নতুন কাঠামোয় কর বাড়ার শঙ্কা চাকরিজীবীদের

নিজস্ব প্রতিবেদক

করমুক্ত আয়সীমা ২৫ হাজার টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হলেও আগামী অর্থবছরে চাকরিজীবী ও মধ্যম আয়ের করদাতাদের বড় অংশকে আগের তুলনায় বেশি কর দিতে হতে পারে। অর্থবিলে-২০২৬ প্রস্তাবিত করস্ল্যাব পুনর্বিন্যাস, বিনিয়োগে কর-রেয়াত কমানো এবং করসুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে নতুন শর্ত আরোপের কারণে করমুক্ত সীমা বৃদ্ধির সুফল অনেকটাই কমে যাবে বলে মনে করছেন কর বিশেষজ্ঞরা।

প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে একই সঙ্গে ৫ শতাংশের প্রাথমিক করস্ল্যাব বাতিলের প্রস্তাবও রাখা হয়েছে।

বর্তমান ব্যবস্থায় করমুক্ত সীমার পর প্রথম ১ লাখ টাকা আয়ের ওপর ৫ শতাংশ কর দিতে হয়। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী করমুক্ত সীমার অতিরিক্ত প্রথম ৩ লাখ টাকা আয়ের ওপর ১০ শতাংশ কর আরোপ করা হবে। ফলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের চাকরিজীবীদের করদায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে। কর পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেস লিমিটেডের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মাসিক ৭৪ হাজার টাকা আয় করা একজন করদাতার করদায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রায় ৪৯ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। করস্ল্যাবের পরিবর্তন এবং বিনিয়োগজনিত কর-রেয়াত কমানোর কারণে এই অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে।

বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, মাসিক এক লাখ টাকা পর্যন্ত আয়কারীরা নতুন কাঠামোর সবচেয়ে বেশি প্রভাবের মুখে পড়তে পারেন। বিপরীতে মাসে আড়াই লাখ টাকার বেশি আয়কারীদের করদায়ও বাড়বে, তবে বৃদ্ধির হার তুলনামূলক কম, প্রায় ১০ শতাংশ।

বর্তমানে অনুমোদিত সঞ্চয় ও আর্থিক খাতে বিনিয়োগের বিপরীতে করদাতারা বিনিয়োগের ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কর-রেয়াত পান। অর্থবিলে তা কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ কর-রেয়াতের সীমা ১০ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে সাড়ে ৭ লাখ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর ফলে যারা সঞ্চয়পত্র, ডিপিএস বা অন্যান্য অনুমোদিত বিনিয়োগের মাধ্যমে করদায় কমিয়ে থাকেন, তাদের সুবিধা কমে যাবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত কর দেওয়া চাকরিজীবীদের একটি বড় অংশ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ও কর বিশেষজ্ঞ স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, প্রস্তাবিত পরিবর্তনগুলো কার্যকর হলে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের কার্যকর করহার বৃদ্ধি পাবে। বিশেষ করে নির্দিষ্ট বেতনের চাকরিজীবীদের ওপর এর প্রভাব বেশি পড়বে।

প্রস্তাব অনুযায়ী, করসুবিধা পাওয়া কোনো বিনিয়োগ মেয়াদপূর্তির আগে তুলে নিলে আগে নেওয়া কর-রেয়াত অতিরিক্ত কর হিসেবে পরিশোধ করতে হবে। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, সঞ্চয়পত্র বা এ ধরনের কোনো বিনিয়োগ নির্ধারিত মেয়াদের আগে ভাঙানো হলে করদাতাকে আগে পাওয়া কর-সুবিধা ফেরত দিতে হবে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, করমুক্ত আয়ের সীমা বৃদ্ধির ফলে সীমিতসংখ্যক করদাতা উপকৃত হলেও অধিকাংশ করদাতার করদায় বাড়বে। বিশেষ করে মধ্যম আয়ের চাকরিজীবীরা তুলনামূলক বেশি চাপের মুখে পড়বেন। তার মতে, মূল্যস্ফীতির কারণে এমনিতেই মধ্যবিত্তের প্রকৃত আয় কমে গেছে। নতুন করব্যবস্থা কার্যকর হলে তাদের ব্যয়যোগ্য আয় আরও কমে যাবে, যা ভোগব্যয় ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। তবে করদাতাদের জন্য একটি নতুন সুবিধাও প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রথমবারের মতো নির্ধারিত সময়ের আগেই আয়কর রিটার্ন দাখিল করলে কর-রেয়াত দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। প্রস্তাব অনুযায়ী, ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে প্রদেয় করের ৫ শতাংশ বা সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত কর-রেয়াত পাওয়া যাবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কর প্রশাসনে শৃঙ্খলা আনা এবং রাজস্ব আদায় বাড়ানোর লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে সামগ্রিকভাবে করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানোর ঘোষণার পরও চাকরিজীবী ও মধ্যম আয়ের করদাতাদের বড় অংশকে আগামী করবর্ষে বেশি কর দিতে হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights