নবায়নযোগ্য জ্বালানির সুবিধা সীমিত গোষ্ঠীর মধ্যে আটকে গেছে: বিএসআরইএ

নিজস্ব প্রতিবেদক
জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭-এ নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে কর ও শুল্ক সুবিধা ঘোষণার পর ব্যাপক আশাবাদ তৈরি হলেও বাস্তবে এসব সুবিধা সীমিতসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরইএ)।

রবিবার রাজধানীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটি দাবি করে, বাজেট ঘোষণার পর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) জারি এসআরও বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঘোষিত সুবিধাগুলো মূলত নির্দিষ্ট কিছু সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এবং রেসকো মডেলের আওতায় পাওয়ার পারচেজ এগ্রিমেন্ট (পিপিএ) ভিত্তিক বিদ্যুৎ সরবরাহকারী কোম্পানির জন্য প্রযোজ্য করা হয়েছে। ফলে আবাসিক, কৃষি (সোলার সেচ), ক্ষুদ্র বাণিজ্যিক গ্রাহকসহ বৃহৎ অংশের সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারকারী এবং খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা এসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

বিএসআরইএ জানায়, দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাজারের সবচেয়ে বড় অংশ গড়ে উঠেছে আমদানিকারক, পরিবেশক, ডিলার, খুচরা ব্যবসায়ী, ইপিসি (ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রকিউরমেন্ট অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন) প্রতিষ্ঠান এবং নিজস্ব অর্থায়নে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনকারী গ্রাহকদের মাধ্যমে। অথচ বর্তমান প্রণোদনা কাঠামোতে তাদের জন্য কার্যকর কোনো সুবিধা রাখা হয়নি।

বিএসআরইএ’র মতে, বর্তমান এসআরও কাঠামোর ফলে সীমিত সংখ্যক রেসকো কোম্পানি সুবিধা পেলেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের সঙ্গে জড়িত হাজারো আমদানিকারক, ডিলার, খুচরা ব্যবসায়ী ও ইপিসি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা এবং কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বর্তমান এসআপও-এর সুবিধা মূলত দেশের মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের ২০–২২% অংশকে লক্ষ্য করছে, অথচ বৃহত্তর ব্যবহারকারী শ্রেণি এর বাইরে রয়ে গেছে।

সংগঠনটির মতে, রেসকো মডেল বড় শিল্প গ্রাহকদের জন্য উপযোগী হলেও আবাসিক, কৃষি (সোলার সেচ) ও গ্রামীণ গ্রাহকদের জন্য এটি কার্যকর নয়। ফলে দেশের বৃহত্তম ভোক্তা গোষ্ঠী সরকারের ঘোষিত সুবিধার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বর্তমানে সাধারণ মানুষের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে যে, সৌর প্যানেল ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং বাজারে পণ্যের দাম কমেছে। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ সৌরপণ্যের ক্ষেত্রে বিদ্যমান শুল্ক ও কর কাঠামোয় উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন হয়নি। এতে বাজারে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে এবং ব্যবসায়ীরা অযৌক্তিক চাপের মুখে পড়ছেন।

বিএসআরইএ আরও অভিযোগ করে, চলতি বাজেট ও সংশ্লিষ্ট এসআরওতে সোলার ইরিগেশন, সোলার স্ট্রিট লাইট এবং ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম (বিইএসএস) খাতের জন্য কার্যকর নতুন কোনো প্রণোদনা দেওয়া হয়নি। দেশে প্রায় ১৭ লাখ ডিজেলচালিত সেচ পাম্প থাকলেও সেগুলোকে সৌরচালিত ব্যবস্থায় রূপান্তরের জন্য কোনো সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা বা আর্থিক প্রণোদনা বাজেটে প্রতিফলিত হয়নি।

সংগঠনটি জানায়, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জামের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের ‘ওয়েট-বেইজড অ্যাসেসমেন্ট’ পদ্ধতির পরিবর্তে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘ট্রানজ্যাকশন ভ্যালু’ ভিত্তিক মূল্যায়ন চালুর বিষয়েও কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে প্রকৃত আমদানি মূল্যের তুলনায় অতিরিক্ত মূল্যায়নের কারণে প্রকল্প ব্যয় অযৌক্তিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বিএসআরইএ’র পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দেশের মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীর ৬৩ শতাংশই আবাসিক, কৃষি (সোলার সেচ) ও ক্ষুদ্র বাণিজ্যিক গ্রাহক। অথচ বর্তমান প্রণোদনা কাঠামোতে তাদের জন্য কোনো প্রত্যক্ষ সুবিধা নেই। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে স্বল্পসুদে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন, পেমেন্ট সিকিউরিটি, ঝুঁকি হ্রাস ও বিনিয়োগ সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বাজেটে নতুন কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।

সংগঠনটি সতর্ক করে বলেছে, বর্তমান এসআরও কাঠামো বহাল থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট পিক (এমডব্লিউপি) সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা অর্জন সম্ভব হবে না। তাদের মতে, এ অবস্থায় সর্বোচ্চ ২ থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট পিক সক্ষমতা অর্জিত হতে পারে।

বিএসআরইএ’র দাবি, বর্তমান এসআরও সংশোধন করে সকল আমদানিকারক, ইপিসি প্রতিষ্ঠান, ডিস্ট্রিবিউটর এবং সৌরবিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের জন্য শূন্য শতাংশ কাস্টমস ডিউটি ও কর সুবিধা নিশ্চিত করা হলে ঢাকা ও বিভাগীয় শহরগুলোর মাত্র ২৫ শতাংশ ছাদ ব্যবহার করেই ২০৩০ সালের মধ্যে ৬ থেকে ৮ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব।

সংবাদ সম্মেলনে বিএসআরইএ’র সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ, সিনিয়র সহ-সভাপতি জাহিদুল আলম, সহ-সভাপতি এম এ তাহের, সহ-সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মো. রুহুল আমিন, সাধারণ সম্পাদক মো. আতাউর রহমান সরকার রোজেল এবং পরিচালক (অর্থ) নিতাই পদ সাহাসহ সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights