নাক-মুখের ইশারায় চলে হুইল চেয়ার
মহিউদ্দিন মোল্লা, কুমিল্লা
প্রতিবেশী এক চাচা ডায়াবেটিস ও পায়ের পক্ষাঘাতের কারণে চলাচল করতে পারেন না। সেই ভাবনা থেকে নতুন কিছু উদ্ভাবনের চিন্তা মাথায় ঢুকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) সিএসই বিভাগের ১৪তম আবর্তনের শিক্ষার্থী শাকিরুল ভূঁইয়ার। শুধু ভাবনার মধ্যে সীমিত না থেকে সত্যি সত্যিই পক্ষাঘাতগ্রস্ত ব্যক্তিদের জন্য নতুন কিছু বানিয়ে বসলেন শাকিরুল। হাতের শক্তি ব্যবহার করতে অক্ষম ব্যক্তিদের চলাচল সহজ করতে নাক ও মুখের ইশারায় নিয়ন্ত্রণযোগ্য এক ধরনের স্মার্ট হুইলচেয়ার তৈরি করলেন তিনি। এ বিষয়ে শাকিরুল জানান, বিশেষ করে যারা পক্ষাঘাতগ্রস্ত এবং হাত দিয়ে হুইলচেয়ার চালানোর সক্ষমতা নেই- এমন ব্যক্তিদের কথা বিবেচনা করেই তৈরি করা হয়েছে এই স্মার্ট হুইলচেয়ার। এতে হাতের পরিবর্তে মুখ ও নাকের নড়াচড়ার মাধ্যমে চলবে এটি।
হুইলচেয়ারটি পরিচালনার জন্য পাইথন প্রোগ্রামিং ভাষায় তৈরি সফটওয়্যারটি ল্যাপটপের ওয়েবক্যামের সাহায্যে ব্যবহারকারীর মুখ শনাক্ত করে। মুখ হা করলেই সক্রিয় হয় সিস্টেমটি। এরপর স্ক্রিনে নাকের চারপাশে একটি আয়তাকার বক্স তৈরি হয়। নাক ওপরে নিলে হুইলচেয়ারটি সামনে, নিচে নিলে পেছনে এবং ডানে-বামে সরালে সংশ্লিষ্ট দিকে চলে। আর নাক বক্সের ভিতরে রাখলে হুইলচেয়ারটি থেমে যায়। প্রযুক্তিটির কার্যপদ্ধতি ব্যাখ্যা করে শাকিরুল বলেন, ‘আমরা এমনভাবে প্রোগ্রামটি তৈরি করেছি, যাতে ব্যবহারকারী হাতের কোনো শক্তি ছাড়াই শুধু নাকের ইশারায় হুইলচেয়ার চালাতে পারেন। মুখ হা করলে সিস্টেমটি অ্যাকটিভ হয়। এরপর নাকের অবস্থান পরিবর্তনের মাধ্যমে হুইলচেয়ারটি নিয়ন্ত্রণ করা যায়।’
স্মার্ট হুইলচেয়ারটির কার্যকারিতা শুধু চলাচলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এতে যুক্ত করা হয়েছে স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণব্যবস্থা, যার মাধ্যমে ব্যবহারকারীর হার্ট রেট, পালস রেট ও শরীরের তাপমাত্রা পরিমাপ করা যায়। শাকিরুল বলেন, ‘অনেক সময় ব্যবহারকারী হঠাৎ মাথা ঘোরাতে পারেন কিংবা কারও সঙ্গে কথা বলতে পারেন। তখন নাকের পয়েন্ট সেফটি বাউন্ডারির বাইরে চলে গেলে চেয়ারটি অটোমেটিক থেমে যাবে। একই সঙ্গে চারপাশের ছয়টি সেন্সর কোনো প্রতিবন্ধকতা ২০ সেন্টিমিটারের মধ্যে পেলেও হুইলচেয়ারটি থামিয়ে দেবে।’
এদিকে ডিভাইসটির উন্নয়নকাজের প্রতিবন্ধকতার বিষয়ে কুবির এই শিক্ষার্থী বলেন, ‘পর্যাপ্ত ল্যাব স্পেসের অভাবে সুপারভাইজারের ব্যক্তিগত কক্ষেই গবেষণা চালাতে হচ্ছে। প্রয়োজনীয় সরঞ্জামসহ পৃথক ল্যাব এবং দ্রুত অর্থ ছাড়ের ব্যবস্থা করা গেলে গবেষণার গতি বাড়বে। সেই সঙ্গে নতুনরাও গবেষণায় উৎসাহিত হবে।’ গবেষণা প্রকল্পের সুপারভাইজার ও প্রকৌশল অনুষদের ডিন বিভাগীয় প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ড. মাহমুদুল হাছান বলেন, ‘কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ‘ইন্টারেক্টিভ সিস্টেমস অ্যান্ড কম্পিউটার ভিশন’ ল্যাব থেকে ২০২৩ সালে আমাদের এই গবেষণার যাত্রা শুরু হয়। বিভাগের এক সাবেক শিক্ষার্থী প্রথমে খেলনা গাড়িতে প্রযুক্তিটির প্রোটোটাইপ তৈরি করেন। পরবর্তীতে বর্তমান শিক্ষার্থী শাকিরুল এটি বাস্তব হুইলচেয়ারে সফলভাবে প্রয়োগ করেন।’
