ধ্বংসস্তূপের নিচে চার ঘণ্টা, ৯৭ বছরের বৃদ্ধার অবিশ্বাস্য বেঁচে ফেরা

অনলাইন ডেস্ক

নিথর রাতগুলোয় মাঝেমধ্যেই বৃদ্ধশ্রমের ঘরটিতে বসে হরিনামে সুর তুলতেন বার্ধক্যের ভারে নুয়ে পড়া ৯৭ বছর বয়সী বৃদ্ধা গুণ মায়া বোহরা। তবে হঠাৎ সেই সুরে ছেদ পড়ে। এখন ‘হরে রাম, হরে কৃষ্ণ’ ভজনের সুর বাতাসে মিলিয়ে গিয়ে ভেসে আসছে এক উদাস প্রশ্ন; পানি আমাকে ওভাবে এসে আঘাত করল কেন? দিনরাত হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে এই একই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে ফিরছেন তিনি। নেপালের রাজধানী কাঠমাণ্ডুর বীর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এই প্রবীণ নারী বর্তমানে চরম মানসিক ট্রমা (অ্যাকিউট স্ট্রেস ডিসঅর্ডার)-এ ভুগছেন। তার দুই হাত ও পা জুড়ে কালো আর নীল দাগ, শরীরের ভেতর বয়ে চলেছে এক অলৌকিক টিকে থাকার গল্প।

গত ২৬ আগস্টের সেই কালরাত আর সকালের স্মৃতি এখনও তাঁর মাথায় তাড়া করে ফিরছে। নুয়াকোটের দেবীঘাট এলাকার এক নদীতীরবর্তী বৃদ্ধাশ্রমের নিচতলার একটি কামরায় ছিলেন গুণ মায়া। হিমালয়ের সুউচ্চ চূড়ায় যে এক প্রকাণ্ড হিমবাহ ধসে পড়েছে, আর সেই ধস থেকে সৃষ্টি হওয়া ভূমিধসের জলরাশি ত্রিশূলী নদীতে আছড়ে পড়ে প্রলয়ঙ্করী বন্যা তৈরি করেছে, তার কিছুই জানা ছিল না তার। দেখতে দেখতে সেই উত্তাল জলস্রোত আর কাদা-পাথরের পাহাড়ি ঢল আছড়ে পড়ে বৃদ্ধাশ্রমটির নিচতলায়। স্রোতের তীব্র ধাক্কায় গুণ মায়া নিচতলার এক কোণে গিয়ে আটকে পড়েন। সেই ধ্বংসাত্মক স্রোতে অনেকেই জীবন হারালেও অলৌকিকভাবে গুণ মায়ার আশপাশের পানির তীব্রতা কিছুটা কম ছিল।

দুর্ঘটনার খবর পেয়েই নেপাল পুলিশ ও নেপালি সেনাবাহিনী উদ্ধার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে। প্রায় চার ঘণ্টা ধরে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে চলে ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ, যাতে ভেতরে আটকে থাকা বৃদ্ধার কোনো ক্ষতি না হয়। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন তার আত্মীয়স্বজনরাও। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তারা একটি জেসিবি এস্কেভেটর যন্ত্র নিয়ে সেখানে হাজির হন। গুণ মায়ার এক বড় নাতি দীপকের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, তারা ধাপে ধাপে কাদা ও পাথরের স্তূপ সরিয়ে অবশেষে এস্কেভেটরের বালতিতে করে তাকে পরম যত্নে নিরাপদে তুলে নিয়ে আসেন। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে তুলে আনা এই দীর্ঘজীবী নারী যেন মৃত্যুর মুখ থেকে নতুন এক জীবন ছিনিয়ে আনলেন।

তবে গত সপ্তাহের এই প্রলয়ঙ্করী বন্যা গুণ মায়ার জীবনে আসা ঘাত-প্রতিঘাতের প্রথম গল্প নয় বরং দীর্ঘ প্রায় এক শতাব্দীর জীবনে বারবার শোক ও হার না মানা সংগ্রামের মুখোমুখি হয়েছেন তিনি। ৯৭ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে তিনি তার স্বামীর মৃত্যুর ৮১ বছর পার করেছেন। তৎকালীন সমাজের বাল্যবিবাহের রেওয়াজ অনুযায়ী মাত্র আট বছর বয়সে নুয়াকোটের সূর্যগড়িতে তাঁর বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু বিয়ের মাত্র আট বছরের মাথায় স্বামীকে হারান তিনি। শোকের মিছিল এখানেই থামেনি; এর চার বছরের মধ্যে মা-বাবাকে হারান গুণ মায়া এবং তার কিছুদিন পর বিদায় নেন তাঁর একমাত্র ভাইও। কুড়ি বছর বয়সে পৌঁছানোর আগেই তার নিজের রক্তের সম্পর্কের প্রায় সব মানুষ পৃথিবী ছেড়ে চলে যান।

জীবনের এই দীর্ঘ যাত্রায় নিজের কোনো সন্তান হয়নি গুণ মায়ার। কিন্তু রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও তিনি কখনোই একা ছিলেন না। স্বামীর তিন ভাই, তাদের স্ত্রী এবং পরবর্তীতে তাঁদের সন্তানদের নিজের পরিবার বানিয়ে নিয়েছিলেন তিনি। তেরো জন ভাইপো আর বারো জন ভাইঝিকে নিজের সন্তানের মতো স্নেহ-ভালোবাসায় লালন-পালন করে বড় করেছেন। প্রতিদিন সকালে তাদের স্কুলে পাঠানোর জন্য পরম আদরে ভুট্টা ভেজে নাস্তা প্যাক করে দিতেন। দীপকের মতে, গুণ মায়াদের প্রজন্মের নারীরা তখনকার দিনে নীরবে-নিভৃতে কীভাবে গোটা সংসারকে আগলে রেখেছেন, তা আজকের দিনে সত্যি অবিশ্বাস্য। রক্তের কেউ বেঁচে না থাকলেও তার নিজের হাতে গড়া সেই পরিবারের ২৫ জন ভাইপো-ভাইঝি আজও পর্যায়ক্রমে বীর হাসপাতালের শয্যা পাশে রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন তাদের প্রিয় ‘মা’ সদৃশ অভিভাবককে।

৮৩ বছর বয়সে তিনি নিজ ইচ্ছাতেই দেবীঘাটের ‘সিনিয়র সিটিজেন ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন’ নামের ওই বৃদ্ধাশ্রমটিকে নিজের নতুন ঠিকানা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন, যাতে কাছাকাছি থাকা ভাইঝিরা এসে প্রতিদিন দেখা করে যেতে পারেন। বৃদ্ধাশ্রমের সমবয়সী মানুষদের মাঝে বেশ ভালোই কাটছিল তার দিন। সবার জন্মদিন উদ্‌যাপন করা, একসাথে ভজন গাওয়াই ছিল তার আনন্দের খোরাক। পায়ের পুরোনো সমস্যা আর বন্যায় হাতে পাওয়া চোট নিয়ে এখনও ডাক্তারদের পর্যবেক্ষণে রয়েছেন তিনি। তবে এত বয়সেও তাঁর শারীরিক যে সক্ষমতা, তা সত্যিই বিস্ময়কর। দুর্ঘটনার পর প্রথম দুই দিন কেবল ফলের রস খেয়ে থাকলেও এখন দুধ ও সাধারণ খাবার হজম করতে পারছেন তিনি।

শারীরিক জখম হয়তো সময়ের সাথে সাথে শুকিয়ে যাবে, কিন্তু মনের ভেতরের গভীর ক্ষত মিটতে সময় লাগছে। চিকিৎসাধীন গুণ মায়া বারবার জিজ্ঞেস করছেন, পানি কেন তাঁকেই এসে ওভাবে আঘাত করল। পরম মমতায় নাতি দীপক তাঁকে বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করেন যে, অনেক উঁচুতে থাকা গোসাইকুণ্ড হ্রদটি ভেঙে পড়ার কারণেই এই বিপত্তি ঘটেছে। বুড়িমা কিছুক্ষণ চুপ থেকে হয়তো বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করেন, কিন্তু কয়েক ঘণ্টা বাদেই সেই পুরোনো আতঙ্ক আবার তাকে গ্রাস করে, আবার ভেসে আসে সেই একই কাতর প্রশ্ন। কাঠমাণ্ডুর হাসপাতালের কোণে বসে ২৫ জন স্বজন এখন অপেক্ষা করছেন সেই দিনের, যেদিন দীর্ঘ সংগ্রামের প্রতীক ৯৭ বছরের এই বৃদ্ধার মন থেকে বন্যার আতঙ্ক মুছে যাবে এবং তিনি আবার আগের মতো শান্তিতে ভজনের সুরে হারিয়ে যাবেন।

সূত্র: কাঠমান্ডু পোস্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights