ট্রফি ভরা আবাহনী এখন ট্রফিশূন্য

মনোয়ার হক

খেলাধুলায় এক একটি ট্রফি ইতিহাসের পাতায় লেখা হয়ে যায়। যেকোনো খেলায় চ্যাম্পিয়ন হওয়াটা গৌরবের। রানার্সআপের গুরুত্ব কম নয়। কত সাধনা কত পরিশ্রমে বিজয় আসে তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের ইতিহাসে ঢাকা আবাহনী এক অনন্য নাম। ১৯৭২ সালে ঢাকা প্রথম বিভাগ ফুটবল লিগে অভিষেকের মাধ্যমে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে আবাহনী ক্রীড়া চক্রের যাত্রা। এরপর ক্রিকেট, হকি, টেবিল টেনিস দল গড়ে নিজেদের অবস্থান ভালোভাবে জানান দিয়েছে তারা।

১৯৭২ থেকে ২০২৬, এ ৫৪ বছরের ইতিহাসে আবাহনীর যে সাফল্য তা সত্যিই ঈর্ষণীয়। বড় তিন খেলা ফুটবল, ক্রিকেট ও হকি লিগে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ শিরোপা জেতার রেকর্ড তাদেরই। ১৯৭৪ সালে ফুটবল লিগে শিরোপা দিয়ে তাদের সাফল্য শুরু। ফুটবলে সর্বোচ্চ ১৭ বার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে আবাহনী। ক্রিকেটে তো ধরাছোঁয়ার বাইরে। ২৩ বার লিগ জিতেছে তারা। হকিতেও বিজয় নিশানা উড়িয়েছে অসংখ্যবার। টেবিল টেনিসে জাতীয় চ্যাম্পিয়ন ছাড়াও নারী-পুরুষ মিলিয়ে পাঁচবার করে লিগও জিতেছে। শুধু দেশ নয় বিদেশের মাটিতেও শিরোপার জয়গান গেয়েছে। জিতেছে নাগজি ট্রফি, চামর্স কাপেও চ্যাম্পিয়ন হয়েছে।

চ্যাম্পিয়নের ট্রফি ছাড়াও রানার্সআপে আবাহনী ছিল ভরপুর। আবাহনীর বৈঠক খানায় শোকেসে যেভাবে ট্রফিগুলো সাজানো থাকত, যা দেখলেই মন জুড়িয়ে যেত। শোকেসই যেন ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ট্র্যাজেডি হচ্ছে সেই শোকেসই এখন ট্রফিশূন্য বললেও ভুল হবে না। হাতেগোনা ১০-১২টা ট্রফি অযত্নে পড়ে আছে। যা দেখে চোখেও পানি চলে আসে। কোথায় গেল ইতিহাস গড়া মূল্যবান এ ট্রফিগুলো। আবাহনীর সাবেক অধিনায়ক ও বর্তমানে ফুটবল দলের ম্যানেজার সত্যজিত দাশ রুপু জানালেন, ‘আমি ১৯৮৬ সালে আবাহনীতে যোগ দিই। তখনই দেখেছি শোকেসে ভরপুর ট্রফি। ৫৪ বছরের কম করে হলেও ৩০০ ট্রফি তো আবাহনীর শোকেসে ছিল।’

সেই স্বপ্নের ট্রফিগুলো গেল কোথায়। আবাহনীর জন্য কালো দিন ছিল ১৯৮২ সাল। সেবার বিনা কারণে দলের চার ফুটবলার কাজী সালাউদ্দিন, আশরাফ উদ্দিন আহমেদ চুন্নু, গোলাম রব্বানী হেলাল ও কাজী আনোয়ারকে জেলে পাঠানো হয়েছিল। যা বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসেও লজ্জার। আরেকটি কালো দিন না, আরেক কালো রাতে আবাহনীর সব ইতিহাস ছারখার করে দিয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়েছিল। সে দিন ঢাকায় কি ধরনের ভায়োলেন্স হয়েছিল তা কারোর অজানা নয়। কিন্তু ক্লাব ভায়োলেন্সের শিকার হবে কেন? তারপর আবার যে ক্লাব দেশের গর্ব। সেদিন হঠাৎ করেই এক দল সন্ত্রাসী আবাহনী ক্লাবে হামলা চালায়। ক্লাবের ভিতর ঢুকে ব্যাপক ভাঙচুর করে। শোকেসে সাজানো ট্রফিগুলো বস্তায় পুড়ে নিয়ে যায়। চ্যাম্পিয়ন ও রানার্সআপ দলের অসংখ্য গ্রুপ ছবিও মাটির সঙ্গে মিশিয়ে ফেলা হয়। যারা সন্ত্রাসীদের থামানোর চেষ্টা করেন তাদের ওপর গুলি চালানোর হুমকি দেওয়া হয়।

কারা এ জঘন্য কাজ করেছে তাদের চিহ্নিত করা যায়নি। তবে এর সঙ্গে বিশেষ মহলের ইন্ধন ছিল তা নিশ্চিত। কিছু দিন পর কিছু ট্রফি পাওয়া যায়। ক্লাবে এসে কিছু তরুণ তা দিয়ে যায়। সব মিলিয়ে ১০-২০টি ট্রফি উদ্ধার হয়েছে। আড়াই শ ট্রফিরই হদিস মেলেনি। আর কখনো পাওয়া যাবে তা মনে হয় না। ৫ আগস্টের এ ঘটনার কয়েক দিন পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠন হয়। নতুন ক্রীড়া উপদেষ্টারও দেখা মেলে। অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে আবাহনীর মতো ক্লাবে এত বড় ঘটনা ঘটল। ক্রীড়া উপদেষ্টা আবাহনী ক্লাবে এসে পরিদর্শন করলেন না। এ নিয়ে তাঁর বক্তব্যও ছিল না। রুপু বললেন, ‘যা হয়ে গেছে তা তো আর খুঁজে পাব না। তবে আবাহনী জন্ম হয়েছে ট্রফি জেতার জন্য। আবার আমরা নতুন করে শোকেস সাজাব।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights