ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবাইকে সচেতন হতে হবে
বর্তমান সময়্র বাংলাদেশে সবচেয়ে আলোচিত ব্যাধি ডেঙ্গু। এক সময়ে বাংলাদেশে ডেঙ্গু রোগটি মৌসুমি রোগ বলে মনে করা হলেও, গত কয়েক বছর ধরে সারা বছর জুড়ে এর প্রকোপ দেখা যাচ্ছে। ডেঙ্গু জ্বর হলো মশাবাহিত ডেঙ্গুর জীবাণু দ্বারা সংঘটিত একটি রোগ। এই রোগের প্রথম ধারণা মেলে জিন বংশের (২৬৫-৪২০ সাল) এক চীনা মেডিকেল বিশ্বকোষে। মূলত এডিস ইজিপ্টি নামক মশাবাহিত ভাইরাস এ রোগের জন্য দায়ী। বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বিশেষ করে বর্ষার মৌসুমে শুরু হয়, যার সময়কাল জুন-সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হয়ে থাকে। বাংলাদেশের জলবায়ু এডিস মশার প্রজনন বৃদ্ধির জন্য অনুকূল। কেননা, বর্ষাকালে প্রচুর বৃষ্টিপাত হওয়ার ফলে বিভিন্ন স্থানে দীর্ঘ দিন ধরে পানি জমে থাকে, যার মাধ্যমে ভাইরাসের সংক্রমণ বৃদ্ধি পায়।
বিভিন্ন সংবাদপত্রের তথ্যানুযায়ী ২৪ জুলাই পর্যন্ত চলতি বছর ১৭৬ জন ডেঙ্গুতে মারা গেছেন। যার মধ্যে ১২৯ জনেরই মৃত্যু হয়েছে চলতি জুলাই মাসে এবং এদের মধ্যে নারীদের মৃত্যুর সংখ্যাই বেশি। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৩০ হাজার ৬৮৫ জন। তার মধ্যে ঢাকায় ১৮ হাজার ৮৮৫ এবং ঢাকার বাইরে ১১ হাজার ৮০০ জন। ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন।ঢাকা মহানগরীর ১১টি এলাকা থেকে ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে বেশি ভর্তি হচ্ছেন।
কিন্তু এবার ইদের পর ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে টানা বৃষ্টিপাত হওয়ায় সাময়িক জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়, যা সাম্প্রতিক সময়ে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি অন্যতম কারণ। এছাড়া এবারের ইদের ছুটিতে বিভিন্ন অফিস, স্কুল, কলেজ, কলকারখানা, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। ধারণা করা যাচ্ছে, বৃষ্টিপাতের কারণে এসব স্থানে পানি জমে থাকায়; এডিস মশার বংশবিস্তার অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে।
রোগের প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ করা বেশি জরুরি এবং সহজ কাজ। ডেঙ্গু প্রতিরোধে সকলকে সচেতন ও সজাগ দৃষ্টি দিতে হবে। সম্মিলিত উদ্যোগই ডেঙ্গু প্রতিরোধের একমাত্র হাতিয়ার। আমরা যারা বসতবাড়িতে থাকি, প্রতিদিন খেয়াল রাখতে হবে অপ্রয়োজনীয় পানি যেন কোনো পাত্রে জমে না থাকে। যেমন, ফুলের টব, অব্যবহৃত বোতল, ভাঙা পাত্র ও অন্যান্য পরিত্যক্ত জিনিসপত্র। যেহেতু বৃষ্টিপাত হওয়ার পর মশার প্রাদুর্ভাব বেড়ে যায়, তাই নিয়মিত ছাদবাগান এবং বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে। ঘুমানোর সময় মশারি টাঙাতে হবে এবং মশা নিরোধক স্প্রে ব্যবহার করা যেতে পারে।
