ও স্বতঃস্ফূর্ত এই ঐক্য এবং গৃহবন্দি সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের মুক্তি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তৎকালীন এ অনিশ্চয়তার মধ্যে এ এক অভাবনীয় দৃশ্যের অবতারণা করেছিল।

৬ নভেম্বর মধ্যরাতের পর সেনানিবাসে সিপাহিদের অভ্যুত্থান শুরু হলে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ গভীর রাতে ও ভোরে রাজপথে নেমে আসেন। সাধারণ জনগণ ও সশস্ত্র সিপাহিরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কোলাকুলি করেন। বিপ্লবের সবচেয়ে চাক্ষুষ ও আকর্ষণীয় দৃশ্য ছিল সাধারণ মানুষের সেনাবাহিনীর ট্যাংকের নলে ফুলের মালা পরিয়ে দেওয়া। এটি ছিল সামরিক বাহিনীর প্রতি সাধারণ মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থন ও ভালোবাসার এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ। ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের পর গৃহবন্দি হওয়া সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে সিপাহিরা মুক্ত করে বীরের বেশে বাইরে নিয়ে আসেন। মুক্ত হয়ে উপস্থিত সৈনিক ও জনতার উদ্দেশে সেদিন তাঁর হাত নাড়ার দৃশ্যটি ছিল এ বিপ্লবের অন্যতম আইকনিক মুহূর্ত। ঢাকার রাজপথে সেদিন ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার’, ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’, ‘সিপাহি-জনতা ভাই ভাই’ এবং ‘জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ’ স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে উঠেছিল। এ বিপ্লবের ফলে খালেদ মোশাররফের পাল্টা অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয় এবং জিয়াউর রহমান মুক্ত হন। এ অবিস্মরণীয় বিপ্লবের মাধ্যমে তাঁকে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে সমাসীন করা হয়।

সামরিক ছাউনি থেকে শুরু হওয়া একটি বিদ্রোহ কীভাবে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সাধারণ মানুষের স্বজাত্যবোধ ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে একটি জনবিপ্লবের রূপ নিয়েছিল, সেটিই ছিল ৭ নভেম্বরের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। সিপাহিদের ভাষায় সেদিন ছিল ‘দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার দিন’।

♦ লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও সরকারের প্রধান তথ্য অফিসার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights