দোসর খুঁজতে বেসরকারি খাতের সর্বনাশ
বিশেষ প্রতিনিধি
২০২৪-এর আগস্টে আওয়ামী লীগের পতনের পর সবচেয়ে আতঙ্কে আছে বেসরকারি খাত। বড় শিল্প উদ্যোক্তা থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কেউই স্বস্তিতে নেই। শিল্প-ব্যবসা-বাণিজ্যে চলছে দোসর খোঁজার প্রতিযোগিতা। দোসর খুঁজতে গিয়ে বাদ নেই কোনো শিল্প মালিক কিংবা ব্যবসায়ী। বিগত সরকারের কারও সঙ্গে একটা ছবি থাকলেই হলো, তাঁকে ফ্যাসিস্টের দোসর বানিয়ে ফেলা হচ্ছে। লোম বাছতে যেমন কম্বল উজাড় হয়, তেমনি দোসর খুঁজতে গিয়ে বেসরকারি খাতকেই প্রতিপক্ষ বানিয়ে ফেলা হচ্ছে।
মিথ্যা মামলা দিয়ে তাঁদের হয়রানি করা হচ্ছে। সুযোগ-সন্ধানীরা চাঁদাবাজি করছে। কোনো তথ্য-প্রমাণ ছাড়াই ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করা হচ্ছে। এর ফলে উদ্বেগ বাড়ছে শিল্পপতি, ব্যবসায়ীদের মধ্যে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের চরিত্র হননের নোংরা খেলা চলছে। ফলে পুরো বেসরকারি খাতে আজ অসহায়। নতুন বিনিয়োগ নেই। এর সার্বিক প্রভাব পড়েছে দেশের অর্থনীতিতে। অথচ এ পরিস্থিতি সহজেই এড়ানো সম্ভব ছিল। সবকিছু রাজনৈতিক বিবেচনায় না দেখলে বাংলাদেশ আরও এগিয়ে যেতে পারত। বাংলাদেশই একমাত্র দেশ নয় যেখানে গণ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন হয়েছে। নেপাল, শ্রীলঙ্কাতেও প্রায় একইভাবে সরকার বদল হয়েছে। থাইল্যান্ডে সরকার পরিবর্তন হচ্ছে হরহামেশাই। কিন্তু এসব দেশে সরকার বদলের পর দোসর খোঁজার খেলায় মেতে ওঠেনি। ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, শিক্ষক, চিকিৎসক, ক্রীড়াবিদ সংস্কৃতি কর্মীদের রাজনৈতিক বিভাজনের বাইরে রাখা হয়। কারণ তারা দেশকে এগিয়ে নেওয়ার শক্তি। তাদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই। ব্যবসায়ীদের কথাই ধরা যাক, বাংলাদেশে ব্যাবসা-বাণিজ্য করতে গেলে সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতেই হবে। এই দেশে একটি লাইসেন্স থেকে শুরু করে গ্যাসের লাইন পেতেও সরকারের কাছে ধরনা দিতে হয়। সরকার সাহায্য ছাড়া বেসরকারি খাতে কিছু করা অসম্ভব। এই বাস্তবতা সবাই জানে গত ১৫ বছরে একটা কর্তৃত্ববাদী সরকার ক্ষমতায় ছিল। তারা বেসরকারি খাতের ওপর আরও প্রভাব বিস্তার করেছিল। এ সময় শিল্প বাঁচাতে, বিনিয়োগ সুরক্ষায় সরকারের সঙ্গে কমবেশি সবাইকেই সম্পর্ক রাখতে হয়েছে। মনে রাখতে হবে, একজন উদ্যোক্তা শুধু তাঁর কথা চিন্তা করেন না, তিনি চিন্তা করেন তাঁর হাজার হাজার শ্রমিক-কর্মচারীর। তিনি চিন্তা করেন দেশের অর্থনীতির। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই, বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি হচ্ছে বেসরকারি খাত। কিন্তু ৫ আগস্টের পর, অনেক স্বনামধন্য ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তাকে দোসর বানিয়ে অর্থনীতির বারোটা বাজানো হচ্ছে। এরকম তৎপরতা দেশের জন্য খুবই ক্ষতিকারক। এই প্রবণতা আমরা ২০০৭ সালের এক-এগারোর সময়ও দেখেছি। কখনো সেনাসমর্থিত এক-এগারো সরকার প্রতিষ্ঠিত শিল্প উদ্যোক্তা এবং ব্যবসায়ীদের হয়রানি করেছিল। জোরজুলুম এবং অত্যাচার নির্যাতন করে বেসামরিক খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল ফখরুদ্দীন মইনউদ্দিন সরকার। তাদের এসব দেশবিরোধী সর্বনাশা তৎপরতার কারণে, বাংলাদেশ পিছিয়ে যায় অন্তত পনেরো বছর। সবাই আশা করেছিল, গণ আন্দোলনের মাধ্যমে আশা অন্তর্র্বর্তী সরকার দেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করবে। বিগত সরকারের আমলে লুটপাটে জড়িত ব্যাংক লুটেরা এবং অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। কিন্তু গত ১৭ মাসে এ সরকার লুটেরা পাচারকারী আর প্রকৃত ব্যবসায়ীদের একই কাতারে দাঁড় করিয়েছে। অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি। আর্থিক খাতের যারা সর্বনাশ করেছে, রাতারাতি ব্যাংকের মালিক হয়ে যারা অর্থ লুট করে বিদেশে পাচার করেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের চেয়ে সরকার প্রকৃত ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নিতে বেশি আগ্রহী। ফলে, একদিকে যেমন পাচার হওয়া এক টাকাও ফেরত আসেনি, অন্যদিকে বেসরকারি খাত মুখ থুবড়ে পড়েছে। এ অবস্থায় নতুন করে বিনিয়োগ করার মতো পরিবেশ কিংবা সক্ষমতা কোনোটাই তাদের নেই। বিনিয়োগ খরার কারণে সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি ঐতিহাসিকভাবে সর্বনিম্ন, দশমিক ১ শতাংশে নেমেছে। এমনকি কভিডকালের চেয়েও এ সময়ে কম প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বছর পাঁচেক আগে কভিড মহামারিকালে লকডাউনের কারণে পুরো বিশ্ব একরকম থমকে গিয়েছিল। শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে অফিস-আদালত সবকিছুই বন্ধ ছিল সে সময়। বৈশ্বিক মহামারির সে বছর বাংলাদেশের বেসরকারি খাতে বিনিয়োগে দশমিক ২ শতাংশের মতো প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। অন্যদিকে কভিডকালে কর্মযজ্ঞ থেমে যাওয়ার মতো অস্বাভাবিক পরিস্থিতি না থাকলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি দশমিক ১ শতাংশে নেমেছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ। এরপর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এটি ৮ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে যায়। কভিডের কারণে ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র দশমিক ২ শতাংশ। তবে লকডাউন তুলে নেওয়ার পর অর্থনীতি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে শুরু করলে ২০২০-২১ অর্থবছরে বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৭ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়ায়। এর পরের ২০২১-২২ অর্থবছরে এটি আরও বেড়ে হয় ১১ দশমিক ৮ শতাংশ। অবশ্য ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশের বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধিতে বড় ধস নামে। সে অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ২ দশমিক ৯ শতাংশ। এর পরের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কিছুটা বেড়ে প্রবৃদ্ধি হয় ৪ দশমিক ৩ শতাংশ। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের বেসরকারি খাতের বিনিয়োগে মাত্র দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে বলে প্রাক্কলন করেছে বিশ্বব্যাংক। দেশে নতুন বিনিয়োগ কার্যত থমকে গেছে। শিল্প ও ব্যবসা খাতে প্রত্যাশিত বিনিয়োগ না আসায় সামগ্রিক অর্থনীতিও এখন বেশ স্থবির। রুটিন কর্মকাণ্ডের বাইরে কোনো উন্নয়ন প্রকল্পে যাচ্ছে না সরকার। নতুন শিল্প স্থাপন কিংবা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেই বেসরকারি খাতেও। এ পরিস্থিতিতে দেশের ব্যাংক খাত থেকে ঋণের চাহিদা প্রায় শূন্যের কোটায় নেমে এসেছে। আবার পুঁজিবাজারেও কোনো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হচ্ছে না।
বিরাজমান পরিস্থিতিতে উদ্যোক্তারা ব্যবসা সম্প্রসারণ নয়, বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। যারা ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত তাঁরা বিদ্যমান ব্যবসা কীভাবে বাঁচিয়ে রাখা যায়, সে চেষ্টা করছেন। ব্যবসা সম্প্রসারণ বা নতুন কোনো প্রকল্প নেওয়ার কথা কেউ ভাবছেন না। সরকারের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে কোনো দিকনির্দেশনা নেই। ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ কিংবা কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়ে সরকার কারও সঙ্গে আলোচনায়ও বসছে না। ফলে, দেশের বেসরকারি খাত এখন সর্বনাশের কিনারে।
