ডা.জাফরুল্লাহ চৌধুরী জাতির বাতিঘর

ডা. উজ্জ্বল কুমার রায়

[একজন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী যদি ড. আবু হেনা মোস্তফা কামালের মতো হতেন, তাহলে বলতেন ‘জাফরুল্লাহ চৌধুরীরা ঝাঁকে ঝাঁকে জন্মায় না’; কিন্তু তা তিনি জীবনেও বলবেন না। একজন মানুষ পাদপ্রদীপের আলোর পেছনে থেকে সারাটা জীবন কীভাবে মানুষের সেবা করে যেতে পারে, তার জীবন্ত উদাহরণ ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। ]

একজন মানুষ তার পেশা দিয়ে দেশ সেবা করতেই পারেন। সাধারণ দেশপ্রেমিক মানুষ তা করেনও; কিন্তু ডাক্তার পরিচয়, মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় পাশে সরিয়ে রেখে শুধু একজন সাধারণ মানুষ হিসেবেও জাফরুল্লাহ চৌধুরী জীবন্ত কিংবদন্তি; যিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত একটা দেশে সবার আগে সবচেয়ে দরকারি কী, সেটা নির্ণয় করতে পেরেছিলেন। আর তা পেরেছিলেন বলেই ‘গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র’ গড়ে তুলেছিলেন।

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি বিলেতে ছিলেন। সে সময় পাকিস্তানি পাসপোর্ট ছিঁড়ে ‘দেশহীন নাগরিক’ হয়ে যান! এরপর সেখানেই মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার জন্য সংগঠিত হতে থাকেন। বিলাসী জীবন ফেলে এসে যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধে। রণাঙ্গনে ফিল্ড হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের জীবন বাঁচানোর লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেন। যুদ্ধ শেষে চাকরি বা ব্যবসা না করে রণাঙ্গনের ফিল্ড হাসপাতালকে নিয়ে আসেন স্বাধীন দেশে। সাভারের অদূরে গড়ে তোলেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র।

গণমানুষের চিকিৎসা করতে করতেই এক সময় জাতীয় ওষুধনীতি তৈরি করার জন্য সরকারি মহলে ধর্ণা দিয়ে বসে থাকেন। এক সময় গঠিত হয় জাতীয় ওষুধনীতি। ওষুধের দাম কমানোর জন্য তিনি দামি স্ট্রিপ-কভার ত্যাগ করেন। দামি কৌটার ব্যবহারও বন্ধ করেন। সেজন্য একই ওষুধ তিনি ১০ পয়সা দামে বিক্রি করতে পারলেও অন্য ফার্মাসিউটিক্যালগুলো বিক্রি করত ৫০ পয়সা অর্থাৎ ৫ গুণ বেশি দামে!

১৯৪১ সালের ২৭ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের রাউজানে জাফরুল্লাহ চৌধুরীর জন্ম। বড় হয়েছেন ঢাকায়। তার বাবার শিক্ষক ছিলেন বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্যসেন। মা-বাবার ১০ সন্তানের মধ্যে তিনি সবার বড়। পড়াশোনা করেছেন বকশীবাজার স্কুল, ঢাকা কলেজ ও ঢাকা মেডিকেল কলেজে (ডিএমসি)। ছাত্র ইউনিয়নের মেডিকেল কলেজ শাখার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ছাত্রাবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। ১৯৬৪ সালে ডিএমসি থেকে এমবিবিএস ও ১৯৬৭ সালে লন্ডনের রয়্যাল কলেজ অব সার্জনস থেকে জেনারেল ও ভাস্কুলার সার্জারিতে এফআরসিএস প্রাইমারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন; কিন্তু চার বছর হাড়ভাঙা খাটুনির পর যখন চূড়ান্ত পর্বের পরীক্ষা মাত্র এক সপ্তাহ বাকি, তখনই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। পরীক্ষা না দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে দেশে ফিরে আসেন।

ব্রিটেনে প্রথম বাংলাদেশি সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিডিএমএ) প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক তিনি।

আগেই পাকিস্তানি নাগরিকত্ব বর্জন করা জাফরুল্লাহ ভারতীয় ট্রাভেল পারমিট জোগাড় করে দিল্লিগামী বিমানে চড়ে বসলেন। উদ্দেশ্য ওখান থেকে কলকাতা হয়ে রণাঙ্গনে যাওয়া। বিমানটি ছিল সিরিয়ান এয়ারলাইন্সের। দামেস্কে পাঁচ ঘণ্টা প্লেন লেট, সবযাত্রী নেমেছে। জাফরুল্লাহ নামেননি। এয়ারপোর্টে এক পাকিস্তানি কর্নেল উপস্থিত ছিলেন ওই ‘পলাতক পাকিস্তানি নাগরিককে’ গ্রেফতার করার জন্য। বিমানে কাউকে গ্রেফতার করা যায় না, কারণ বিমান হলো আন্তর্জাতিক এলাকা। এমনিভাবে ওরা বিপদের ভেতর দিয়ে শেষ পর্যন্ত মে মাসের শেষে সেক্টর-২ রণাঙ্গনে গিয়ে হাজির হন জাফরুল্লাহ।

যুদ্ধ বিস্তার লাভ করলে আগরতলার বিশ্রামগঞ্জের মেলাঘরে গড়ে তোলেন প্রথম ফিল্ড হাসপাতাল- ‘বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল’। হাসপাতালটির কমান্ডিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করেছিলেন ডা. সিতারা বেগম বীরপ্রতীক। সে সময় প্রশিক্ষিত নার্স না থাকায় নারী স্বেচ্ছাসেবীদের প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণ দেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। সে হাসপাতালের দুই স্বেচ্ছাসেবী ছিলেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল ও তার বোন সাঈদা কামাল। মুক্তিযুদ্ধের সময় অসংখ্য মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছে ৪৮০ শয্যাবিশিষ্ট এ হাসপাতাল।

জাফরুল্লাহ প্রতিষ্ঠিত ‘গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র’ নামটি দিয়েছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান। নাম ঠিক করার ইতিহাসটি বেশ মজার। ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে হাসপাতালটি গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়ার সময়, নাম নিয়ে আপত্তি এলো প্রশাসন থেকে। সেই সময় অন্য অনেক বিষয়ের মতো এটাও রাষ্ট্রপতির কান পর্যন্ত পৌঁছাল। ডা. জাফরুল্লাহ সচিবালয়ে গিয়ে দেখা করলেন রাষ্ট্রপতির সাথে।

সেদিনের কথোপকথন- ‘মুজিব ভাই, বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল করতে দেয়া হচ্ছে না।’ জানালেন ডা. জাফরুল্লাহ।

‘বাংলাদেশ নাম থাকলে কেমন সরকারি সরকারি মনে হয়। অন্য কোনো সুন্দর নাম ঠিক কর হাসপাতালের জন্য।’ বললেন শেখ মুজিবুর রহমান।

অনেক তর্কের পর শেখ মুজিবুর রহমান বললেন, ‘তুই তিনটি নাম ঠিক করবি। আমি তিনটি নাম ঠিক করব। দু’জন বসে যে নামটি ভালো, সেই নামে হাসপাতাল হবে।’

তিনটি নাম ঠিক করে আবার শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে গেলেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী।

‘বল, কি নাম ঠিক করেছিস?’

[জাফরুল্লাহ বলতে শুরু করলেন, ‘এক. বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল, দুই. গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র।’

তৃতীয় নামটি বলার সুযোগ না দিয়ে শেখ মুজিব বললেন, ‘গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র’ খুব সুন্দর নাম। এই নামেই হবে হাসপাতাল। এই হাসপাতালে শুধু চিকিৎসা হবে না। দেশটাকে গড়ে তুলতে হবে। স্বাস্থ্য, কৃষি, শিক্ষা সবকিছু নিয়ে কাজ করতে হবে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রকে।’]

১৯৭৯ সাল থেকেই জাফরুল্লাহ জাতীয় শিক্ষা কমিটি ও নারী কমিটির সদস্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন বাংলাদেশে শিক্ষা ও নারীনীতি প্রণয়নে। তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল ১৯৮২ সালের জাতীয় ওষুধনীতি প্রণয়নেও। স্বাধীনতার পর স্বাস্থ্য খাতে যাকে বিবেচনা করা হয় সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হিসেবে। তার প্রচেষ্টায় আমদানি করা ওষুধের সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ২২৫টিতে। বর্তমানে ৯০ শতাংশ ওষুধই দেশে তৈরি হচ্ছে এবং বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে একটি ওষুধ রফতানিকারক দেশে।

স্বাধীন বাংলাদেশে বিভিন্ন সরকারের সময়ে মন্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব পেয়েও ফিরিয়ে দিয়েছেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। বাকশালে যোগ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights