নারী ইস্যুতে প্রশ্নের মুখে জামায়াতের নৈতিক অবস্থান
বিশেষ প্রতিনিধি
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী অনেক দিন ধরেই নিজেদেরকে দেশের প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর একটি নৈতিক বিকল্প হিসেবে তুলে ধরছে। দলটি বলে আসছে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি হলে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা হবে, জবাবদিহি বাড়বে এবং রাজনীতিতে নৈতিকতার মানও উন্নত হবে। এখন সেই দাবির প্রথম বড় পরীক্ষা শুরু হয়েছে।
সম্প্রতি নৈতিক অসদাচরণের অভিযোগে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। এরপর তার বিরুদ্ধে নিজের কর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগও সামনে আসে। এসব ঘটনায় জামায়াতকে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে। তীব্র জনসমালোচনা এবং গণমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হওয়ার পর দলটি ওই সংসদ সদস্যকে বহিষ্কার করে। তবে এই ঘটনা একটি বড় প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে। কোনো দল যদি নিজেদের অন্যদের চেয়ে বেশি নৈতিক বলে দাবি করে তাহলে তাদের দলীয় ব্যবস্থাও কি এমন হওয়া উচিত নয়, যাতে শুরুতেই এ ধরনের ঘটনা ঠেকানো যায়? কারণ, ক্ষমতা মানুষের চরিত্র তৈরি করে না। বরং মানুষের আসল চরিত্র প্রকাশ করে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো নারীদের বিষয়ে দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের অবস্থান। জামায়াতের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ প্রকাশ্যে বলেছেন ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী কোনো নারী তাদের দলের নেতৃত্ব দিতে পারে না। এছাড়া সরাসরি নির্বাচিত সংসদীয় আসনগুলোতে জামায়াত কোনো নারী প্রার্থীও দেয়নি। এসব অবস্থান থেকেই বোঝা যায় রাজনৈতিক নেতৃত্বে নারীদের ভূমিকা সম্পর্কে দলটির দৃষ্টিভঙ্গি কী। এই বিতর্ক আরও বেড়ে যায় যখন বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর উঠে আসে যে জামায়াতের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ মাতৃত্বকালীন ছুটির পর নারীদের কর্মঘণ্টা কমানোর এবং মায়েদের ঘরে থাকতে আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার কথা বলেছেন। অবশ্য পরে তারা বলেন, তাদের সেসময় মন্তব্য ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
এটি নিয়ে বিতর্ক থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট। জামায়াতের জ্যেষ্ঠ নেতারা বারবার এমন একটি সমাজব্যবস্থার কথা বলেছেন, যেখানে নারীর প্রধান ভূমিকা ঘর-সংসার ও পারিবারিক দায়িত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ। জনজীবন ও নেতৃত্বে নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণের বিষয়টি সেখানে গুরুত্ব পায় না। এই দৃষ্টিভঙ্গি আজকের বাংলাদেশের বাস্তবতা এবং নারী ও তরুণদের স্বপ্নের সঙ্গে অনেকটাই অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নারীরা কোনো গৌণ ভূমিকা পালন করেন না। বরং তারা এই অর্থনীতির অন্যতম প্রধান শক্তি। তৈরি পোশাক শিল্প, যা দেশের রপ্তানি খাতকে বদলে দিয়েছে, সেখানে নারীদের অবদান সবচেয়ে বেশি। এ ছাড়া ব্যাংকিং, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কৃষি, উদ্যোক্তা খাত এবং সরকারি প্রশাসনেও নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। প্রতিদিন তাদের কাজ দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছে। তাই নারীদের সুযোগ সীমিত করা পারিবারিক মূল্যবোধ রক্ষার উপায় নয়। বরং এতে বাংলাদেশের উন্নয়নের সবচেয়ে বড় অর্জনগুলোর একটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ইতিহাস এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। আদর্শের নামে যেসব সমাজ পরিকল্পিতভাবে নারীদের অধিকার সীমিত করেছে, তাদের বেশির ভাগই উন্নতি করতে পারেনি। তালেবান শাসিত আফগানিস্তান এর সবচেয়ে উৎকৃষ্ট উদাহরণ। সেখানে নারীদের শিক্ষা, চাকরি এবং জনজীবন থেকে দূরে রাখা হয়েছে। এর ফলে শুধু বিশ্বজুড়ে সমালোচনাই হয়নি, দেশটির অর্থনীতি আরও দুর্বল হয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দারিদ্র্য বেড়েছে। বাংলাদেশ যদিও সেই অবস্থায় নেই। তবে ইতিহাসের শিক্ষা স্পষ্ট। যখন কোনো রাজনৈতিক শক্তি নারীদের সুযোগ ও স্বাধীনতা বাড়ানোর বদলে তা সীমিত করতে চায়, তখন গণতন্ত্র ও উন্নয়ন-দু’টিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তরুণ প্রজন্মই এখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ গড়ে দিচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের রাজনীতিতে পরিবর্তন আনা তরুণরা প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত, বিশ্বের খবর সম্পর্কে সচেতন এবং রাজনৈতিক দ্বিচারিতা নিয়ে খুবই সন্দিহান। তারা শুধু নৈতিকতার দাবি শুনতে চায় না। তারা চায় স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান, সবার জন্য সমান সুযোগ এবং জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব। কোন রাজনৈতিক দল কী বলছে, তার চেয়ে তারা বেশি গুরুত্ব দেয় সেই দল বাস্তবে কী করছে এবং কী ধরনের নীতি অনুসরণ করছে।
যে রাজনীতি দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে নেতৃত্বের জন্য অযোগ্য বলে মনে করে, সেই রাজনীতি আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছে সহজে গ্রহণযোগ্য হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ, এই প্রজন্ম সমান অধিকারকে কোনো দয়া বা বিশেষ সুবিধা হিসেবে দেখে না। তারা এটিকে গণতন্ত্রের একটি মৌলিক নীতি বলে মনে করে। শেষ পর্যন্ত এটিই জামায়াতের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
শুধু ধর্মীয় প্রতীক ব্যবহার বা নিজেদের অন্যদের চেয়ে বেশি নৈতিক বলে দাবি করলেই নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা পাওয়া যায় না। এর প্রমাণ দিতে হয় কাজের মাধ্যমে। সে জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান, সবার জন্য একইভাবে জবাবদিহি এবং প্রতিটি নাগরিকের প্রতি সমান সম্মান।
জামায়াত যদি সত্যিই নিজেদের অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর চেয়ে আলাদা প্রমাণ করতে চায়, তাহলে শুধু কোনো কেলেঙ্কারির পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে দল থেকে বহিষ্কার করলেই হবে না। দলটিকে নিজেদের রাজনীতির ভেতরের বড় বড় অসঙ্গতিগুলোরও মুখোমুখি হতে হবে। যেমন, একদিকে নৈতিকতার কথা বলা, অন্যদিকে অসদাচরণ ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়া। আবার একদিকে ন্যায়ের কথা বলা, অন্যদিকে নেতৃত্বে নারীদের সমান সুযোগ না দেওয়া।
বাংলাদেশের মানুষ নৈতিক রাজনীতির অনেক প্রতিশ্রুতি শুনেছে। এখন তারা প্রতিশ্রুতি নয়, তার বাস্তব প্রমাণ দেখতে চায়।
