তারেক রহমানের দীপ্তিময় ফেরা
আবু তাহের খোকন
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সতেরো বছর পর দেশে ফিরেছেন ২৫ ডিসেম্বর। এ এক দীপ্তিময় ফেরা। সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান। ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুর্নীতির মামলায় সে বছরের ৭ মার্চ রাজধানীর মইনুল রোডে অবস্থিত ক্যান্টনমেন্টের বাসা থেকে তাঁকে তুলে নেওয়া হয়। তিনি তখন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব। তখন তারেক রহমানকে চোখ বেঁধে টানা ১৮ ঘণ্টা অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়। নেওয়া হয় রিমান্ডে। এরপর ৫৫৪ দিন কারাভোগের পর ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মুক্তি দেওয়া হয়। মুক্ত হবার পরে চিকিৎসার জন্য সপরিবারে লন্ডনে চলে যান তারেক রহমান।
এরপর নির্বাসনে থাকাবস্থায়ও তাকে বিভিন্ন মামলায় জর্জরিত করে রাখে তৎকালীন সরকার। দীর্ঘ ১৭ বছর তিনি লন্ডনেই ছিলেন। তারেক রহমান ২০০৮ সাল থেকে লন্ডনে বসবাস করেন। বেগম খালেদা জিয়া জেলে থাকায় এবং অসুস্থ থাকায় ২০১৮ সাল থেকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দলের নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন তিনি। দীর্ঘ দিন পর দেশে ফেরার পর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যরা বিমান বন্দরে তারেক রহমানকে স্বাগত জানান। বিমানবন্দরে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নেন তাঁর শাশুড়ি সৈয়দা ইকবাল মান্দ বানু। বিমানবন্দর থেকে গণসংবর্ধনাস্থল পর্যন্ত কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে পথে পথে লাখ লাখ সমর্থককে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে দলীয় পতাকা নাড়াতে দেখা যায়। তাঁরা প্ল্যাকার্ড, ব্যানার ও ফুল হাতে নিয়ে তারেক রহমানকে স্বাগত জানিয়ে স্লোগান দেন। তারেক রহমানের দেশে ফেরাকে বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন দেশের রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী ও সর্বস্তরের মানুষ।
১৭ বছর পরে দেশে ফিরেই তিনি বিমানবন্দর থেকে সভাস্থলে যাওয়ার মুহূর্ত জনগণের অন্তরে জায়গা করে নিয়েছেন। বিমানবন্দরে নেমেই প্রথমে তিনি প্রথম কৃতজ্ঞতাবোধ থেকে ফোন দেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহম্মদ ইউনূসকে। তিনি কৃতজ্ঞতা এবং ধন্যবাদ জানিয়েছেন তাকে নিরাপত্তা ও সম্মানিত করার জন্য। সবার চাওয়া পরিবর্তনের রাজনীতিতে আমাদের দেশের প্রতিটা নেতা ঠিক এইরকম মডেস্ট, বিনয়ী এবং গ্রেটফুল হোক।
স্বদেশপ্রেম মাটির টান, সেদিন বিমানবন্দর থেকে বাইরে এসেই জুতা খুলে মাটিতে নেমে পড়েন তারেক রহমান। হাত দিয়ে ১৭ বছর পর ছুঁয়ে দেখেন দেশের মাটি। সেই সময় তিনি আবেগে অভিভূত হয়ে পড়েন। দেশের জনগণের দীর্ঘ দিনের চাওয়া প্রতিটা নেতা ঠিক মাটির কাছাকাছি থাকুক তারেক রহমানের মতো। সভাস্থলে যাওয়ার জন্য তার জন্য আনা বিশেষ বুলেট প্রুফ গাড়িতে না গিয়ে বাসে করে সমস্ত সিনিয়র নেতাদের নিয়ে সংবর্ধনা স্থলে যান তিনি। বাংলার প্রতিটা সাধারণ মানুষ তারেক রহমানের এই মনোভাব খুব ভালোভাবে নিয়েছেন। তিনি প্রত্যেকটা বিএনপির নেতাকর্মীর অন্তরের খুব কাছাকাছি চলে গেছেন তার এই মনোভাবের জন্য।
স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সেদিন দীর্ঘ জার্নির পর তারেক রহমানের মধ্যে কোনো ক্লান্ত কাজ করেনি। বিমানবন্দর থেকে ৩০০ ফিট পর্যন্ত পুরা রাস্তা গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে লাখো লাখো জনতাকে হাত নেড়ে ভালোবাসা জানিয়েছেন এবং নিজেও লাখো জনতার ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন। তারেক রহমানের মধ্যে দলীয় সমর্থক, দেশের মানুষ শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে খুঁজেছেন। দেখেছেন বিমানবন্দর থেকে তিনি অসুস্থ মাকে দেখতে না গিয়ে সরাসরি ছুটে গিয়েছেন জনগণের মাঝে। জনগণের চাওয়া আগামী দিনের প্রধানমন্ত্রী সারাটা জীবন এভাবেই জনতার মাঝেই থাকুন, জনগণের কথা ভাবুন।
সংবর্ধনা মঞ্চে উঠেই দেশের মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সেদিন তারেক রহমান বলেন, সন্তান হিসেবে আমার মন আমার মায়ের বিছানার পাশে পড়ে আছে সেই হাসপাতালের ঘরে। কিন্তু সেই মানুষটি যাদের জন্য জীবনকে উৎসর্গ করেছে অর্থাৎ আপনারা এই মানুষগুলো। দেশের জন্য বেগম খালেদা জিয়া নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন, সেই দেশের মানুষগুলোকে কখনো আমি ফেলে যেতে পারবো না এবং সেই জন্য আজ হাসপাতালে যাওয়ার আগে আপনাদেরসহ টেলিভিশন মাধ্যমে যারা সমগ্র বাংলাদেশে আমাকে দেখছেন আপনাদের সকলের কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য আজ আমি এইখানে দাঁড়িয়েছি আপনাদের মাঝে।
সেদিন তারেক রহমান ডাক দিলেন ঐক্যের। ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ গড়ার কথা বললেন। তার জন্য আনা বিশেষ চেয়ার সরিয়ে বসলেন কাঠের চেয়ারে। স্মরণ করলেন ৭১, ২৪ এবং ২৫ এর সর্বশেষ শহীদ হাদিকে। সভায় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান হাদির অবদানের কথা স্মরণ করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। শহীদ শরিফ ওসমান হাদিকে স্মরণ করে বলেন, কয়েকদিন আগে ওসমান হাদি শহীদ হয়েছেন। ওসমান হাদি চেয়েছিলেন, এ দেশের মানুষ অর্থনৈতিক অধিকার ফিরে পাক। ৭১-এ যারা শহীদ হয়েছেন, ২৪-এ যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের রক্তের ঋণ শোধ করতে হলে প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।
তারেক রহমান সেদিন কোনো প্রতিহিংসা বা ঘৃণার কথা বলেননি, বরং বললেন শান্তি শান্তি শান্তি এবং ঐক্য। একসাথে দেশ গড়ার কথা। এছাড়া তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের আরেকটা তাৎপর্যময় দিন। অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে ঐতিহাসিক গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। এর জন্য ধন্যবাদ দিতে হয় দেশের প্রতিটা সাধারণ নাগরিক এবং বিএনপির সমস্ত নেতাকর্মীদের। বিএনপির এমন সুশৃঙ্খল রূপ আশা জাগায়। এরকম সুশৃঙ্খল বিএনপি যদি তারেক রহমানের হাতে থাকে তাহলে দেশ গড়ার ক্ষেত্রে তার হাত আরো বেশি শক্ত এবং মজবুত হবে।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার পর তারেক রহমান এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন তাঁর মমতাময়ী মা বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করতে যান। সেখানে চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে মায়ের চিকিৎসার খোঁজ-খবর নেন। তারপর গুলশানের বাসায় পৌঁছান তিনি। পরের দিন বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মাজার জিয়ারত করেন। শহীদ জিয়াউর রহমানের মাজার জিয়ারত শেষে যান সাভার স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানাতে। পরের দিন ২৭ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদির কবর জিয়ারত করেন।
সামনে নির্বাচন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলীয় নেতাকর্মীদের সাথে মতবিনিময় করা, মনোনয়ন ঠিক করার পাশাপাশি মায়ের খোঁজ-খবর নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশগড়ার এই অভিযান সফল হবেই হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।
