ধরনই বদলেছে, নির্যাতন থামেনি

জিন্নাতুন নূর

গাইবান্ধার রুবিনা আক্তারের মাত্রই বিয়ে হয়েছে। শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়রা নতুন বউ দেখতে এসে জানতে চায়, বাপের বাড়ি থেকে তাকে কোনো গয়না দেওয়া হয়েছে কি না! পাশের বাড়ির এক নারী রুবিনাকে প্রশ্ন করেন, ‘কেন তোমার স্বামীকে বিয়েতে কিছু দেয়নি তোমার মা-বাবা’? একের পর এক প্রশ্ন- ‘ঘর সাজানোর জন্যই বা কি দেওয়া হয়েছে’? তারা আরও বলেন, ‘বিয়েতে এখন মেয়ের বাড়ি থেকে ছেলের বাড়ির জন্য ঘর সাজানোর জিনিসপত্র দেওয়া হয়। ছেলের আয় উপার্জন বৃদ্ধির টাকা পয়সাও দেয়।’ রুবিনার মতো বাংলাদেশের কি শহর, কি গ্রাম- সব জায়গায় বিয়ের পর মেয়েদের শ্বশুরবাড়ি ও কাছের আত্মীয়দের কাছে এই কথাগুলো শুনতে হয়। কেউ সরাসরি বলেন, কেউ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলেন। আর এটিই হচ্ছে আধুনিক যৌতুক প্রথা। যৌতুক প্রথা বন্ধে এক সময় দেশে সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হলেও এখন আর এ নিয়ে কেউ কথা বলে না। সমাজে যৌতুক দেওয়া-নেওয়াও বন্ধ হয়নি। উল্টো বেড়েছে। ধরন বদলে এখন মেয়ের বাড়ির ‘উপহার’ যৌতুক হিসেবে গণ্য হচ্ছে। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, যৌতুকের ধরন বদলালেও যৌতুকলোভী স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকদের মেয়ের ওপর নির্যাতন বন্ধ হয়নি। ২০২৪ সালেই ৪৭৩ জন নারী যৌতুকের কারণে নির্যাতিত হয়ে পুলিশের জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে সাহায্য চেয়েছেন বলে জানা যায়। সামাজিকতার কারণে এখন দুই পরিবারের মধ্যে যখন বিয়ের কথাবার্তা চলে তখন আইনের ভয়ে সরাসরি যৌতুকের কথা না বললেও মেয়েকে শ্বশুরবাড়িতে পাঠানোর সময় এসি, টিভি, মোটরসাইকেল, গাড়ি এবং ফার্নিচারের মতো দামি উপহার দিতে বলা হয়। সচ্ছল পরিবারের মেয়ের অভিভাবকরা সোনার অলংকারের পাশাপাশি এসব দামি উপহার দিয়ে মেয়ের সুখের জন্য সংসার সাজিয়ে দিলেও নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়ের অভিভাবকদের ধার করে এসব মূল্যবান উপহার জোগাড় করতে হয়। এতে নিঃস্ব হয়ে পড়ে অনেক পরিবার। এ ছাড়া যৌতুক একবার নিয়ে আবারও তারা মেয়ের বাড়ি থেকে অর্থ নেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে। আর তা না পেলেই চালানো হয় নির্মম অত্যাচার। কখনো নির্মমভাবে হত্যা করা হয় ভুক্তভোগী মেয়েটিকে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিয়ের আয়োজনের নামে কয়েক শ থেকে হাজার লোক খাওয়ানোর রেওয়াজ আছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। অনুষ্ঠানে আতিথেয়তার নামে লাখ লাখ টাকা খরচ করতে হয়। এতে মেয়ের পরিবারের ওপর আর্থিকভাবে চাপ পড়ে।

‘এক্সপ্লোরিং দ্য সোসিও কালচারাল কনটেক্সট অব ডাউরি প্যাকটিস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক গবেষণায় বলা হয়, দেশের সিলেট অঞ্চলে বিয়েতে মূল্যবান উপহার সামগ্রী দেওয়াকে স্বাভাবিক হিসেবেই ধরা হয়। এতে আরও বলা হয়, সাধারণত মেয়ের সুখের জন্য, মেয়ের অভিভাবকদের আত্মসম্মান রক্ষা, শিক্ষা ও সচেতনতার অভাব এবং বরের আর্থিক সুবিধা গ্রহণের কারণে সমাজে এখনো যৌতুকের নামে উপহার দেওয়ার রেওয়াজ আছে। এতে আরও বলা হয়, মেয়ে দেখতে কালো কিংবা ধনী হলে এবং বর অসচ্ছল হলে যৌতুক নেওয়ার হার বেশি হয়। সাতক্ষীরা সদর উপজেলায় ১৪ জানুয়ারি যৌতুকের টাকার জন্য স্ত্রীকে পিটিয়ে ও শ্বাস রোধ করে হত্যার অভিযোগ উঠেছে উপজেলার ঝাউডাঙ্গা ইউনিয়নের মাধবকাটি গ্রামের আমিরুল ইসলামের (২৩) বিরুদ্ধে। নিহত খাদিজা খাতুনের (১৯) সঙ্গে মাত্র তিন মাস আগে আমিরুলের বিয়ে হয়। বিয়ের কয়েকদিন পর থেকেই আমিরুল শ্বশুরের কাছ থেকে যৌতুকের দুই লাখ টাকা আনতে খাদিজাকে চাপ দেয়। এতে খাদিজা আপত্তি জানালে তার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। এর মধ্যে ঘটনার দিন খাদিজাকে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে এবং মুখে বালিশচাপা দিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা কার হয় বলে জানা যায়। বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো অনেক সময় যৌতুকের অভিযোগ আমলে নিচ্ছে না এটি দুঃখজনক। তিনি বলেন, ঘৃণ্য এই প্রথা শুধু আইন প্রয়োগে বন্ধ করা যাবে না এজন্য প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights