ধোঁয়ায় আটকা ঢাকাবাসী

সুদীপ্ত দাস

রাজধানী ঢাকা বায়ুদূষণের কারণে বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। কলকারখানার পরে বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ রাজধানীতে চলাচলকারী বাস, ট্রাক, প্রাইভেট কার, মিনিবাস, নসিমন, লেগুনাসহ বিভিন্ন যানবাহন থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া। এ ছাড়াও বিভিন্ন রেস্টুরেন্ট, সিমেন্ট ফ্যাক্টরি, বর্জ্য পোড়ানো, ঢাকার আশপাশের এলাকার ইটভাটা থেকে নির্গত কালো ধোঁয়ার কারণে বায়ুদূষণ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। কালো ধোঁয়ায় অবস্থিত কার্বন মনো-অক্সাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইডের মতো বিষাক্ত পদার্র্থ বায়ুদূষণকে আরও বিষাক্ত করে তুলছে। এতে মানুষ হাঁপানি, হৃদরোগ, একজিমা, ফুসফুসের ক্যানসারের মতো রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। কালো ধোঁয়ায় একপ্রকার আটকা পড়েছে ঢাকাবাসী। রাজধানীর উত্তরা, আজমপুর, এয়ারপোর্ট, বনানী, মহাখালী, যাত্রাবাড়ী, গুলিস্তান, তেজগাঁও, গুলশান, বাড্ডা, রামপুরার মতো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, ফ্লাইওভার, এক্সপ্রেসওয়ে সিগন্যালে সরেজমিন দেখা গেছে, চলাচলরত বেশির ভাগ যানবাহন থেকেই নির্গত হচ্ছে কালো ধোঁয়া। সিগন্যাল ছাড়লে, ফ্লাইওভার-এক্সপ্রেসওয়েতে উঠতে, কোথাও থেকে যাত্রী নামিয়ে বা উঠিয়ে গাড়ি ছাড়লেই বের হচ্ছে কালো ধোঁয়া। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে সাধারণ মানুষ। উত্তরা আজমপুরে আট বছরের ছেলেকে নিয়ে রিকশার জন্য দাঁড়িয়েছিলেন রত্না আক্তার। পাশ দিয়ে একটি বাস কালো ধোঁয়া উড়িয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে ছেলেকে মাস্ক পরিয়ে দেন আর তিনিও ওড়না দিয়ে মুখ ঢাকেন। রত্না আক্তার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, রাস্তায় বের হলে মাস্ক নিয়ে বের হতে হয়। ঢাকায় মাস্ক ছাড়া চলাচল করা সম্ভব নয়। পরিষ্কার বাতাস নেই, তার ওপর গাড়ির কালো ধোঁয়া। বসবাসের অযোগ্য হয়ে গেছে ঢাকা শহর। কিছুদিন আগে ছেলেকে শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যার কারণে ডাক্তার দেখাতে হয়েছে। ডাক্তার বাইরে বের হলে মাস্ক ব্যবহার করতে বলেছেন। এ বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের বক্ষব্যাধি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আতিকুর রহমান বলেন, বায়ুদূষণের কারণে মানুষের ফুসফুসের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় এবং একে ফুসফুসের ঘাতক বলা হয়। এ ছাড়া এসব কালো ধোঁয়ায় অবস্থিত ঘাতক পদার্থগুলোর কারণে কাশি, অ্যাজমা, ব্রঙ্কাইটিস, একজিমার মতো রোগ দেখা দেয়। এমনকি ফুসফুসের ক্যানসার পর্যন্ত হতে পারে। এ ছাড়া হৃদরোগের আশঙ্কা বেড়ে যায়। তাই বায়ুদূষণকে নতুন তামাক হিসেবে ঘোষণা করেছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। তিনি বলেন, বায়ুদূষণের কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগে শিশু ও গর্ভবতী নারীরা। শিশুদের রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা কমে যায়। আগে রোগী এলে আমরা বলতাম ধূমপানের কারণে এমন রোগ হয়েছে। এখন রোগীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গর্ভবতী নারী ও শিশু। গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে দেখা যায় বাচ্চা জন্ম হলে ওজন কম হয়। পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জিয়াউল হক বলেন, কালো ধোঁয়া বায়ুদূষণের প্রধান কারণ। কলকারখানার পরে যানবাহনের কালো ধোঁয়া বায়ুদূষণ করে। এ ছাড়া ঢাকার আশপাশের এলাকায় কাঠ পোড়ানো, বিভিন্ন মিল-ফ্যাক্টরি, রড-সিমেন্ট ফ্যাক্টরি থেকে নির্গত কালো ধোঁয়াও বায়ুদূষণের জন্য দায়ী। তিনি জানান, ঢাকায় কালো ধোঁয়া বের হয় এমন গাড়িকে ধরে ডাম্প করা হয়। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ এবং ট্রাফিক পুলিশ মোবাইল কোর্ট বসিয়ে এসব যানবাহনকে জরিমানা করা হয়। পুলিশ গাড়ি ডাম্প করার পরও টাকা দিয়ে গাড়ি ছাড়িয়ে নিয়ে আবার রাস্তায় নামানো হয় বলে জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনাগ্রহী ঢাকা ট্রাফিক পুলিশের এক কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ঢাকায় চলা প্রতিটি গাড়ির নামে দুইয়ের অধিক মামলা রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights