ট্রাম্পের চীন সফর: আসল বিজয়ী কে?
অনলাইন ডেস্ক
ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন বেইজিংয়ের মাটিতে পা রাখছেন, তখন তার হাতে তাসের সংখ্যা খুবই সীমিত। দীর্ঘ ১৫ মাস আগে ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে যে আত্মবিশ্বাস দেখিয়েছিলেন, বর্তমানে তার ছিটেফোঁটাও অবশিষ্ট নেই। সে সময় হোয়াইট হাউসের উপদেষ্টারা দাবি করেছিলেন, ব্যাপক শুল্ক আরোপের মাধ্যমে বেইজিংকে মাথানত করতে বাধ্য করা হবে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। ৫৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বিশাল অর্থনৈতিক সম্পর্কের সমীকরণে ওয়াশিংটন এখন রক্ষণাত্মক অবস্থানে চলে গেছে।
চীনা সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমস বর্তমান পরিস্থিতিকে অত্যন্ত কঠোরভাবে ব্যাখ্যা করেছে। তারা ওয়াশিংটনকে বর্ণনা করছে এমন এক ‘পঙ্গু দৈত্য’ হিসেবে, যে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সাথে সংঘর্ষ, তেলের মূল্য বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ মুদ্রাস্ফীতির চাপে জর্জরিত। বেইজিংয়ের বিশ্লেষকরা বেশ ঘটা করেই প্রচার করছেন, এবার ট্রাম্পই চুক্তির আশায় চীনে এসেছেন, শি জিনপিং নন। ট্রাম্পের জন্য এখন একটি বাণিজ্য চুক্তি যতটা জরুরি, শি জিনপিংয়ের কাছে সেটি তার চেয়ে অনেক কম গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অর্থনৈতিক চিত্র ট্রাম্পের জন্য কোনো সুখবর বয়ে আনছে না। এপ্রিল মাসে দেশটিতে মুদ্রাস্ফীতির হার ৩.৮ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে, যা গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ট্রাম্পের প্রত্যাশা ছিল ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার কমাবে কিন্তু বর্তমান মুদ্রাস্ফীতির বাজারে সেই সম্ভাবনা এখন শূন্যের কোঠায়। অন্যদিকে ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের নেতিবাচক প্রভাব সরাসরি ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ও মার্কিন অর্থনীতির ওপর এসে পড়ছে। এই অস্থিতিশীলতা পরোক্ষভাবে চীনের উত্থানকেই ত্বরান্বিত করছে।
প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে চীন এখন অভাবনীয় গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। শি জিনপিংয়ের ‘মেড ইন চায়না ২০২৫’ প্রকল্পের সুফল এখন হাতেনাতে পাওয়া যাচ্ছে। এর বড় উদাহরণ হলো বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বিওয়াইডি, যারা ইতিমধ্যে টেসলাকে পেছনে ফেলে ইউরোপের বাজারে আধিপত্য বিস্তার শুরু করেছে। যেখানে চীন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সবুজ জ্বালানির পেছনে ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে, সেখানে ট্রাম্প প্রশাসন এখনো কয়লা এবং পুরনো আমলের প্রযুক্তি আঁকড়ে ধরে আছে, যা প্রতিযোগিতার দৌড়ে আমেরিকাকে পিছিয়ে দিচ্ছে।
ডলারের বৈশ্বিক আধিপত্যও এখন ট্রাম্পের নীতির কারণে চ্যালেঞ্জের মুখে। মার্কিন ঋণের বোঝা ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার স্পর্শ করার পথে থাকায় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে শি জিনপিং ইউয়ানকে বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো যখন মার্কিন নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারাচ্ছে, তখন জ্বালানি বাণিজ্যে ‘পেট্রো-ইউয়ান’ চালুর সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। ট্রাম্পের বিশৃঙ্খল নীতিগুলোই মূলত ব্রিকস দেশগুলোকে ডলারের বিকল্প খুঁজতে উৎসাহ দিচ্ছে।
অবশ্য চীনের অর্থনীতি যে সবদিক থেকে নিখুঁত, তা বলা যাবে না। দেশটির আবাসন সংকট এখনো কাটেনি এবং স্থানীয় সরকারের ঋণ ও উচ্চ শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব বেইজিংয়ের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ। তবে সব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও চীনের রপ্তানি খাত এপ্রিল মাসে ১৪ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। বিশেষ করে যাত্রীবাহী গাড়ি রপ্তানি গত বছরের তুলনায় প্রায় ৮৫ শতাংশ বেড়েছে, যা প্রমাণ করে যে ট্রাম্পের আরোপিত শুল্ক চীনের বাণিজ্য উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে দমাতে ব্যর্থ হয়েছে।
ইরান ইস্যুটি এই দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলেছে। একদিকে যখন দুই নেতা আলোচনায় বসছেন, তখন মার্কিন নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালীতে চীনের প্রধান জ্বালানি সরবরাহকারী ইরানের তেলবাহী জাহাজগুলো আটকানোর চেষ্টা করছে। এই বৈপরীত্য সত্ত্বেও যে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে, তার কারণ দুই নেতাই অন্তত স্থিতিশীলতার একটি বাহ্যিক চিত্র বিশ্বকে দেখাতে চান। তবে ইরান বা তাইওয়ান ইস্যুতে কোনো নাটকীয় অগ্রগতির সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
এই সফর থেকে ট্রাম্প হয়তো কিছু সয়াবিন বা বোয়িং বিমান বিক্রির মৌখিক প্রতিশ্রুতি নিয়ে ফিরতে পারেন, যা বড়জোর আসন্ন নির্বাচনের জন্য একটি সান্ত্বনা পুরস্কার হতে পারে। কিন্তু চীনের ওপর নিজের ইচ্ছাকে চাপিয়ে দেওয়ার যে রণকৌশল নিয়ে তিনি যাত্রা শুরু করেছিলেন, তা বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় কেবল একটি রাজনৈতিক রসিকতা ছাড়া আর কিছুই নয়। দুই নেতার করমর্দনের দৃশ্য হয়তো বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সাময়িক স্বস্তির বার্তা দেবে, তবে ক্ষমতার ভারসাম্য এখন স্পষ্টভাবেই বেইজিংয়ের দিকে ঝুঁকে আছে।
এশিয়া টাইমসের বিশ্লেষণ
