দায়িত্ব সুচারুভাবে পালন করাই অন্যতম চ্যালেঞ্জ
শফিকুল ইসলাম সোহাগ
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, বিএনপি দেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল। এ দলের কর্মীসংখ্যা অনেক। সেই দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পেয়েছি। দায়িত্বটা সুচারুভাবে পালন করাই আমার কাছে অন্যতম চ্যালেঞ্জ।
গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রুহুল কবির রিজভী এ কথা বলেন। দলীয় মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় তিনি এ পদ থেকে পদত্যাগ করেন। সম্প্রতি রুহুল কবির রিজভীকে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়। রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘তৃণমূল থেকে নেতা-কর্মীরা সাক্ষাৎ করতে আসবেন। তাঁরা যেন কথা না বলে ফিরে না যান, সেদিকে খেয়াল রাখব। সরকারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দলের চেয়ারম্যানের দিকনির্দেশনায় দলকে আরও সুসংগঠিত করব। দুঃসময়ের ত্যাগী নেতা-কর্মীদের বঞ্চিত করে হাইব্রিডরা যেন দলে প্রবেশ করতে না পারে, সেদিক খেয়াল রাখব। এজন্য তৃণমূলের নেতা-কর্মীরও সহযোগিতা প্রয়োজন।’ তিনি বলেন, ‘দলের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি, অন্যায়-অপকর্মকারীদের বিরুদ্ধে দলের অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কার। কেউ চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার, জমি-জায়গা দখল করলে তা কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। সাক্ষাৎকারের বিস্তারিত নিচে দেওয়া হলো :
বাংলাদেশ প্রতিদিন : বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পেয়ে কেমন অনুভব করছেন।
রুহুল কবির রিজভী : বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পাওয়া অত্যন্ত গর্ব ও আনন্দের। অর্পিত দায়িত্ব সুচারুরূপে পালনের জন্য মহান সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রয়োজনীয় সাহস ও শক্তির প্রার্থনা করি। সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ছিলাম, এখন জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য। সরকারপ্রধানের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্বে আছি। সরকারি দায়িত্বে থেকে যতটুকু ভূমিকা রাখা দরকার, তা রাখব। নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা এবং তাঁরা এসে যেন আমাকে না পেয়ে ফিরে না যান-সেদিকে খেয়াল রেখে আমি ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করে যাব।’
বাংলাদেশ প্রতিদিন : প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে ভয় ও আশঙ্কার কথা বলেছেন।
রুহুল কবির রিজভী : শুধু নেতৃত্বে এলেই চলবে না। অর্পিত গুরুদায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারছি কি না, এই বোধটি সব সময় কাজ করে। দলের চেয়ারম্যানের নির্দেশিত কাজগুলো সহকর্মীদের সমর্থন ও সহযোগিতার মাধ্যমে সফলভাবে সম্পন্ন করতে চাই।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : সাংগঠনিক কোন কোন বিষয়ে অগ্রাধিকার দেবেন।
রুহুল কবির রিজভী : দলকে সুশৃঙ্খল রাখা। সাংগঠনিক তৎপরতা বৃদ্ধি করা। বিরোধী দলের গঠনমূলক সমালোচনা আমলে নেওয়া। অতীতে দেখা গেছে, দল ক্ষমতায় গেলে সাংগঠনিক তৎপরতা কমে যায়। সেটি যেন না হতে পারে, সেদিকে নজর দেব। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাব।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : তৃণমূলে সংগঠন নিয়ে পরিকল্পনা কী।
রুহুল কবির রিজভী : আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে সংগঠন নতুন আঙিকে সাজানো হচ্ছে। দলের চেয়ারম্যান নিয়মিত স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন। তাঁদের পরামর্শ দিচ্ছেন। অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে তৃণমূলকে শক্তিশালী করার চেষ্টা থাকবে।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ কী।
রুহুল কবির রিজভী : অত্যন্ত সফলভাবে সরকার ছয় মাস অতিক্রান্ত করেছে। বর্তমানে জ্বালানিসংকট চলছে। সংকট সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আশা করি, সংকট কেটে যাবে। দেশে এখনো অনেক গ্যাস মজুত আছে, সেগুলো উত্তোলনের মাধ্যমে ব্যবহার করা হবে। এ ছাড়া সমস্যা সমাধানে চীন, মালয়েশিয়াসহ কয়েকটি রাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : সরকার ও দলের কর্মকাণ্ডে ভারসাম্য আনার কথা বলা হচ্ছে, অগ্রগতি কতদূর।
রুহুল কবির রিজভী : দল নির্বাচিত হয়েই সরকার গঠন করেছে। মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা উপদেষ্টা আমরা প্রত্যেকেই দলের লোক। তাই দলের লোক হিসেবে সরকারে কাজ করার পাশাপাশি দলের দায়িত্বও পালন করবেন, এতে কোনো জটিলতা নেই। সরকার গঠনের প্রথম দিকে দলীয় কর্মকাণ্ড একটু ধীর ছিল, কিন্তু এখন আবার পুরোদমে চলছে। প্রতি সপ্তাহেই দুই-এক দিন দলের চেয়ারম্যান তৃণমূলের সঙ্গে বসছেন ও মতবিনিময় করছেন। সেখান থেকে তিনি সাংগঠনিক নানা বিষয়ে অবগত হচ্ছেন এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : দলের একটি অংশের বিরুদ্ধে দখল, চাঁদাবাজি, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গসহ নানান অভিযোগ আসছে। এ ক্ষেত্রে দলের অবস্থান কী।
রুহুল কবির রিজভী : দলের অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কার। দলের নাম ভাঙিয়ে কেউ চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার, জমি-জায়গা দখল করলে তা কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। ইতোমধ্যে প্রায় দুই হাজারের মতো নেতাকে দলের বিভিন্ন মেয়াদে এবং বিভিন্নভাবে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। দলের কঠোর অবস্থানের কারণে তুলনামূলকভাবে এসব অভিযোগ অনেক কমে এসেছে। জনগণও দেখছে যে বিএনপিতে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে কেউ যুক্ত হলে তাকে বিচারের ও সাংগঠনিক ব্যবস্থার মুখোমুখি হতে হয়। এটি অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি কতদূর বাস্তবায়ন হয়েছে।
রুহুল কবির রিজভী : ৩১ দফা সামনে রেখে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলাম। ছয় মাসে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, সুদসহ কৃষিঋণ মওকুফসহ অনেক কিছু ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন হয়েছে। আশা করি, সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ৩১ দফা বাস্তবায়ন হবে।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : জুলাই আন্দোলন ও গণ অভ্যুত্থানকে বিএনপি কীভাবে মূল্যায়ন করে।
রুহুল কবির রিজভী : জুলাই আন্দোলন ছিল একটা মহা-গণ অভ্যুত্থান। প্রমাণিত হয়েছে সত্যিকারের অর্থেই মানুষ রাস্তায় নেমে গেলে কোনো স্বৈরাচার টিকে থাকতে পারে না। তার প্রমাণ আমরা পেয়েছি। শেখ হাসিনা চিরস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যে স্বপ্ন দেখতেন, জুলাই আন্দোলনে তা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। এই আন্দোলনে বিএনপি প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত মাঠে ছিল।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : বিরোধী দলের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক কেমন।
রুহুল কবির রিজভী : বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে সরকারের চমৎকার সম্পর্ক রয়েছে। তাদের গঠনমূলক সমালোচনা আমলে নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে বিএনপির সঙ্গে থাকা শরিক দলগুলোর মূল্যায়ন কতদূর।
রুহুল কবির রিজভী : তাদের দল থেকে একাধিক মন্ত্রী রয়েছে। মূল্যায়ন চলমান প্রক্রিয়া।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : বিএনপির সাবেক মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের (বর্তমান রাষ্ট্রপতি) শূন্যতা পূরণ কি সম্ভব।
রুহুল কবির রিজভী : ভয়ংকর ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের সময় তিনি দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেছেন। সেই দুঃশাসনে তাঁকে নেতৃত্ব দিতে হয়েছে। এতে বারবার গ্রেপ্তার হয়েছেন। নেতা-কর্মীদের মধ্যে তার অবশ্যই একটি বড় প্রভাব রয়েছে। তবে আশা রাখি, সেই অভাব পূরণে কোনো ধরনের শূন্যতা বা ফাঁক যেন তৈরি না হয়, সব সময় সেই চেষ্টা চালিয়ে যাব।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : বিএনপিতে ‘হাইব্রিড ও সুবিধাবাদী’দের প্রবেশ নিয়ে অনেক নেতা-কর্মীর অভিযোগ আছে। এদের চিহ্নিত করতে কোনো ব্যবস্থা নেবেন কি?
রুহুল কবির রিজভী : একটি দল যখন দীর্ঘ সংগ্রামের পর ক্ষমতায় আসে, তখন সেখানে হাইব্রিডদের ভিড় জমে। তারা যাতে সুবিধা নিতে না পারে, সেজন্য আমাদের ত্যাগী নেতা-কর্মী; যাঁরা আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছেন ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন; তাঁদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। হাইব্রিডরা এসে দলের নাম ভাঙিয়ে যাতে কোনো অনৈতিক কাজে জড়াতে না পারে, সে বিষয়ে সজাগ থাকতে হবে। দল এ ব্যাপারে সতর্ক।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : অনেকের অভিযোগ ত্যাগী নেতা-কর্মীদের মূল্যায়ন হচ্ছে না, কতটুকু সত্য।
রুহুল কবির রিজভী : দলের চেয়ারম্যান বিভিন্নভাবে যোগ্যতার ভিত্তিতে নেতা-কর্মীদের মূল্যায়ন করছেন। সম্প্রতি বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের অন্তত ১২ জন নেতাকে বিভিন্ন সরকারি সংস্থায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যাঁরা প্রত্যেকেই মাঠের নেতা। জেলা বা বিভাগীয় শহরের আধা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতেও দলের যোগ্য নেতাদের মূল্যায়ন করা হয়েছে। মূল্যায়ন অব্যাহত থাকবে।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল কী হতে পারে।
রুহুল কবির রিজভী : বিএনপির অগ্রাধিকারমূলক কৌশল হলো জনসমর্থন ধরে রাখা এবং নতুন জনসমর্থন অর্জন করা। বিএনপি সরকার সঠিক কৌশল নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : বিএনপির জাতীয় কাউন্সিল কবে হবে।
রুহুল কবির রিজভী : দিনক্ষণ এখনো ঠিক হয়নি। দলের নীতিনির্ধারণী ফোরাম সিদ্ধান্ত নিয়ে জানাবে। তবে এটুকু বলতে পারি, শিগগিরই হবে।
বাংলাদেশ প্রতিদিন : সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
রুহুল কবির রিজভী : বাংলাদেশ প্রতিদিনও তার পাঠকদেরও বিএনপির পক্ষ থেকে আন্তরিক ধন্যবাদ।
