দেশে সোনার রিজার্ভ মূল্য বেড়ে দ্বিগুণ

শাহেদ আলী ইরশাদ

বিশ্ববাজারে সোনার দামের ব্যাপক বৃদ্ধির প্রভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যবান ধাতুর রিজার্ভ মূল্য প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। চলমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ডলারের অবমূল্যায়ন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ক্রমবর্ধমান সোনা মজুতের প্রবণতা এ বৃদ্ধির প্রধান কারণ বলে মত দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ বাৎসরিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুন শেষে সোনা ও রুপার সম্মিলিত রিজার্ভের মূল্য দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ১০০ কোটি ১৯ লাখ টাকা, যা আগের অর্থবছর (২০২২-২৩) এর ৫ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকার তুলনায় ৮৭ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। মূল্য বেড়েছে, পরিমাণ নয় : ২০২৩-২৪ অর্থবছরের শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের সোনা রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৫৮,৫৪২ দশমিক ৩৪ ট্রয় আউন্স, যা আগের বছরের তুলনায় মাত্র ৭,৩৭৩ দশমিক ৭৩ ট্রয় আউন্স বেশি। অর্থাৎ, রিজার্ভে সোনার পরিমাণে খুব একটা পরিবর্তন না ঘটলেও, মূল্যবৃদ্ধির কারণে সম্পদের হিসাব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘সোনার পরিমাণে বড় কোনো বৃদ্ধি ঘটেনি, কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম ঊর্ধ্বমুখী থাকায় আমাদের রিজার্ভের মূল্য অনেক বেড়েছে। আমরা আশা করছি, নতুন অর্থবছরেও (২০২৪-২৫) এ প্রবণতা অব্যাহত থাকবে।’ সোনার বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধির পেছনের কারণ : বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিকভাবে সোনার চাহিদা বেড়েছে মূলত যুক্তরাষ্ট্রের ডলার দুর্বল হওয়ার কারণে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ’ নীতির ফলে বিশ্ববাণিজ্যে টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে, যার ফলে অনেক দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সোনার দিকে ঝুঁকেছে। ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম প্রতি ট্রয় সোনার দামআউন্সে ২,৪০০ মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যায়, যা ইতিহাসের সর্বোচ্চ মূল্যস্তরের কাছাকাছি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সোনা কোথায় সংরক্ষিত : বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাদের সোনার রিজার্ভ তিনটি স্থানে সংরক্ষিত রয়েছে : ব্যাংক অব ইংল্যান্ডে : ২৮২,৪৬৩ দশমিক ৪২ ট্রয় আউন্স (মোট রিজার্ভের ৬১ শতাংশের বেশি)। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক, লন্ডন : প্রায় ২০ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব ভল্টে : ৮৩,৩৩৯ দশমিক ৮৫ ট্রয় আউন্স (প্রায় ১৮ শতাংশ) ব্যাংক অব ইংল্যান্ডে রাখা সোনার একটি অংশ গোল্ড লেন্ডিং অপারেশনের আওতায় ব্যবহার করা হয়ে থাকে। রুপার অবস্থান অপরিবর্তিত : অন্যদিকে, রিজার্ভে থাকা রুপার পরিমাণ আগের অর্থবছরের মতোই ১৬৮,৭২৮ দশমিক ১৫ ট্রয় আউন্স ছিল এবং এই রুপা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব ভল্টেই সংরক্ষিত রয়েছে। তবে তা থেকে কোনো বিনিয়োগ কার্যক্রম পরিচালিত হয়নি। সোনার গুরুত্ব : কেন এত চাহিদা; বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে সোনা রাখে মূলত অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে হেজ হিসেবে। বিশেষ করে যখন বৈশ্বিক বাজারে মুদ্রা অস্থির থাকে, তখন সোনা একটি নিরাপদ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য উত্তেজনা এবং বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিশ্ববাজারে সোনার চাহিদা বাড়িয়ে তুলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যবান ধাতুর রিজার্ভ মূল্যবৃদ্ধি জাতীয় সম্পদ হিসাবের দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিবাচক হলেও, বিশেষজ্ঞরা মনে করেন এ প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে রক্ষার জন্য বৈচিত্র্যপূর্ণ ও কৌশলগত রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে, বিশ্ববাজারে মূলধন ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে সোনার ভূমিকা আবারও প্রমাণিত হলো। এদিকে চলতি বছরের বাকি সময়ও সোনার বাজারদর ঊর্ধ্বমুখী থাকার পূর্বাভাস দিয়েছে ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল (ডব্লিউজিসি)। সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ডব্লিউজিসি জানিয়েছে, চলতি বছরের প্রথমার্ধে সোনার মূল্যবৃদ্ধির পেছনে যেসব কারণ আছে, সেগুলো হলো : ডলারের বিনিময় হার কমে যাওয়া, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বিনিয়োগকারীদের চাহিদা ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সোনা কেনা বেড়ে যাওয়া। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিশেষ করে স্থবিরতা বা মন্দার ঝুঁকি বাড়লে ভবিষ্যতে এই ধাতুর চাহিদা আরও বাড়তে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights