দু’দিনের টানা বৃষ্টিপাতে সাতক্ষীরার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি
সাতক্ষীরায় গত দু’দিনের রাতভর টানা বর্ষণ ও দিনভর থেমে থেমে বৃষ্টিপাতে সাতক্ষীরার তালা, কলারোয়া, সাতক্ষীরা সদর, দেবহাটা, কালিগঞ্জ ও আশাশুনি উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে ভেসে গেছে মৎস্য ঘের, ছোট বড় পুকুর। পানিতে তলিয়ে আছে খাল-বিল, বাড়ির আঙ্গিনা। এছাড়া পানিতে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বেশ কিছু অফিস প্রাঙ্গণ পানিতে থৈ থৈ করছে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন জনসাধারণসহ শিক্ষার্থী ও সরকারি কর্মকর্তা, সরকারি অফিসে কাজে আসা সাধারণ মানুষ।

সুষ্ঠু ড্রেনেজ ব্যবস্থার অভাবে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় জলাবদ্ধতায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সাতক্ষীরা পৌরসভাসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। সরকারি অফিস, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়ায় কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছেন নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষ এবং কৃষকেরা।

রাতভর টানা বর্ষণে পৌরসদরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানসহ বিভিন্ন এলাকা পানিতে থৈ থৈ করছে। সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ, কলেজ মাঠ, হাসপাতাল চত্বর, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, একাধিক হাইস্কুলসহ শিক্ষা ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের আঙ্গিনায় পানি জমে গেছে। এতে সেবা নিতে আসা মানুষ ও কর্মরতদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। বেশি ভোগান্তিতে রয়েছেন সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ রোড থেকে শুরু করে মাঝখোলা এলাকার বাসিন্দারা। কারণ এই এলাকার রাস্তাঘাটে এখন হাঁটু সমান পানি রয়েছে। ফলে ডুবে গেছে ঘরবাড়ি, রান্নাঘর, টয়লেট। ভেঙে পড়েছে স্যানিটেশন ব্যবস্থা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সাতক্ষীরা পৌরসভার সহ উপজেলায় অপরিকল্পিত ও পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থার অভাব এবং ড্রেনগুলো নিয়মিত পরিষ্কার না করায় এই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলা এবং পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।

সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ রোডের বাসিন্দা আবু বক্কার ও হোসাইন গাজী বলেন, ‘বছরের পর বছর ধরে সাতক্ষীরার মানুষ একই দুর্ভোগে পড়ে আছে। পৌর কর্তৃপক্ষ কোনো কাজই ঠিক মতো করেন না। সব কাজে তারা অনিয়ম করে থাকে। আমরা ২০ বছর ধরে বসবাস করছি। সুষ্ঠু পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় সাবান্য বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে।

মাঝখোলা গ্রামের গৃহবধূ সালমা আক্তার, শাহানারা বেগম বলেন, ‘১৫ বছর ধরে এমন অবস্থা। বর্ষা মৌসুম আসলেই সামান্য বৃষ্টিতেই এই এলাকার রাস্তাঘাট খাল-বিল বাড়ির আঙ্গিনা পানিতে তলিয়ে থাকে। আমরা গৃহস্থলির কাজকর্ম করতে পারি না। আমরা কোনো ত্রাণ চাই না। সুষ্ঠু ড্রেনেজ ব্যবস্থার মাধ্যমে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা চাই। মাত্র গত দু’দিনের বৃষ্টিতে এখন রান্না ঘরে পানি ঢুকে হাড়ি-পাতিল নষ্ট, বন্ধ হয়ে গেছে খাওয়া দাওয়া।

সাতক্ষীরা সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী সবুজ জানান, পানির কারণে কলেজে যেতে পারি না। হাঁটু পানি পার হয়ে যেতে আমাদের পোশাক নষ্ট হয়ে যায়। ফলে এই সময়টা খুব দুর্ভোগ পোহাতে হয়। টিউবওয়েল ডুবে গেছে, পানি কিনে ব্যবহার করতে হচ্ছে।

এদিকে, বৃষ্টির কারণে কাজ হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন দিনমজুর ও ভ্যানচালকের মতো খেটে খাওয়া মানুষ। ভ্যানচালক কাত্তিক মন্ডল, জিয়াউদ্দিন জানান, বৃষ্টির জন্য ভ্যান নিয়ে বের হতে পারছি না, ভাড়াও নেই। প্রতিদিনের চাল-ডাল কেনা বন্ধ। চরম প্রভাব অনাটন আর দুর্ভোগের মধ্যে জীবন কাটাচ্ছি।

একইভাবে দিনমজুর আখতারুল ইসলাম বলেন, ‘দুইদিন ধরে ঘরে বসে আছি। কোনো কাজ নেই। পরিবার নিয়ে খুব সমস্যায় পড়ে গেছি।’

সাতক্ষীরা আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার রাতভর বৃষ্টি হয়েছে ১৪৬ মিলিমিটার। এই বৃষ্টিপাত আরও কয়েকদিন অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি আরও অবনতির শঙ্কা করছেন এলাকাবাসী। সাতক্ষীরা পৌরসভার পক্ষ থেকে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে জনদুর্ভোগ আরও বাড়বে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অর্নব দত্ত বলেন, গত দু’দিনের বৃষ্টিপাতে সাতক্ষীরার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে ভেসে গেছে বেশ কিছু মৎস্য ঘের ও ছোট বড় পুকুর। তবে কি পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা এখনো নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি।

তিনি আরও বলেন, নতুন সরকারের নেতৃত্বে জেলার বিভিন্ন খাল-নদী কাটা হচ্ছে। ফলে আমি মনে করি এবার হয়তো শহরের জলাবদ্ধতা দূর হবে। পাশাপাশি শহরের স্লুইস গেট খুলে দেওয়া হবে এবং প্রাণসায়ের খালে পানি নিয়ে যাওয়ার জন্য সকল ড্রেন গুলো সচল করে প্রাণসায়ের খালের সাথে যুক্ত করা হবে। তখন আশা করি পরিস্থিতির উন্নতি হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights