ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ মজুদ: বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ও ক্ষতির আশঙ্কা

আব্দুস সালাম, দিনাজপুর প্রতিনিধি ঃ
চাহিদার কানাকড়িও নেই, অথচ বাধ্য হয়েই চলছে উত্তোলন; ফলে দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া খনির খোলা আকাশে এখন শুধুই কয়লার পাহাড়ের বিশালাকার দৃশ্য। ধারণক্ষমতার চেয়ে দ্বিগুণ মজুদ হওয়ায় ইয়ার্ডে সৃষ্টি হয়েছে চরম বিশৃঙ্খলা। স্তূপের উচ্চতা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় ভূগর্ভস্থ উত্তাপে কয়লায় প্রায়ই আগুন ধরে যাচ্ছে। এতে একদিকে যেমন খনি এলাকায় ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, তেমনি প্রতিনিয়ত পুড়ে ছাই হচ্ছে অমূল্য রাষ্ট্রীয় সম্পদ।
সরেজমিনে প্রাপ্ত তথ্যমতে, খনির ইয়ার্ডের ধারণক্ষমতা দুই লাখ টন হলেও বর্তমানে সেখানে মজুদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে তিন লাখ টনে। ২০১৯ সালে সরকারের নেওয়া এক আত্মঘাতী সিদ্ধান্তে বড়পুকুরিয়া তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রকে এই খনির একমাত্র ক্রেতা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউনিটগুলো একের পর এক বিকল হয়ে পড়া এবং সংস্কার কাজের দীর্ঘসূত্রতায় কয়লার ব্যবহার নেমে এসেছে তলানিতে। ফলে উত্তোলিত কয়লা ব্যবহারের কোনো জায়গা না থাকায় তা খনি প্রাঙ্গণেই পড়ে থাকছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, খনি থেকে দৈনিক গড়ে তিন হাজার টন কয়লা তোলা হলেও বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রের চাহিদা মাত্র ৭০০ টন। প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার ৩০০ টন অতিরিক্ত কয়লা জমা হচ্ছে ইয়ার্ডে। এই বিপুল পরিমাণ কয়লার স্তূপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। স্তূপে লাগা আগুন নিয়ন্ত্রণে একটি দল সার্বক্ষণিক কাজ করলেও বিপুল পরিমাণ কয়লা নষ্ট হওয়া ঠেকানো যাচ্ছে না।
এই সংকটের জন্য খনি ও বিদ্যুৎকেন্দ্র কর্তৃপক্ষ একে অপরকে দুষছে। খনি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগে টেন্ডারের মাধ্যমে খোলা বাজারে কয়লা বিক্রি হওয়ায় উৎপাদন ও বিক্রির মধ্যে একটি ভারসাম্য ছিল। কিন্তু বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর একক নির্ভরশীলতা এই পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। ৫২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন তিনটি ইউনিটের মধ্যে ২ নম্বর ইউনিটটি ২০২০ সাল থেকেই যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে অচল। বর্তমানে ১২৫ মেগাওয়াটের ১ নম্বর ইউনিটটি চললেও ২৭৫ মেগাওয়াটের ৩ নম্বর ইউনিটটি সংস্কারের নামে তিন মাস ধরে বন্ধ রয়েছে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী আবু বক্কর সিদ্দিক এই পরিস্থিতির জন্য খনি কর্তৃপক্ষকে দায়ী করে বলেন, আমরা উত্তোলন বন্ধ রাখতে বললেও তারা তা শোনেনি। অন্যদিকে, বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং লিমিটেড-বিসিএমসিএল এর মহাব্যবস্থাপক (জিএম) খান মো. জাফর সাদিক জানান, চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি এবং ভূগর্ভস্থ কারিগরি জটিলতা ও দুর্ঘটনা এড়াতে উত্তোলন বন্ধ রাখা সম্ভব নয়।
খনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহ আলম গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, চুক্তি অনুযায়ী তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র কয়লা নিতে না পারায় এই ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র কাঙ্ক্ষিত হারে কয়লা নিলেই কেবল এই সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। অন্যথায়, খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকা এই ‘কালো সোনা’ আগুনে পুড়ে নিঃশেষ হওয়ার পাশাপাশি বড় ধরনের পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights