নাক চেপে হাঁটতে হয় ফুটপাতে

ইমরান চৌধুরী
রাজধানীর পলাশী এলাকায় ফুটপাত পরিণত হয়েছে ময়লার ভাগাড়ে ছবিটি তুলেছেন জয়ীতা রায়

রাজধানীর ফুটপাত ও সড়ক এখন শুধু চলাচলের জায়গা নয়, হয়ে উঠছে এক ধরনের অদৃশ্য স্বাস্থ্যঝুঁকির ক্ষেত্র। নগরীর পরীবাগ পথচারী সেতুর নিচ দিয়ে হাঁটতে গেলেই প্রথম ধাক্কা লাগে নাকে। তীব্র, উৎকট প্রস্রাবের গন্ধ। কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে থাকলেই দেখা যায়-একজন রিকশাচালক এসে দাঁড়াচ্ছেন, একটু পরে আরেকজন। শুধু রিকশাচালকই নন, ভাসমান মানুষ-পথচারীর অনেকেই একই কায়দায় প্রস্রাব করছেন। সড়কের ওপাশেও একই দৃশ্য। মাস্ক পরেও এই গন্ধ এড়ানো যায় না। এতে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি।

এ চিত্র শুধু পরীবাগে সীমাবদ্ধ নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের রমনা কালী মন্দিরে প্রবেশ করার একটু আগেও একই চিত্র দেখা যায়। সুন্দর-ঝকঝকে ফুটপাতে রিকশাচালকদের লাইন থাকে শুধু প্রস্রাব করার জন্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, চাকরিজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষকে ওই রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে হয়। প্রস্রাবের কারণে ওই ফুটপাতের জায়গাটি প্রায় ভেজা থাকে।

এ ছাড়া নগরীর হাতিরপুল, মগবাজার, উত্তরা হাউস বিল্ডিংসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ফুটপাত এখন নিয়মিত প্রস্রাবের জায়গায় পরিণত হয়েছে। ব্যস্ত নগরী ঢাকায় কাজের প্রয়োজনে প্রতিদিন রাস্তায় থাকেন লাখো মানুষ। তাদের বড় একটি অংশ রিকশাচালক, সিএনজিচালিত অটোচালক, হকার, ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ী। দিনভর সড়কে ঘুরে বেড়ানো এই মানুষগুলোর প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্য টয়লেটের পরিমাণ কম। আয়ের বাহন রিকশা রেখে দূরে যাওয়ার ঝুঁকি নিতে চান না তারা। অনেক সময় টয়লেট থাকলেও যান না তারা। ফুটপাত, খোলা জায়গা কিংবা দেয়াল বেছে নিচ্ছে প্রস্রাবের স্থান হিসেবে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের গবেষণা বলছে, ২০১৯ সালে ঢাকায় রিকশা ছিল ১১ লাখ। তবে অনেকের মতে, ছয় বছরে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখের ওপরে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) তথ্যমতে, নিবন্ধিত রিকশা মাত্র ১ লাখ ৮২ হাজার ৬৩০টি। আর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) এ সংখ্যা মোটে ৩১ হাজার। নিবন্ধিত ২ লাখ ১৩ হাজার রিকশার সবই প্যাডেলচালিত। এর বাইরে রাজধানীতে সব রিকশাই অনিবন্ধিত। এসব রিকশা চালান অন্তত ১০-১২ লাখ চালক। এ বিপুল সংখ্যক মানুষের জন্য আলাদা কোনো প্রস্রাবের ব্যবস্থা নেই।

পরীবাগ এলাকায় পথচারী আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া বলেন, ‘এ এলাকায় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও সরকারি অফিস রয়েছে। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ এ রাস্তা দিয়ে হাঁটাচলা করে। আমাকেও অফিসে আসা-যাওয়া করতে এ রাস্তা ব্যবহার করতে হয়। প্রস্রাবের গন্ধে নাকে হাত দিয়ে হেঁটে যেতে হয়। তবু গন্ধ নাকে আসে। অনেক অস্বস্তি লাগে। দেয়ালে লেখা থাকে-এখানে প্রস্রাব করা নিষেধ। কিন্তু কেউ শোনে না।’

মগবাজারের বাসিন্দা আতিক ইসলামও একই অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, ‘এভাবে রাস্তার পাশে প্রস্রাব করা কোনোভাবেই উচিত নয়। একটু খালি জায়গা পেলেই সেখানে পথচারীরা প্রস্রাব করেন। একজনকে দেখলে আরেকজনও ওই জায়গায় প্রস্রাব করার সাহস পান। এটা যেমন অশোভন, তেমনই অস্বাস্থ্যকর। কিন্তু আমরা বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছি না, আর সমস্যা দিনদিন বাড়ছেই। সচেতনতা না বাড়ালে এটা কমানো সম্ভব নয়।’

এদিকে পরীবাগ, পল্টন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নিয়মিত প্রস্রাব করা ওসব স্থানের পরিবেশ মারাত্মক দূষিত। রাস্তার পিচ ও ফুটপাত নষ্ট হচ্ছে দ্রুত। আশপাশে থাকা গাছপালাও ক্ষতির মুখে পড়ছে। প্রস্রাবের ওপর হেঁটে যাওয়া সাধারণ মানুষও অজান্তে নিজের সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছে নানান রোগ। কয়েকজন রিকশাচালক জানান, রাস্তায় প্রস্রাব করা ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় নেই। মসজিদের টয়লেট বা পাবলিক টয়লেট ব্যবহার করলে রিকশা চুরি যাওয়ার ভয় থাকে। তবে স্বাস্থ্যঝুঁকির দিকটি আরও ভয়াবহ।

হেলথ অ্যান্ড হোপ হাসপাতালের চেয়ারম্যান ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘যত্রতত্র মলমূত্র ত্যাগ করা অসভ্যতার লক্ষণ। ঢাকার মতো শহরে যদি সভ্যতার মানদণ্ড ধরে রাখা না যায় তাহলে মানুষ কীভাবে টিকে থাকবে। যারা যত্রতত্র প্রস্রাব করেন তাদের অনেকেই বিভিন্ন রোগ বহন করেন। তাদের প্রস্রাবের মাধ্যমে সর্দি-কাশি, ডায়রিয়া থেকে শুরু করে টাইফয়েড-নিউমোনিয়া পর্যন্ত ছড়াতে পারে। দীর্ঘদিনের সংক্রমণে লিভার ও কিডনির রোগের ঝুঁকিও থাকে।’

তিনি বলেন, ‘ইনফেকটেড প্রস্রাবের কিছু উপাদান বাতাসে উড়ে যেতে পারে। সেটা খাবারে পড়তে পারে বা নিশ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে যেতে পারে। এতে ডায়রিয়া, শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণও হতে পারে। তা ছাড়া প্রস্রাবের মাধ্যমে যে তরল পদার্থ বের হয় সেটা মাটির ক্ষমতাকে ধ্বংস করে দেয়। ওই জায়গায় আর গাছপালা জন্মায় না। তাই এটা বন্ধ করতে না পারলে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিতে থাকবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights