ট্রাম্প কেন ইউক্রেনের বদলে পুতিনকে সহায়তা করছেন?

অনলাইন ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্রের ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের গৃহীত বিভিন্ন কৌশল ও নীতি প্রকৃতপক্ষে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার সামরিক তৎপরতাকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহায়তা করছে। রাজনৈতিক মহলে নানা চটকদার আলোচনার আড়ালে যুদ্ধক্ষেত্রের আসল বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ ধারণ করেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেনকে প্রয়োজনীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহ থেকে বঞ্চিত করে কার্যত দেশটির হাত বেধে দিচ্ছেন, যা রাশিয়ার দীর্ঘপাল্লার আক্রমণকে আরও সহজ করে তুলছে। অন্যদিকে, ইউক্রেন যখন নিজেদের সক্ষমতায় দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে রাশিয়ার সবচেয়ে সংবেদনশীল জ্বালানি ও তেল শোধনাগারগুলোতে সফল হামলা চালিয়ে মস্কোকে কোণঠাসা করছে, ঠিক তখনই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কিয়েভকে অনুরোধ জানাচ্ছেন তারা যেন রাশিয়ার ভূখণ্ডে এসব কার্যকর আঘাত বন্ধ রাখে। ফলে ইউক্রেনকে রক্ষায় মার্কিন সহায়তা হ্রাসের এই নীতি পুতিনের কৌশলগত সুবিধাকেই বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

স্থলযুদ্ধের ময়দানে ইউক্রেনীয় বাহিনী তুলনামূলকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা অস্ত্রের ওপর কম নির্ভরশীল হওয়ায় নিজেদের সামরিক কৌশলে দূরদর্শিতার স্বাক্ষর রাখছে। সেখানে ইউক্রেন নিজেদের উদ্যোগে পরিচালিত অভিযানের মাধ্যমে সাফল্য পাচ্ছে এবং রুশ সামরিক শক্তির ওপর বড় ধরনের আঘাত হানছে। ‘অপারেশন ভিভাল্ডি’ নামক এক গোপনীয় ও কৌশলী অভিযানের মাধ্যমে ইউক্রেনীয় বাহিনী লাইমান এলাকা থেকে রুশ বাহিনীকে পেছনে হটিয়ে দিয়ে লুগানস্ক অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

তৃতীয় আর্মি কোরের অধিনায়ক জেনারেল আন্দ্রি বিলেতস্কি নিশ্চিত করেছেন যে, চরম তথ্য গোপনীয়তার নীতি বজায় রেখে এই চার ধাপের অভিযানের প্রথম ধাপ সফলভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে। ক্ষুদ্র ও সুপ্রশিক্ষিত পদাতিক দল, ড্রোন প্রযুক্তির নিখুঁত সমন্বয় এবং ক্রমাগত রসদ সরবরাহের মাধ্যমে ইউক্রেন কোনো ধরনের ব্যাপক প্রাণহানি ছাড়াই ভূখণ্ড মুক্ত করে চলেছে। এই অভিযানের ফলে রুশ বাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে এবং তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছে। ইউক্রেনীয় ডেপুটি কমান্ডার মাকসিম জোরিনের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে এ অভিযানের মাধ্যমেই সবচেয়ে বেশি সংখ্যক রুশ অফিসার ও সদস্যকে বন্দি করা সম্ভব হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতিদিন গড়ে দেড় হাজারের বেশি রুশ সেনা হতাহত হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে এটি স্পষ্ট, যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য ছাড়াই স্থলভাগে ইউক্রেন নতুন যুদ্ধের কৌশলে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পেরেছে।

তবে স্থলভাগের এই অগ্রগতির ঠিক বিপরীত ছবি দেখা যাচ্ছে আকাশ ও দীর্ঘপাল্লার যুদ্ধে। মার্কিন প্রশাসন ইউক্রেনকে অত্যাধুনিক প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দেওয়া বন্ধ রাখায় দেশটি বর্তমানে রাশিয়ার ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিরুদ্ধে পুরোপুরি অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। রাশিয়া নিয়মিত হাজার হাজার ড্রোন ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে কিয়েভসহ ইউক্রেনের বিদ্যুৎ, পানি ও মৌলিক অবকাঠামোর ওপর হামলা চালিয়ে যাচ্ছে এবং কিয়েভ সেসব ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রোধ করতে পারছে না। কিয়েভকে আত্মরক্ষা থেকে বঞ্চিত করার এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আসছে শীত মৌসুমে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে মস্কো। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন রাজ্য দপ্তর ইউক্রেনের কাছে কিছু পুরনো প্রযুক্তি ও অকার্যকর ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা বিক্রির অনুমোদন সংক্রান্ত যে ঘোষণা দিয়েছে, তা শুধুই একটি রাজনৈতিক কৌশল বা প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়। বাস্তবে এসব ব্যবস্থা আসন্ন শীতে ইউক্রেনকে রুশ হামলা থেকে রক্ষা করতে কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখবে না। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নিঃশ্চুপ অবস্থান ও প্যাট্রিয়ট না দেওয়ার সিদ্ধান্তই বর্তমানে পুতিনের জন্য সবচেয়ে বড় সামরিক হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে, কিয়েভ যখন নিজেদের তৈরি প্রযুক্তির সাহায্যে রাশিয়ার অভ্যন্তরে গভীর কৌশলগত আঘাত হানছে, তখন ট্রাম্পের ভূমিকা অত্যন্ত বিতর্কিত হয়ে উঠেছে। ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় রাশিয়ার ডিজেল উৎপাদন ও শোধনাগারগুলো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে; এমন অজুহাত তুলে ট্রাম্প প্রকাশ্যেই ইউক্রেনকে অনুরোধ করেছেন যেন তারা রুশ জ্বালানি ক্ষেত্রে হামলা চালানো থেকে বিরত থাকে। বিশ্ববাজারে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির আসল কারণ ইরান কেন্দ্রিক সংকট হলেও ট্রাম্পের সমস্ত দায় ইউক্রেনের ওপর চাপানোর প্রচেষ্টা এবং কিয়েভকে তাদের সবচেয়ে সফল কৌশলগত আক্রমণ বন্ধ করতে বাধ্য করার নীতি স্পষ্ট।

ট্রাম্প একপর্যায়ে ইউক্রেন ও রাশিয়া উভয় পক্ষই জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধের চুক্তিতে পৌঁছেছে বলে মিথ্যা দাবি করলেও বাস্তবে ইউক্রেনীয় বাহিনী সিজরান ও ইয়ারোস্লাভল শোধনাগারে হামলা অব্যাহত রেখেছে। প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ট্রাম্পের এই দাবি প্রকাশ্যে খণ্ডন করে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, রাশিয়ার বিরুদ্ধে তাদের এই হামলা ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা থামবে না। এই পুরো পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে, নিজের সুবিধাজনক ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়ে ইউক্রেন যেভাবে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই চালাচ্ছে, সেখানে মার্কিন প্রশাসনের নীতি প্রকারান্তরে ক্রেমলিনের হাতকেই শক্তিশালী করে চলেছে।

সূত্র: এশিয়া টাইমস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights