নতুন উত্তেজনায় বৈশ্বিক তেলের বাজার পুনরুদ্ধার নিয়ে আইইএ’র সতর্কতা

অনলাইন ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পুনরায় শুরু হওয়া হামলা-পাল্টা হামলা বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটকে আরও দীর্ঘায়িত করার হুমকি তৈরি করছে বলে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ)।

শুক্রবার জাতিসংঘের এই সংস্থাটি জানায়, এই শত্রুতা পুনরায় শুরু হওয়ার ফলে জ্বালানি বাজারে দ্রুত পুনরুদ্ধারের যে আশা ছিল, তা ভেস্তে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানি বাহিনীর সামরিক তৎপরতায় কিছুটা স্থবিরতা আসার পর এই সতর্কতা এসেছে। যা কূটনীতি পুনরুজ্জীবিত করার প্রচেষ্টার পথ সুগম করেছে বলে মনে হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো সতর্ক করেছে, মার্কিন সামরিক বাহিনী যেকোনো সময় পুনরায় হামলা চালাতে প্রস্তুত রয়েছে।

আইইএ তাদের সর্বশেষ মাসিক তেল বাজার প্রতিবেদনে জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে চলমান সংঘাতের কারণে উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যাহত হতে থাকায় ২০২০ সালের পর এই প্রথম চলতি বছরে বিশ্বব্যাপী তেলের চাহিদা হ্রাসের মুখে পড়েছে।

সংস্থাটি জানায়, গত মাসে স্বাক্ষরিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারকের ওপর ভিত্তি করে বাজারে একটি পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া চলছিল, তবে তারা সতর্ক করেছে যে নতুন করে উত্তেজনা বৃদ্ধি এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

চলতি সপ্তাহে শুরু হওয়া নতুন দফার এই লড়াইয়ের সূত্রপাত হয়েছিল সমঝোতা স্মারকে হরমুজ প্রণালী সংক্রান্ত ধারাগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলোর ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যার কারণে। গত এপ্রিলে ইরানের ওপর মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার মাধ্যমে সংঘাত শুরু হওয়ার আগে, এই জলপথটি দিয়ে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হতো।

আইইএ জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ (১৪ মিলিয়ন) ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের প্রবাহ কমে গেছে। এই জ্বালানি ঘাটতি এবং মূল্যবৃদ্ধি বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মারাত্মক আঘাত হেনেছে।

জাতিসংঘের এই সংস্থাটি জানায়, সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর এবং প্রণালীটি পুনরায় খুলে দেওয়ার পর জুন মাসে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ প্রতিদিন ৪১ লাখ ব্যারেল বৃদ্ধি পেয়েছিল। যদিও এই সরবরাহ যুদ্ধপূর্ব পরিস্থিতির চেয়ে এখনও প্রতিদিন ৯৪ লাখ ব্যারেল কম।

প্রণালীটি পূর্ণাঙ্গভাবে সচল হবে-এমন ধারণার ওপর ভিত্তি করে আইইএ পূর্বাভাস দিয়েছিল, ২০২৬ সালে যেখানে প্রতিদিন ৮ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেল ঘাটতি ছিল, সেখানে ২০২৭ সালে বৈশ্বিক সরবরাহে প্রতিদিন ৪৬ লাখ ২০ হাজার ব্যারেল উদ্বৃত্ত থাকবে।

যাইহোক, লড়াই পুনরায় শুরু হওয়ায় হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল আবারও স্থবির হয়ে পড়েছে। এই বিপর্যয় সত্ত্বেও, তেলের দাম মোটের ওপর স্থিতিশীল রয়েছে। শুক্রবার ভোরের দিকে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রতি ব্যারেল ৭৬.৩৭ ডলারে দাঁড়ায়, যা বৃহস্পতিবারের বন্ধ হওয়া মূল্যের চেয়ে সামান্য পরিবর্তিত হলেও এক সপ্তাহ আগের তুলনায় ৪ ডলারের বেশি।

বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে এই আপেক্ষিক শান্ত পরিস্থিতি মূলত পরিস্থিতির স্থিতিশীল হওয়ার প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে প্রতিফলিত করে। যদিও কমতে থাকা মজুত আগামী সপ্তাহগুলোতে দাম আরও বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বরাত দিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার ও শুক্রবারের হামলার এই সাময়িক বিরতি মূলত নেপথ্যে কূটনীতি পুনরুজ্জীবিত করা এবং যুদ্ধবিরতি পুনর্বহালের চলমান প্রচেষ্টারই বহিঃপ্রকাশ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কিন সূত্রগুলো সিএনএন’কে জানিয়েছে, ওয়াশিংটন হামলা চালানোর পর কিছুটা বিরতি দিচ্ছে যাতে উত্তেজনা আর না বাড়ে এবং কূটনীতি কাজ করার সুযোগ পায়।

এই দাবিটি একজন মার্কিন কর্মকর্তার বক্তব্যের সাথে মিলে যায়, যিনি এর আগে আল-জাজিরাকে বলেছিলেন, ওয়াশিংটন তেহরানের সাথে আলোচনার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তির জন্য কারিগরি আলোচনা অব্যাহত থাকবে।

তবে সিএনএন’র সেই সূত্রটি এই সতর্কবার্তাও দিয়েছে যে, প্রয়োজন হলে মার্কিন সামরিক বাহিনী নতুন করে হামলা চালাতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।

সূত্র: আল-জাজিরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights