তেলের বাজার এখনও অস্থির, বাড়ছে দাম
অনলাইন ডেস্ক
হরমুজ প্রণালী দিয়ে পণ্য পরিবহন টানা তিন সপ্তাহ ধরে কার্যত বন্ধ থাকায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা চরমে পৌঁছেছে। শুক্রবার লেনদেন শেষ হওয়ার সময় আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ৪.৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি ব্যারেল ১১২.৩৬ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
একই সময়ে মার্কিন বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ৪.৩ শতাংশ বেড়ে ৯৮ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে যাতায়াত করে বিধায় এই অচলাবস্থা বাজারকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
সরবরাহ ব্যবস্থার এই সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে কাতারের রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটিতে সাম্প্রতিক হামলার ঘটনার পর। কাতার এনার্জি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এই অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির ফলে তাদের প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের রাজস্ব ক্ষতি হতে পারে। এটি মেরামত করে পূর্ণ উৎপাদনে ফিরতে অন্তত পাঁচ বছর সময় লাগবে। এই খবরের পর ইউরোপীয় বাজারে গ্যাসের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে। যেখানে ডাচ টিটিএফ হাবে প্রতি মেগাওয়াট-ঘণ্টা গ্যাসের দাম সংঘাত শুরুর আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা সতর্কবার্তা উচ্চারণ করে জানিয়েছে, যদি হরমুজ প্রণালী টানা ছয় মাস বন্ধ থাকে, তবে ২০২৬ সালেই ব্রেন্ট ক্রুডের গড় দাম ১২০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এমনকি তিন মাসের সংকটেও দাম গড়ে ১০০ ডলারের নিচে নামার সম্ভাবনা নেই। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) তাদের প্রাক্কলনে জানিয়েছে, তেলের দাম প্রতি ১০ শতাংশ বৃদ্ধিতে বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি ৪০ বেসিস পয়েন্ট বেড়ে যায়। যদি তেলের দাম বছরজুড়ে ১০০ ডলারের ওপরে অবস্থান করে, তবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক উৎপাদন ও প্রবৃদ্ধিতে এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
জ্বালানি সংকটের এই উত্তাপ সরাসরি বিশ্বের বড় বড় শেয়ার বাজারগুলোতে অনুভূত হচ্ছে, যেখানে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক ১.৫ শতাংশ পতন দেখেছে এবং ইউরোপের স্টক্স ৬০০ সূচকটিও ১.৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। জার্মানি এবং ফ্রান্সের প্রধান বাজারগুলোও ২ শতাংশের কাছাকাছি লোকসানের মুখ দেখেছে। এশিয়ার বাজারে হংকংয়ের হ্যাং সেং এবং চীনের সাংহাই কম্পোজিট সূচকের পতন ঘটলেও দক্ষিণ কোরিয়ার কোস্পি সূচকে সামান্য উন্নতি লক্ষ্য করা গেছে।
এই সংকটময় পরিস্থিতিতে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো মুদ্রানীতি নিয়ে সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করেছে। মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ, ব্যাংক অব জাপান, ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং ব্যাংক অব ইংল্যান্ড তাদের বেঞ্চমার্ক সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জ্বালানি খরচের ঊর্ধ্বগতির ফলে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলায় ব্যাংকগুলো এখন কঠোর নজরদারি চালাচ্ছে। বাজারের অস্থিতিশীলতা নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত সুদের হার নিয়ে কোনো বড় পরিবর্তনের ঝুঁকি নিতে চাচ্ছে না নীতিনির্ধারকরা।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সমান্তরালে মার্কিন ডলার শক্তিশালী হতে শুরু করায় মূল্যবান ধাতুর বাজারে বড় ধরনের ধস নেমেছে। গত এক বছরে স্বর্ণের দাম ৭৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও শুক্রবার এটি ৩.৩ শতাংশ হ্রাস পেয়ে প্রতি আউন্স ৪,৪৯৭.৪৮ ডলারে নেমে এসেছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে স্বর্ণের বাজারমূল্য থেকে প্রায় ৩.৫ ট্রিলিয়ন ডলার হারিয়ে গেছে, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি বড় ধাক্কা। স্বর্ণের পাশাপাশি রুপার দামও শুক্রবার ৬.৭ শতাংশ কমেছে এবং সপ্তাহের ব্যবধানে এর মোট পতনের হার প্রায় ২০ শতাংশে পৌঁছেছে।
অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর মধ্যে প্যালাডিয়াম এবং প্ল্যাটিনাম যথাক্রমে ৩ শতাংশ এবং ২.৫ শতাংশ দর হারিয়েছে। বৈশ্বিক এই অর্থনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) সাধারণ মানুষকে তেলের ওপর চাপ কমাতে অপ্রয়োজনীয় বিমান ভ্রমণ এড়িয়ে চলা, যাতায়াতের গতি কমানো এবং সম্ভব হলে বাড়ি থেকে কাজ করার পরামর্শ দিয়েছে। বাজারের এই অস্থিতিশীলতা কতদিন স্থায়ী হবে তা এখন পুরোপুরি নির্ভর করছে হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা ও সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার ওপর।
আগামী কয়েক দিনে ভূ-রাজনৈতিক এই সংকট নিরসনে কোনো কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া হলে সাধারণ পণ্যমূল্য আরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে শিল্পোন্নত দেশগুলোতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় রপ্তানি বাণিজ্যে স্থবিরতা দেখা দিতে পারে। বর্তমানে সরবরাহ অবকাঠামোগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বিকল্প রুটে জ্বালানি পরিবহনের বিষয়টি নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা চলছে।