যে সব পরিবারে ছোট শিশু ও বৃদ্ধ মানুষ আছেন তাদের প্রতি বিশেষ খেয়াল ও যত্ন নিতে হবে। নবজাতকদের সার্বক্ষণিক মশারির মধ্যে রাখতে হবে। সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত অঞ্চল, যেসব স্থানে মশার উপদ্রব বেশি সেসব স্থানে মশা নিধক ধোয়া ও কার্যকর পরিবেশবান্ধব রাসায়নিক পদার্থ প্রয়োগ করে মশার বংশবিস্তার কমাতে হবে। এছাড়াও এলাকাগুলো থেকে নিয়মিত বর্জ্য নিষ্কাশন করতে হবে। কারণ বিভিন্ন জায়গায় বর্জ্য উন্মুক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে, সেগুলোয় পানি জমে মশার উপদ্রব বৃদ্ধি করে। দেশের জেলা শহর থেকে শুরু করে উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদের সব প্রতিনিধি এবং নাগরিকদের এডিস মশা নির্মূল কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে হবে।
ডেঙ্গু নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থেকে পরিবেশ পরিচ্ছন্নতার ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
দেশে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে বেশিরভাগ রোগীই সরকারি হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হচ্ছেন। ফলে হাসপাতলগুলো অধিক রোগীর চাপ কাটিয়ে উঠতে হিমশিম খাচ্ছে। হাসপাতাল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, চিকিৎসক ও নার্সদের সর্বদা প্রস্তুত রাখা একটা বড় চ্যালেন্জ্ঞ হয়ে দাঁড়িয়েছে।এ ক্ষেত্রে সরকারি হস্তক্ষেপ খুবই জরুরি।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে ইতোমধ্যে সরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সরকারের উদ্যোগের কোনো ঘাটতি নাই, কিন্তু পরিকল্পনায় বেশ ঘাটতি রয়েছে। যেহেতু বাংলাদেশের আবহাওয়া সব সময়ই ডেঙ্গু ভাইরাসের জন্য সহায়ক। তাই সরকারের যেমন কর্মপরিকল্পনা থাকা দরকার, তেমনি এই সময়ে নেয়া পদক্ষেপগুলোও চালিয়ে যেতে হবে বলে মনে করেন রোগতত্ত্ব, রোগ-নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউটের পরিচালক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় উচিত সারা দেশের মশা এবং অন্যান্য বাহক নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি স্বতন্ত্র সেন্টার তৈরি করা। এই সেন্টার দেশব্যাপী মশা ও অন্যান্য বাহক নিয়ন্ত্রণের অভিভাবক হিসেবে কাজ করবে। এখানে সারা বছর মশা, অন্যান্য বাহক ও কীটনাশক নিয়ে গবেষণা হবে এবং তারাই নির্দেশনা দেবে কখন কোন কীটনাশক কোন বাহকের জন্য ব্যবহৃত হবে।ডেঙ্গু এমন একটি সমস্যা, যেটিকে সরকার বা সিটি করপোরেশন একা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। পৃথিবীর কোনো দেশেই জনগণের সম্পৃক্ততা ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সাফল্য আসেনি। নাগরিকদের সম্পৃক্ততা ছাড়া মশা নিয়ন্ত্রণ কখনোই সম্ভব নয়। মশা নিয়ন্ত্রণে নাগরিকদের সম্পৃক্ত করার জন্য পৃথিবীতে বিভিন্ন দেশে আইন রয়েছে। সে রকম একটি আইন বাংলাদেশে তৈরি করা এবং সেটি বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
পাশাপাশি সর্বস্তরের জনগণকে সচেতন করার জন্য গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে ডেঙ্গু প্রতিরোধবিষয়ক কার্যক্রম বাড়াতে হবে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতন থাকাটাই অনেক বড় একটা কাজ,পাশাপাশি যারা মশা নিয়ন্ত্রণে কাজ করেন, তাদেরকে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার পাশাপাশি সকলের একাগ্র প্রচেষ্টাই পারে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা থেকে আমাদেরকে বাঁচাতে।
