ট্রেনে বন্ধ লাভজনক পণ্য পরিবহন

ইমরান এমি, চট্টগ্রাম

প্রতি বছর বিপুল লোকসানে থাকা রেলওয়ে দুই-একটি ছাড়া প্রায় প্রতিটি ট্রেনই চলে লোকসানের ওপর ভর করে। তবে লোকসানের আবর্তে ঘুরপাক খাওয়া রেলের পণ্যবাহী ট্রেনগুলো কিন্তু এর বাইরে। এই ট্রেনগুলো লাভজনক। ডিসেম্বর মাসে যাত্রীবাহী ট্রেনের চাহিদা বেড়ে যাওয়ার কারণে পণ্যবাহী ট্রেন আট দিন বন্ধ রেখে চালানো হয়েছে যাত্রীবাহী ট্রেন। রেলওয়েসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এর কারণ রেলওয়ে ইঞ্জিনসংকট। উৎসবকালীন যাত্রীবাহী ট্রেনের চাহিদা বাড়তি থাকার কারণে পণ্যবাহী ট্রেনের ইঞ্জিনে ভরসা করতে হয়েছে। যার ফলে পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল বন্ধ করে যাত্রীবাহী ট্রেন চালাতে বাধ্য হয়েছে রেলওয়ে। রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সুবক্তগীন বলেন, রেলওয়ে যাত্রীর পাশাপাশি পণ্য পরিবহনকেও সমান গুরুত্ব দেয়। দীর্ঘদিন ধরে ইঞ্জিনসংকটের কারণে আমরা ট্রেন পরিচালনায় হিমশিম খাচ্ছি। ডিসেম্বর মাসে স্পেশাল ট্রেন পরিচালনাসহ যাত্রীবাহী ট্রেনগুলোর স্বাভাবিক যাত্রা নিশ্চিত করতে পণ্যবাহী ট্রেন সার্ভিসে কিছুটা ব্যাঘাত ঘটেছে। গত ২৯ ডিসেম্বর থেকে পণ্যবাহী ট্রেন সার্ভিস শুরু করেছে।

জানা যায়, রেলওয়ে লোকোমোটিভ ইঞ্জিনসংকট দীর্ঘদিনের। লোকোমোটিভ সংকটের কারণে প্রায় সময় বিপাকে পড়তে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে। যেসব লোকোমোটিভ পুরোনো হয়ে গেছে তা রিফেয়ার করে চলাচল করলেও পথে পথে তা আটকে যায়। ফলে বাড়ে যাত্রীদের ভোগান্তি ও নষ্ট হয় কর্মঘণ্টাও। আবার রেলওয়ের মিটারগেজ ইঞ্জিন রিপেয়ারের কাজের জন্য ডব্লিউএম ও ডিএম লোকো দপ্তরের দুই কর্মকর্তা প্রতিবছর ইঞ্জিন রিপেয়ারের কাজে হাজার কোটি টাকা খরচ করে। কিন্তু কোনো সিরিজের ইঞ্জিন সঠিকভাবে রিপেয়ার হয় না। কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রিপেয়ারের নিম্নমানের পণ্য সামগ্রী ক্রয় এবং যথাসময়ে ইঞ্জিনকে শিডিউলিং করা হয় না। ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ ক্রয় করার ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্তরা নিজস্ব সিন্ডিকেটের বাইরে যান না। ফলে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নিম্নমানের যন্ত্রাংশ সরবরাহ করে দায়সারাভাবে রিপেয়ার করা হয়। দেশে প্রতিদিন ট্রেনে যাত্রী চাহিদার বিপরীতে টিকিটের প্রাপ্যতা অন্তত ১০ গুণ কম। প্রতিটি উৎসবকালীন ট্রেন সার্ভিসে বাড়তি ট্রেন ও কোচ সংযোজন করে পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দেয়। তবে ডিসেম্বরে স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকায় বার্ষিক ছুটির আমেজে চাহিদা বাড়লে চাহিদা মেটাতে গত ১৯ থেকে ২৬ ডিসেম্বরে টানা আট দিন পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখে রেলওয়ে। মূলত লোকোমোটিভ সংকটের কারণে পণ্যবাহী ট্রেনের লোকোটিভ দিয়ে যাত্রীবাহী ট্রেন পরিচালনা করা হয়েছে। এতে করে চট্টগ্রাম বন্দরগামী ও বন্দরে আসা কনটেইনারসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি পরিবহন সংকটে পড়ে। তবে ২৯ ডিসেম্বর থেকে পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল শুরু করলে ওই দিন একটি কনটেইনার, ৩০ ও ৩১ ডিসেম্বর থেকে পণ্যবাহী ট্রেন স্বাভাবিকভাবে চলাচল করেছে। যদিও প্রতিদিন পণ্যবাহী ট্রেনের জন্য লোকোমোটিভ বরাদ্দ দেওয়ার কথা ১৫-১৩টি। সংকটের কারণে বরাদ্দ দেওয়া হয় ৫-২টি। সর্বশেষ নভেম্বর মাসে দৈনিক গড়ে ৩ দশমিক ২টি করে ইঞ্জিন সরবরাহ দেওয়া হয়েছে। ডিসেম্বরে ইঞ্জিন সরবরাহের হার কমে দৈনিক ২ দশমিক ৫টিতে নেমে গেছে।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, স্বাভাবিক সময়ে প্রতি মাসে রেলপথে কনটেইনার ট্রেন চলাচল করে উভয়মুখে প্রায় ২০০টি। ডিসেম্বরে চলাচল করেছে মাত্র ৭৪টি ট্রেন। এ ছাড়া জ্বালানিবাহী ট্রেন চলাচল করেছে মাত্র ৭টি। চট্টগ্রাম ছাড়া দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বিশেষ করে গার্মেন্টস পণ্য ব্যবসায়ীরা আমদানি-রপ্তানিতে কমলাপুর আইসিডি ব্যবহার করায় রেলপথই সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসায়ীদের জন্য। কিন্তু ডিসেম্বরে সারা দেশে যাত্রীবাহী ট্রেনের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বেশ কয়েকটি স্পেশাল ট্রেন সার্ভিস পরিচালনা, লোকোমোটিভ ফেলিউরের কারণে সেবা বিঘ্নিত হওয়ায় পরিবহন বিভাগ পণ্য খাতের লোকোমোটিভগুলো সরিয়ে নেয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights