দিনাজপুরের সরকারি গণগ্রন্থাগারে সংস্কারের অভাবে ব্যাহত হচ্ছে জ্ঞানচর্চা
আব্দুস সালাম, দিনাজপুর প্রতিনিধি ॥
দিনাজপুর জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগার, দিনাজপুর গোড়-এ শহীদ বড় ময়দানের পশ্চিমে অবস্থিত যা ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত, দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে এই অঞ্চলের জ্ঞানচর্চা ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে আসছে। এই গণগ্রন্থাগারটি বর্তমানে একটি ব্যতিক্রমী সেবা মডেল অনুসরণ করছে, যেখানে আধুনিক প্রযুক্তিগত সুবিধা, যেমন ফ্রি ইন্টারনেট অ্যাক্সেস এবং একটি নারীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা হলেও এই গ্রন্থাগারে নেই নারীদের জন্য আলাদা পাঠকক্ষ। গ্রন্থাগারের সামগ্রিক কার্যকারিতা অপর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং সংস্কারের অভাবের কারণে জ্ঞানচর্চা গুরুতরভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, সরকারি গণগ্রন্থাগারের প্রাথমিক নকশা অনুযায়ী, এটি একটি চারতলা ভবন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু বাস্তবে এর কার্যক্রম শুধুমাত্র একতলা ভবনেই সীমাবদ্ধ। এটি দৈনিক গড়ে ১৫০ জন পাঠকের চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। ফলস্বরূপ, বসার স্থান সংকুলান একটি প্রধান সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। ভবনটির চারপাশে সীমানা প্রাচীর, ড্রেনেজ লাইন, আধুনিক ওয়াশরুম এবং একটি বর্ধিত গ্যারেজ সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত দিক সংস্কারের জন্য জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
গ্রন্থাগারের সিনিয়র লাইব্রেরিয়ান, কে এম মেহেদী হাসান, জানান যে গণগ্রন্থাগারে বর্তমানে প্রায় ৪৫,০০০ বই রয়েছে, যার মধ্যে প্রতি বছর ১,০০০ থেকে ১,২০০টি নতুন বই সংযোজিত হচ্ছে। বিগত সরকারের সাথে সরাসরি রাজনৈতিক ও বিতর্কিত বই স্থানান্তর করা হয়েছে এবং নতুন বই যুক্ত হচ্ছে। বই কেন্দ্রীয়ভাবে সংগ্রহ ও বিতরণ করা হয় স্থানীয়ভাবে সাধারণত বই ক্রয় করা হয় না।
প্রযুক্তিগত অগ্রগতির দিক থেকে, গ্রন্থাগারটি অত্যন্ত উন্নত। লাইব্রেরি ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যারের হালনাগাদের কাজ চলছে, যা ডেটাবেজ ও বই ব্যবস্থাপনাকে আরও দক্ষ করে তুলবে। অফিসের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত কম্পিউটার থাকলেও পাঠকদের ব্যবহারের জন্য কেবল একটি মাত্র কম্পিউটার উপলব্ধ, যা আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পাঠক সমাজের জন্য যথেষ্ট নয়।
গ্রন্থাগারটি বিভিন্ন জাতীয় দিবস উপলক্ষে নিয়মিত আলোচনা সভা, গ্রন্থ প্রদর্শনী এবং আবৃত্তি, বিতর্ক ও চিত্রাঙ্কন সহ বিভিন্ন ধরনের প্রতিযোগিতার আয়োজন করে থাকে। শিশুদের জন্য একটি পৃথক পাঠকক্ষ এবং তাদের মেধা বিকাশের লক্ষ্যে শিশুতোষ বই ও খেলনাসামগ্রী রাখা হয়েছে। এটি সারা দেশের মাত্র তিনটি সরকারি গ্রন্থাগারের মধ্যে একটি যা সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত খোলা থাকে, যা এটিকে পাঠকদের কাছে আরও সহজলভ্য করে তুলেছে।
গ্রন্থাগারটির সেবার মান এবং জনবল (৯টি পদের বিপরীতে ৭ জন কর্মরত) পেশাদারিত্বের দিক থেকে প্রশংসনীয় হলেও, বিদ্যমান অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এর পূর্ণ সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করছে। পর্যাপ্ত আর্থিক বরাদ্দ এবং একটি সুপরিকল্পিত সংস্কার কর্মসূচির মাধ্যমে ভবন সম্প্রসারণ, সীমানা প্রাচীর নির্মাণ, ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং আধুনিক সুযোগ-সুবিধা যুক্ত করা হলে গ্রন্থাগারটি তার উদ্দেশ্য পূরণে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে। এর মাধ্যমে এটি কেবল একটি গ্রন্থাগার হিসেবে নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান ও গবেষণা কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে উঠতে পারবে।
