নড়াইলে বিলের পানিতে হাঁস পালন প্রাকৃতিক পরিবেশে বিলের পানিতে হাঁস পালন করে অন্তত পঁচিশ কোটি টাকার ডিম উৎপাদন করে বিল অঞ্চলের হাঁস মালিক ও কৃষক

শুভ সরকার, নড়াইল থেকে
নড়াইলে বিলের পানিতে বছরে ছয় মাস হাঁস পালন করে বেকারত্ব ঘুচাচ্ছে বেকার যুবকেরা। প্রতি বছর মৌসুমে এ সকল খামারীরা মাত্র ছয় মাস হাঁস পালন করে ইনকাম করছেন দুই লক্ষ থেকে দশ লক্ষ টাকা পর্যন্ত। প্রাকৃতিক পরিবেশে বিলের পানিতে হাঁস পালন করতে পারায় এবং অল্প খরচে তুলনা মূলক ভাবে বেশি লাভ হওয়ায় প্রতি বছর খামারের সংখ্যা যেমন বাড়ছে তেমন ডিম উৎপাদনের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। জেলায় প্রতি বছর সাড়ে তিন কোটি হাঁসের ডিম উৎপাদনের মধ্যে অন্তত দেড় কোটি ডিম উৎপাদন করছে এ জনপদের বিল অঞ্চলের মৌসুুম খামারীরা।
জানাগেছে, নয় শত আটষট্টি বর্গ কিলোমিটার আয়তনের কৃষি প্রধান জেলা নড়াইল। প্রায় আট লক্ষ মানুষের বসবাসের এ জেলা বিল ও ঘের বেষ্টিত। এ জনপদের মানুষের প্রধান জীবীকার উৎস কৃষি কাজ ও মৎস্য চাষ। জেলায় তেমন কোন শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে না উঠায় এ জনপদের ৮২ শতাংশ মানুষ কৃষি কাজের উপর নির্ভরশীল। বিসিক শিল্প নগরী বিহীন এ জেলায় ব্যাপক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও তেমন কোন উদ্যোগতা গড়ে উঠেনি। তবে বেশ কয়েক বছর ধরে নিজ নিজ উদ্যোগে অন্তত দেড় শত কৃষক ও যুবকেরা বর্ষা মৌসুমে অস্থায়ী খামার করে হাঁস পালন করছেন।

এমনই একজন খামারী সদর উপজেলার শোলপুর গ্রামের বাসিন্দা মো: হাদিউজ্জামান। কথা হলে তিনি জানান, এক সময় কৃষি কাজ করে সংসার চালাতেন। কৃষি কাজে তেমন কোন লাভ না হওয়ায় বন্ধুর পরামর্শে পাঁচ বছর আগে শুরু করেন বর্ষা মৌসুম হাঁসের খামার। প্রথম বছরে মাত্র দুই শত হাঁস দিয়ে খামার শুরু করেন। লাভ ভাল হওয়ায় প্রতি বছর খামারে হাঁসের সংখ্যা বাড়িয়েছেন। এবছরও এই খামারী হাঁস পালন করছেন। বর্তমানে তার খামারে হাঁসের সংখ্যা পাঁচ শতটি। প্রতিদিন এই খামার থেকে অন্তত চার শতটি ডিম উৎপাদন হচ্ছে। চলতি মৌসুমে ছয় মাস খামার পরিচালনা করে অন্তত তিন লক্ষ পঞ্চাশ হাজার থেকে চার লক্ষ টাকা লাভের আশা করছেন তিনি।

কৃষক ও খামারীরা জানান, শুধু মো: হাদিউজ্জামান নয়, জেলার লোহাগড়া, কালিয়া এবং সদর উপজেলার শোলপুর বিল, ইছামতি বিল, কলোড়ার বিল, দুধপাতলের বিল, পাটেরশরী বিলসহ বারটি বিলের আশপাশের গ্রামের অন্তত দেড় শত কৃষক ও যুবকেরা অস্থায়ী খামার করে হাঁস পালন করছেন। প্রতিদিন সকালে খোঁলা আকাশের নিচে দিগন্তজোড়া বিলের মধ্যে হাঁস ছেড়ে দেন খামারীরা। সারাদিন বিলের পানিতে দল বেধে ঘুরে বেড়ায় হাঁস। বিলে থাকা প্রাকৃতিক খাবার খায় আর বিল ভরা পানিতে মনের আনন্দে দল বেধে খেলা করে হাঁস। সারাদিন পানিতে ছোটাছুটি করে সন্ধার আগে এক সাথে আবার ঘরে ফেরে প্রতিটা খামারের হাঁস।
শোলপুর গ্রামের খামারী মো: জিহাদ বলেন, প্রতিবেশি বড় ভাইদের দেখে তিন বছর আগে দুই শত হাঁস নিয়ে খামার শুরু করেছিলাম, প্রথম বছর থেকে ভাল ভাল হচ্ছে। এজন্য প্রতি বছর খামারে হাসের সংখ্যা বাড়িয়েছি, বর্তমানে খামারে হাঁসের সংখ্যা এক হাজার। আশা করছি এবছর পাঁচ থেকে ছয় লক্ষ টাকা লাভ হবে। লোহাগড়া উপজেলার আড়পাড়া গ্রামের খামারী তজিবর শেখ বলেন, বিলের পানিতে হাঁস পালন করলে হাঁস প্রাকৃতিক খাবার খায় ফলে উৎপাদন খরচ অনেক কম হয় এবং লাভ বেশি হয়। একই এলাকার খামারী রেজাউল ইসলাম বলেন, বিল অঞ্চলের প্রতিটা খামারে রয়েছে দুই শত থেকে দুই হাজারটি পর্যন্ত ক্যাম্বেল হাঁস। অস্থায়ী খামার ছাড়াও বিল এলাকার প্রতিটি বাড়িতে এই সময় হাঁস পালন করেন পরিবারের সদস্যরা। খামারী শাহীন বলেন, বছরে একটানা ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে ডিম দেয় এ হাঁস। প্রতিদিন সকাল বেলা খামার থেকে ডিম সংগ্রহ করে ব্যবসায়ীদের কাছে প্রতিপিচ ডিম পনেরো টাকা দরে বিক্রি করেন হাঁস মালিকরা। হাঁস পালন করে এলাকার খামারী ও হাঁস মালিকদের পরিবারে এসেছে স্বচ্ছলতা। আর প্রতি বছর এ জনপদে খামারের সংখ্যা বাড়াচ্ছেন হাঁস প্রেমিরা।
জেলা প্রানি সম্পদ অফিস সূত্রে জানাগেছে, প্রতিবছর নড়াইল থেকে সাড়ে তিন কোটি হাঁসের ডিম উৎপাদন হয় যার বাজার মূল্য অন্তত বায়ান্ন কোটি টাকা, এর মধ্যে দেড় কোটিরও বেশি ডিম উৎপাদন হয় বিলের পানিতে ছয় মাস হাঁস পালন করে। ছয় মাসের এই সিজনে প্রাকৃতিক পরিবেশে বিলের পানিতে হাঁস পালন করে অন্তত পঁচিশ কোটি টাকার ডিম উৎপাদন করে বিল অঞ্চলের হাঁস মালিকরা।
নড়াইল জেলা প্রানি সম্পদ অফিসার ডা: সিদ্দীকুর রহমান বলেন, বিল এলাকায় হাঁস পালন করলে খামারীরা বেশি লাভবান হয়। প্রাকৃতিক পরিবেশে খোলা আকাশের নিচে বিলের পানিতে হাঁস ছেড়ে দিলে বিলের খাবার খায় ফলে খামাারীদের হাঁসের খাবারের জন্য বাড়তি পয়সার প্রয়োজন হয়না। ফলে খামারিরা বেশি লাভবান হয়। হাঁসের মাংস ও ডিম উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য খামারীদের প্রশিক্ষণ, কারিগরী সহযোগিতা ও ভ্যাকসিনসহ বিভিন্ন প্রকার সহযোগিতা করা হয় ।
নড়াইল -২৭.১১.২৪

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights