তারেক রহমানের কাছে খোলা চিঠি

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আপনার প্রতি রইল আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা ও শুভকামনা। ঢাকার নাগরিক জীবনের এক বাস্তব চিত্র এবং একটি আশঙ্কাজনক বিষয় নিয়ে একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আজ আপনাকে এই খোলা চিঠি লিখছি।

​আমি দীর্ঘকাল পুরোনো ঢাকায় কাটিয়েছি, যা আমার প্রাণের শহর হলেও বর্তমানে তার অতিরিক্ত জনঘনত্ব আর যানজটে দম নেওয়াও কষ্টকর হয়ে পড়েছে। সেখান থেকে এসে গত ৫-৬ বছর ধরে আমি বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় বসবাস করছি। এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকেই আজ কিছু সত্য আপনার সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন মনে করছি।

​মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলার পরিবেশ সত্যিই প্রশংসনীয়, যা অনেক সুরক্ষিত ও সুশৃঙ্খল মনে হয়। বিগত ২০২৪ সালের রাজনীতির উত্তাল সময়েও সুযোগ-সন্ধানীদের কাছ থেকে এই এলাকাকে নিরাপদ রাখতে কর্তৃপক্ষ যে অত্যন্ত সক্রিয় ও বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছে, তা আমরা স্বচক্ষে দেখেছি। পুরো এলাকা সার্বক্ষণিক সিসিটিভি নজরদারিতে থাকে, এখানকার প্রতিটি বাড়ি রাজউকের অনুমোদনপ্রাপ্ত এবং এখানে ক্রাইম রেট বা অপরাধের হার প্রায় শূন্যের কোঠায়। সবচেয়ে স্বস্তির বিষয় হলো, এখানে কারো জমি বা বাড়িঘর জোরপূর্বক জবরদখল করার কোনো সুযোগ নেই, যা বর্তমান যুগে ভাবাই যায় না। এমনকি বর্ষাকালে ভারী বৃষ্টিতে কখনো কখনো সাময়িক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলেও, বৃষ্টি থামার ঠিক পরপরই থাইল্যান্ডের উন্নত শহরগুলোর মতো মাত্র ১০ মিনিটের ভেতর সমস্ত পানি নেমে রাস্তাঘাট পরিষ্কার হয়ে যায়। এখানকার ড্রেনেজ ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা অনেক আধুনিক। এছাড়া, আজ পর্যন্ত কোনো মাদক কারবারিকে এখানে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে দেখা যায়নি। পর্যাপ্ত গাছপালা আর মুক্ত বাতাসের কারণে ঢাকার বুকে এটি যেন এক টুকরো ওএসিস।

​আমরা জানি, আপনি নিজেও এই এলাকায় এসেছেন। বিশেষ করে বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসাকালীন এখানকার বিশ্বমানের এভারকেয়ার হাসপাতালের নিরবচ্ছিন্ন নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশ আপনি নিশ্চয়ই অনুধাবন করেছেন। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় এত সুন্দর, আধুনিক ও পরিকল্পিত ‘রোল মডেল’ শহর গড়ে তুলতে পারে, তা সত্যিই অনন্য।

কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, সম্প্রতি এই পরিকল্পিত আধুনিক স্যাটেলাইট সিটিকে সম্পূর্ণভাবে সিটি কর্পোরেশনের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য একটি চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে এই সিদ্ধান্ত আমাদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করছে।

​আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন যাই হোক না কেন, সিটি কর্পোরেশনের অধীনে গেলেই স্থানীয় দলীয় বা রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের ব্যক্তিগত আধিপত্য ও খবরদারি শুরু হয়। মেগা প্রজেক্ট বা আধুনিক এলাকাগুলো তখন রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

​আপনার কাছে আমার আকুল আবেদন ও প্রস্তাবনা :

১. স্যাটেলাইট সিটিগুলোকে স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হোক : অন্ততপক্ষে বসুন্ধরার মতো সুপরিকল্পিত স্যাটেলাইট সিটিগুলোকে পূর্ণাঙ্গভাবে সিটি কর্পোরেশনের আওতায় এনে এর চিরচেনা রূপ ও শৃঙ্খলা ধ্বংস না করার সিদ্ধান্ত নিন।

২. সমঝোতাভিত্তিক (Royalty-based) মডেল : যদি সিটি কর্পোরেশনের আওতায় আনতেই হয়, তবে একটি সমঝোতা স্মারক বা যৌথ মডেল তৈরি করা যেতে পারে। যেখানে সিটি কর্পোরেশন নির্দিষ্ট রয়্যালটি বা রাজস্ব বাৎসরিকভাবে বুঝে নেবে, কিন্তু এলাকার অভ্যন্তরীণ রক্ষণাবেক্ষণ, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, পরিচ্ছন্নতা এবং নিরাপত্তার সম্পূর্ণ দায়িত্ব বর্তমানের মতোই নিজস্ব কর্তৃপক্ষের হাতে ন্যস্ত থাকবে।

৩. বেসরকারি খাতের মাধ্যমে আধুনিকায়ন : আপনার কাছে অনুরোধ, জনগণকে সত্যিকার অর্থে থাইল্যান্ড বা মালয়েশিয়ার মতো আধুনিক ও পরিচ্ছন্ন শহর উপহার দিতে বড় বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে জনকল্যাণমূলক আবাসন ও শহর মেইনটেন্যান্সের দায়িত্ব দিন। রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের জনগণের ওপর খবরদারি করার সুযোগ না দিয়ে, তাদের অন্য কোনো উৎপাদনশীল উপায়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার দিকনির্দেশনা দিন। জনগণের শান্তি ও জনস্বার্থকে আপনি সবকিছুর ঊর্ধ্বে রাখবেন—এটাই আমাদের বিশ্বাস।

​পরিশেষে, আপনার সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু এবং দেশের কল্যাণে আপনার দূরদর্শী নেতৃত্বের সাফল্য কামনা করছি। আশা করি, একজন নাগরিকের এই খোলামেলা ও বাস্তবসম্মত অনুরোধটি আপনি সদয় দৃষ্টিতে বিবেচনা করবেন।

​বিনীত,
আপনার দেশের একজন সচেতন নাগরিক
ও বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসিন্দা।

এস এম দেলোয়ার
রোড নম্বর # ৪৩, ব্লক # এল
বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা, ঢাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights