নতুন সরকার, পুরোনো প্রশ্ন

জিল্লুর রহমান

নতুন সরকার, পুরোনো প্রশ্ন : বাংলাদেশের চার বাস্তবতা

বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় বাস্তবতা গত দুই বছরে এমন দ্রুত বদলেছে যে অনেক সময় মনে হয় আমরা যেন ইতিহাসের একটি ঘূর্ণাবর্তের ভিতর দাঁড়িয়ে আছি। একদিকে অভ্যুত্থান, অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকার, তারপর নির্বাচন এবং নতুন সরকার-সব মিলিয়ে একটি দীর্ঘ উত্তেজনাপূর্ণ সময় পার করেছে দেশ। কিন্তু বড় প্রশ্নটি এখনো থেকে গেছে। এত সব ঘটনার পর আমরা কি সত্যিই একটি নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছি, নাকি কেবল একটি পুরোনো গল্পের নতুন সংস্করণ দেখছি? এই সপ্তাহের চতুর্মাত্রায় চারটি আলাদা কিন্তু সম্পর্কযুক্ত প্রশ্ন নিয়ে ভাবতে চাই।

১. নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশের নতুন বাস্তবতা

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচন কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়; এটি একটি দীর্ঘ অস্থির সময়ের সমাপ্তি এবং একই সঙ্গে একটি নতুন পরীক্ষার শুরু। ২০২৪ সালের গণ অভ্যুত্থানের সময় দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা একেবারে বদলে যায়। বহু বছরের প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতার কাঠামো ভেঙে পড়ে। এরপর অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে দেশ প্রায় দেড় বছর কাটায়-সংস্কার, বিতর্ক, প্রত্যাশা এবং অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে। এই সময়ের মধ্যে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে। বাংলাদেশের জনগণ রাজনৈতিক পরিবর্তন চায়, কিন্তু সেই পরিবর্তন যেন বিশৃঙ্খলা না ডেকে আনে-এই আশাও তাদের রয়েছে। এখন নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে। নির্বাচনের উত্তাপ ধীরে ধীরে কমছে। সংসদ বসছে। প্রশাসন আবার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে চাইছে। কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতি কি বদলাবে? বাংলাদেশের রাজনীতির একটি দীর্ঘ ইতিহাস আছে। ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, দলীয় আনুগত্য, প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব-এসব বিষয় বহু দশক ধরে আমাদের রাষ্ট্রকে প্রভাবিত করেছে। যদি নতুন সময় সত্যিই নতুন হতে চায়, তাহলে এই সংস্কৃতির কিছু মৌলিক পরিবর্তন দরকার। নির্বাচন দিয়ে গণতন্ত্র শুরু হয়, শেষ হয় না।

২. রাষ্ট্র বনাম মব

গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের সমাজে একটি অদ্ভুত প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্র বদলালেও সমাজে ‘মব’ সংস্কৃতি যেন বেড়েই চলেছে। কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে, কখনো প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানে, উত্তেজনাপূর্ণ সময়কখনো ব্যাংকের ভিতরে-জনতার চাপ তৈরি করে দাবি আদায়ের ঘটনা ঘটছে। এটি নতুন কোনো বিষয় নয়। কিন্তু আগে এসব ঘটনা ছিল বিচ্ছিন্ন। এখন অনেক সময় মনে হয় যেন এটি একটি গ্রহণযোগ্য কৌশলে পরিণত হয়েছে।

রাষ্ট্রের একটি মৌলিক কাজ হলো আইনের শাসন নিশ্চিত করা। যদি কোনো সিদ্ধান্ত ভুল হয়, সেটি সংশোধনের জন্য আদালত আছে, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া আছে, গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের পথ আছে। কিন্তু যখন মানুষ সরাসরি চাপ প্রয়োগ করে সিদ্ধান্ত বদলাতে শুরু করে, তখন রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব দুর্বল হয়ে যায়। বিশ্ব ইতিহাসে দেখা গেছে, রাষ্ট্র যখন দুর্বল হয় তখন প্রথমে বিশৃঙ্খলা বাড়ে, পরে শক্তিশালী কোনো নতুন কর্তৃত্বের উত্থান ঘটে। বাংলাদেশ কি সেই পথে যাবে? নাকি আমরা এমন একটি রাষ্ট্র গড়ে তুলতে পারব যেখানে নাগরিক স্বাধীনতা থাকবে, কিন্তু আইনের শাসনও দৃঢ় থাকবে?

৩. অর্থনীতির সূক্ষ্ম বাস্তবতা

রাজনীতি যতই উত্তপ্ত হোক, শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নির্ভর করে অর্থনীতির ওপর। বাংলাদেশের অর্থনীতি গত কয়েক বছরে বড় চাপের মধ্য দিয়ে গেছে। বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, জ্বালানি সমস্যা, বৈশ্বিক বাজারের অনিশ্চয়তা-সব মিলিয়ে একটি কঠিন সময় পার করতে হয়েছে। তবু কিছু আশার আলোও আছে। রেমিট্যান্স আবার বাড়ছে। পোশাকশিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। অবকাঠামো উন্নয়নের অনেক প্রকল্প ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এখনো একটি বড় প্রশ্ন রয়েছে-বিশ্বাস।

বিনিয়োগকারীরা সাধারণত দুটি জিনিস খোঁজেন : স্থিতিশীলতা এবং পূর্বানুমান যোগ্যতা। যদি রাজনৈতিক পরিবেশ স্থিতিশীল হয় এবং নীতিনির্ধারণে ধারাবাহিকতা থাকে, তাহলে অর্থনীতি দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারে। বাংলাদেশের অর্থনীতির শক্তি হলো এর জনগণ, বিশেষ করে তরুণ শ্রমশক্তি এবং উদ্যোক্তারা। রাষ্ট্র যদি তাদের জন্য একটি স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করতে পারে, তাহলে সম্ভাবনা এখনো বিশাল।

৪. বিশ্ব রাজনীতির পরিবর্তন

বাংলাদেশ কখনোই একটি বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্র ছিল না। বরং ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এটি সব সময়ই বড় শক্তিগুলোর নজরে থেকেছে। আজকের বিশ্ব রাজনীতি দ্রুত বদলাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রতিযোগিতা বাড়ছে। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কও বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হলো ভারসাম্য।

একটি দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক মানেই অন্য দেশের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করা নয়। বরং সফল কূটনীতি হলো এমন একটি ভারসাম্য তৈরি করা, যাতে সব পক্ষের সঙ্গে সহযোগিতা বজায় থাকে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন কূটনৈতিক ভারসাম্যের উদাহরণ আছে। কিন্তু নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই দক্ষতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

শেষ কথা

রাজনীতি, রাষ্ট্র, অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক-এই চারটি মাত্রা আলাদা মনে হলেও বাস্তবে তারা পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া অর্থনীতি এগোয় না। শক্তিশালী রাষ্ট্র ছাড়া আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হয় না। আর সফল কূটনীতি ছাড়া একটি ছোট বা মাঝারি দেশের পক্ষে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন।

বাংলাদেশ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের পথ নির্ধারণ করবে। এই সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হয়তো একটি শব্দ-পরিমিতি। উত্তেজনার বদলে ধৈর্য, প্রতিশোধের বদলে ন্যায়বিচার, আর ক্ষমতার অহংকারের বদলে রাষ্ট্র পরিচালনার প্রজ্ঞা। ইতিহাসের একটি শিক্ষা খুবই স্পষ্ট যে রাষ্ট্র নিজের ভিতরের ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে, তার ভবিষ্যৎ সাধারণত উজ্জ্বল হয়। বাংলাদেশ কি সেই ভারসাম্য খুঁজে পাবে? সম্ভবত আগামী কয়েক বছরেই তার উত্তর মিলবে।

লেখক : প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights