দখল-দূষণে অস্তিত্ব সংকটে বিশেষায়িত হালদা নদী

ফটিকছড়ি (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি

অবিরত দূষণ, ভরাট, বালু উত্তোলন, দখল-বেদখলসহ বিভিন্ন শিল্পকারখানার বিষাক্ত বর্জ্যে ভয়াবহ হুমকির মুখে রয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র চট্টগ্রামের হালদা নদী। বিশেষায়িত এই নদী সুরক্ষায় সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ারও নির্দেশ থাকলেও, দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেই। নথি অনুযায়ী, দেশের পূর্ব-পাহাড়ি অঞ্চলের খাগড়াছড়ি ও চট্টগ্রাম জেলার সর্পিলাকার নদী হালদার দৈর্ঘ্য ১০৬ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ১৩৪ মিটার। কিন্তু বাস্তবে এই হিসাব মেলানো কঠিন। নদীটি পার্বত্য খাগড়াছড়ির রামগড় ও মানিকছড়ি উপজেলা এবং চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি, রাউজান, হাটহাজারী উপজেলা ও পাঁচলাইশ থানার মধ্যে প্রবাহিত হয়ে কালুরঘাট এলাকায় কর্ণফুলী নদীতে সমাপ্তি হয়। এটি বিশ্বের একমাত্র জোয়ার-ভাটা সমৃদ্ধ নদী, যেখানে কার্পজাতীয় মাছ (রুই, কাতলা, মৃগেল, কালিবাউশ) প্রাকৃতিক উপায়ে ডিম ছাড়ে। ২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর দ্বিতীয়বারের মতো মৎস্য হেরিটেজ ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করেছে সরকার। হালদা নদী বাংলাদেশের সাদা সোনার খনি হিসেবেও পরিচিত। হালদা নদী থেকে একসময় প্রতি বছর এক হাজার কোটি টাকা জাতীয় অর্থনীতিতে যোগ হতো। এ নদী শুধু মৎস্য সম্পদের জন্য নয়, যোগাযোগ, কৃষি ও পানি সম্পদেরও একটি বড় উৎস।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে পরিচালিত গবেষণায় হালদা নদীর জন্য মানবসৃষ্ট ক্ষতির কারণগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফটিকছড়ির চা-বাগানগুলোর জন্য নদীর পানি ব্যবহার, নদী থেকে প্রতিদিন চট্টগ্রাম ওয়াসার পানি উত্তোলন, মা মাছ নিধন, নদী থেকে নির্বিচারে বালু তোলায় এর মাটির গঠন নষ্ট। তীরে একের পর এক গড়ে ওঠা ইটভাটায় ব্যবহৃত হচ্ছে নদীর মাটি ও পানি, নদীর ১১টি স্থানের বাঁক সমান করে ফেলায় মাছের বিচরণ ও প্রজনন কমে গেছে, খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে নদীর তীরে তামাক চাষ, কারখানার তরল বর্জ্য এবং গৃহস্থালির বর্জ্যরে মাধ্যমে দূষিত হচ্ছে হালদা। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক হালদা গবেষক ড. মঞ্জুরুল কিবরিয়া বলেন, বর্তমানে হালদার প্রধান সমস্যা হলো বালু উত্তোলন। বালু মাটি লুটেরাদের হাত থেকে হালদা রক্ষা করতে হবে। মানিকছড়ি এলাকায় তামাক চাষ বন্ধ হয়েছে। হাটহাজারী এলাকায় বিদ্যুৎ ও পেপার মিলের বর্জ্য বন্ধ হয়েছে। বায়েজিদ-অক্সিজেন এলাকার আবাসিক বর্জ্য বামনশাহী খালের মাধ্যমে সরাসরি হালদায় পড়ছে। যা হালদাকে মারাত্মকভাবে দূষিত করছে। সেটি বন্ধের জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি। হালদার মুখে নতুন জেগে ওঠা চর অপসারণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বিশেষায়িত এই নদীর সম্পদ রক্ষা ও দূষণ, দখল মুক্ত করতে আইনের কঠোর প্রয়োগ দরকার। নদী দূষণকারীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি। ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহীম বলেন, হালদা নদীর বিষয়ে প্রশাসন জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে।

বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights