ডেঙ্গু ‘শক সিনড্রোম’ আতঙ্ক

রেজা মুজাম্মেল, চট্টগ্রাম

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে শুক্রবার অর্পিত দাশ (২৬) নামে এক অন্তঃসত্ত্বা শিক্ষিকা ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তিনি ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে ভুগছিলেন। সঙ্গে মারা যায় গর্ভের সন্তানও। আগামী মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে ওই সন্তান ভূমিষ্ঠের সম্ভাব্য সময় ছিল। গত ৯ সেপ্টেম্বর নগরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চার বছর বয়সি এক শিশু ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। তার মৃত্যুর কারণ উল্লেখ করা হয় ‘এক্সপান্ডেড ডেঙ্গু সিন্ড্রোম উইথ ডিআইসি’। একই সময়ে চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে ২৯ বছর বয়সি এক নারী এক মাস বয়সি শিশু রেখে মারা যান। মৃত্যুর কারণ ছিল ‘এক্সপান্ডেড ডেঙ্গু সিন্ড্রোম’, সঙ্গে ছিল কার্ডিওরেসপিরেটরি ফেইলিওর। বুধবার চমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ৩০ বছর বয়সি এক নারী। তাঁরও মৃত্যুর কারণ উল্লেখ করা হয় ডেঙ্গু শক সিনড্রোম। সঙ্গে ছিল সেপসিস ও কিডনি জটিলতা।

এভাবে ডেঙ্গু আক্রান্তরা খুবই দ্রুত ‘ডেঙ্গু শক সিনড্রোমেও’ আক্রান্ত হচ্ছে। শক সিনড্রোমে আক্রান্ত হওয়ার পর রোগীর অবস্থা দ্রুতই সংকটাপন্ন হয়ে যাচ্ছে। চলতি বছরে চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ১২ জন মারা যান। এর মধ্যে অধিকাংশই ‘ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে’ আক্রান্ত ছিল। তবে অন্তঃসত্ত্বা শিক্ষিকা ও গর্ভের শিশুর মৃত্যু নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়। সামনে আসে ডেঙ্গু প্রতিরোধ ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও। সর্বশেষ গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয় ৮৭ জন। চলতি মাসের ১২ দিনেই মারা যায় সাতজন। ফলে চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর ভয়াবহ আকার ধারণ করে। প্রসঙ্গত, ডেঙ্গু শক সিনড্রোম হলো- ডেঙ্গুজ্বরের একটি অত্যন্ত গুরুতর ও জীবনঘাতী অবস্থা। যা সাধারণত জ্বর কমার সময়ে (রোগের তিন-সাত দিনের মধ্যে) রক্তনালি থেকে অতিরিক্ত প্লাজমা বা তরল পদার্থ বের হয়ে যাওয়ার কারণে ঘটে।

চিকিৎসকরা বলেন, তীব্র পেট ব্যথা বা পেটে অস্বস্তি, বারবার বমি বা রক্তবমি হওয়া, অতিরিক্ত দুর্বলতা, অস্থিরতা, নিস্তেজ হয়ে পড়া, হাত-পা ঠান্ডা ও আর্দ্র হয়ে যাওয়া, নাড়ির গতি দ্রুত কিন্তু দুর্বল হওয়া, রক্তচাপ হঠাৎ অনেক কমে যাওয়া এবং মুখ বা ত্বক নীলচে হয়ে যাওয়া শক সিনড্রোমের লক্ষণ। চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট (মেডিসিন) ডা. এ এস এম লুৎফুল কবির শিমুল বলেন, ইদানীং ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে রোগীর মৃত্যু বাড়ছে। এর কারণ হলো বেশির ভাগ রোগীই সতর্কতা সংকেত থাকা সত্ত্বেও হাসপাতালে ভর্তি হতে চান না। বিলম্ব করেই হাসপাতালে ভর্তি হয়। কিছু ক্ষেত্রে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। যেমন- তীব্র পেট ব্যথা, বারবার বমি হওয়া, রক্তপাত, শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত শারীরিক দুর্বলতা। সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান বলেন, চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্তদের অধিকাংশই ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে আক্রান্ত হচ্ছে। তাই ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে এডিস মশা থেকে বাঁচতে হবে।

চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর জানুয়ারি থেকে রবিবার পর্যন্ত চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন ২ হাজার ৮৮৩ জন। এর মধ্যে চলতি মাসের ১২ দিনেই আক্রান্ত হয় ৮৪৭ জন। এর আগে জানুয়ারি মাসে আক্রান্ত হয় ৬৮, ফেব্রুয়ারি মাসে ২২, মার্চে ২০, এপ্রিলে ২৯, মে ৩৭, জুনে ১২২, জুলাই ৫৩৬ ও আগস্টে ১ হাজার ২০২ জন। আক্রান্তদের মধ্যে মহানগর এলাকার ১ হাজার ২৩২, উপজেলার ১ হাজার ২৯৪ ও অন্যান্য জেলার ৩৫৭ জন।

আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষ ১ হাজার ৫০৩, মহিলা ৭৭১ ও শিশু ৫৭৯ জন। চলতি বছর চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মারা যান ১২ জন। এর মধ্যে পুরুষ তিনজন, মহিলা সাতজন ও শিশু দুজন। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত হয় ৮৭ জন। এর মধ্যে চমেক হাসপাতালে ভর্তি হন ২৭, বিআইটিআইডিতে ভর্তি হয় ৩২, জেনারেল হাসপাতালে ৬, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে দুজন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে ১০ এবং বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন ১০ জন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights