নিভে গেল ক্রীড়াঙ্গনের বাতিঘর

মনোয়ার হক
সবাইকে ডাকলেন স্থানীয় এক হোটেলে। জানলেন সমস্যা, সব শুনে সাদেক বললেন, ‘তোমরা মাঠে যাও, সব ঠিক হয়ে যাবে। আমার ওপর আস্থা রাখো।’ উনার কথা কেউ কি ফেলতে পারেন। ক্লাবগুলো খেলায় ফিরল এবং সমস্যার সমাধান করে দিলেন আবদুস সাদেক

বাংলাদেশের খেলাধুলার ইতিহাস অনেকের কাছেই অজানা। বর্তমান প্রজন্ম তো ইতিহাসের মানে বোঝে হাতেগোনা সাফল্য। সোনালি ইতিহাস জানবেই বা কীভাবে! যাঁরা বাংলাদেশের খেলাধুলার পেছনে খেলোয়াড় বা সংগঠক হিসেবে বড় ভূমিকা রেখেছেন তাঁদের গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে কতটুকু? বিভিন্ন মিডিয়ায় তাঁদের ক্যারিশমা নিয়ে লেখালেখি হলেও তা কি যথেষ্ট ছিল? যোগ্য অভিভাবকদের তো চেনাতে হবে। যাদের এ দায়িত্ব ছিল তারা বরাবরই পাশ কাটিয়ে গেছেন। গুরুত্ব দেওয়া হলে ক্রীড়াঙ্গনের আজ এ বেহাল দশা হতো না। তাই ইচ্ছা ছিল কিংবদতন্তিদের একসঙ্গে করে সুন্দর এক আড্ডার আয়োজন করা এবং তা লেখনীর মাধ্যমে তুলে ধরা।

স্বপ্ন ছিল আবদুস সাদেক, বশির আহমেদ, জাকারিয়া পিন্টু, প্রতাপ শংকর হাজরা ও গোলাম সারোয়ার টিপু-এমন সুপরিচিত খেলোয়াড় বা সংগঠকদের নিয়ে বাংলাদেশ প্রতিদিন এক ফ্রেমে বন্দি করে প্রতিবেদন তৈরি করবে। জাকারিয়া পিন্টু না ফেরার দেশে চলে যাওয়ার পর বড় একটা ধাক্কা খেলেও পরিকল্পনা ছিল সাদেক, প্রতাপ ও টিপুকে একত্র করে আড্ডার আয়োজন করা। সবাই কথাও দিয়েছিলেন সময় খুঁজে বের করে বসবেন। টিপু বলেছিলেন, ‘সাদেক ভাই ছাড়া তোমার আয়োজন বৃথা যাবে। উনি একমাত্র খেলোয়াড়, ফুটবল ও হকিতে সমানভাবে আলো ছড়িয়েছেন। সংগঠক হিসেবেও খ্যাতি পেয়েছেন।’ প্রতাপেরও একই কথা-‘সাদেকের সঙ্গে যোগাযোগ কর, আমাকে ডাকলে পাবে।’ সাদেক ভাইয়ের সঙ্গে মুঠোফোন এবং ওল্ড ডিওএইচএসে তাঁর বাসায় গিয়ে কথাটা বলি। আবদুস সাদেক প্রস্তাবটা শুনে খুব খুশিই হলেন, ‘বললেন, ওদের সঙ্গে প্রায়ই টেলিফোনে কথা হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন দেখা নেই। তুমি যা করতে যাচ্ছ, অবশ্যই সুন্দর। তিনি ‘তবে’ বলার পর মনে ধাক্কা খেলাম। তাহলে কি সাদেক ভাই এক ফ্রেমে বন্দি হবেন না?

এরপর সাদেক ভাই বললেন, ‘প্রতাপদা আর আমি একসঙ্গে আবাহনী ছাড়াও অন্য দলে হকি খেলেছি। টিপু ছিল আবাহনীর ফুটবল দলে আমার সতীর্থ। মজার ব্যাপার, দুজনার ক্যাপ্টেন ছিলাম আমি। ফুটবলে টিপু আর হকিতে প্রতাপদা। দুটোই আবার আবাহনীতে। কত সুখ-দুঃখের স্মৃতি তাঁদের সঙ্গে মিশে আছে। আমাদের একসঙ্গে বসিয়ে ছবি তুলবে আর পত্রিকায় লিখবে। এ লোভ কি সামলানোর মতো! তবে একটু সময় দাও শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। অপেক্ষা করো ঠিকই আমাকে পাবে।’

না, পাওয়া গেল না সাদেক ভাইকে। আর কখনো তাঁকে পাওয়া যাবে না। দেখলেই বলতেন-‘কীরে ভালো আছিস তো।’ দরদমাখা এই কুশল জিজ্ঞাসার লোকটি গতকাল আমাদের ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন। নিভে গেল দীর্ঘ সময় জ্বলে থাকা ক্রীড়াঙ্গনের বাতিঘর।

আবদুস সাদেক ছিলেন সেই ব্যক্তি যিনি জনপ্রিয় ঢাকা আবাহনীর ফুটবল ও হকির প্রথম অধিনায়ক। এ এক বিশাল প্রাপ্তি। বাংলাদেশ জাতীয় হকি দলের প্রথম অধিনায়ক ছিলেন তিনিই। কোচও ছিলেন জাতীয় হকি দলের। আবার তাঁরই প্রশিক্ষণে আবাহনী ফুটবল ও হকি লিগে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। ১৯৭৭ সালে ঘরোয়া ফুটবলে আবাহনীই প্রথম অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়। সেই দলের কোচ-কাম খেলোয়াড় ছিলেন আবদুস সাদেক। ফুটবল ও হকি খেলেছেন বলে এটাই তাঁর বড় পরিচয়, তা কিন্তু নয়। ক্রীড়াঙ্গনজুড়েই ছিল তাঁর বিচরণ। ১৯৭৫ সালে আবাহনীর বড্ড দুর্দিন নেমে এসেছিল। ক্লাবটি টিকে থাকবে কি না, এমন অবস্থায় তিনিই সাহসিকতার সঙ্গে হাল ধরেছিলেন। অন্যরা যখন গোপনে সরে যান, তখন আবদুস সাদেকই আবাহনীকে টিকিয়ে রাখতে ঝুঁকি নেন।

যে আবাহনী আজ দেশসেরা। হকি, ফুটবল বা ক্রিকেট সব ক্ষেত্রেই সাফল্যের দিক দিয়ে সেই ক্লাবটি এগিয়ে। এই তো বছর দশেক আগে হকিতে যখন চরম অব্যবস্থাপনা। ক্লাবগুলো লিগ খেলবে না বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিল, তখন সমস্যা সমাধানে এগিয়ে এলেন আবদুস সাদেক।

সবাইকে ডাকলেন স্থানীয় এক হোটেলে। জানলেন সমস্যা, সব শুনে সাদেক বললেন, ‘তোমরা মাঠে যাও, সব ঠিক হয়ে যাবে। আমার ওপর আস্থা রাখো।’ উনার কথা কেউ কি ফেলতে পারেন। ক্লাবগুলো খেলায় ফিরল এবং সমস্যার সমাধান করে দিলেন আবদুস সাদেক। তিনবার তিনি ছিলেন হকি ফেডারেশনের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক। সিনিয়র সহসভাপতি পদেও ছিলেন।

কাউকে যদি হকিকে জনপ্রিয় ও উন্নয়ন ঘটানোর কারিগর বলা হয় তাহলে প্রথম নামটি আসে আবদুস সাদেকের। আশির দশকে এশিয়ান কাপ হকি মানে তো ছিল বিশ্বকাপ হকির সমান। এ আসর বাংলাদেশে হবে তা স্বপ্নেও কেউ ভাবেননি। অথচ তাঁরই সাংগঠনিক দক্ষতায় ১৯৮৫ সালে ঢাকায় এশিয়া কাপ হকির আয়োজন করা হয়। মালয়েশিয়ায় এশিয়ান হকি ফেডারেশনের সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বাংলাদেশ হকি ফেডারেশনের প্রতিনিধি হিসেবে সভায় উপস্থিত ছিলেন আবদুস সাদেক। সভায় প্রধান এজেন্ডা ছিল ১৯৮৫ সালের এশিয়ান কাপ হকির ভেন্যু নির্ধারণ। সভায় পাকিস্তান, ভারত, জাপান ও মালয়েশিয়া নিজ নিজ দেশে আয়োজনের আগ্রহ দেখায়। আবদুস সাদেক ঢাকার নাম প্রস্তাব করলেন। বললেন, ‘বাংলাদেশের ওপর আস্থা রাখুন। দেখবেন ইতিহাসের সেরা আয়োজন করব।’

এরপর আর কেউ না করতে পারেননি। আবদুস সাদেকের প্রস্তাবে রাজি হয়ে যান সবাই। শেষ পর্যন্ত এমন এক এশিয়া কাপ আয়োজন হলো যা এখন পর্যন্ত সবার সেরা।

আবদুস সাদেক যা বলতেন তা করে দেখাতেন। তাই তাঁকে বলা হয় ক্রীড়াঙ্গনের বাতিঘর। বাঙালি খেলোয়াড়রা যাতে পাকিস্তান জাতীয় দলে না খেলতে পারে কতই না ষড়যন্ত্রের জাল বোনা হয়েছিল। কিন্তু সাদেকের যোগ্যতার কাছে ষড়যন্ত্রকারীরা হার মেনেছে। ঠিকই পাকিস্তান জাতীয় দলে খেলে প্রমাণ করেছেন বাঙালিরাও পারে। ষাটের দশকের শেষের দিকে পাকিস্তান যখন ইউরোপ সফরে ২০টি ম্যাচ খেলে, তখন রাইট হাফ পজিশনে সাদেক খেলেন আট ম্যাচ। শুধু তিনি নন, তাঁর ছোট ভাই বর্তমানে বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহানও ছিলেন হকির তুখোর খেলোয়াড়। পূর্ব পাকিস্তান যুবদলকে নেতৃত্বও দিয়েছিলেন আহমেদ আকবর সোবহান। তাঁদের বাবা অ্যাডভোকেট আবদুস সোবহান ব্রিটিশ আমলে ছিলেন চ্যাম্পিয়ন সাঁতারু। ক্রীড়া পরিবার থেকে বেড়ে ওঠা আবদুস সাদেক হয়ে ওঠেন কিংবদন্তি খেলোয়াড়।

বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে সবাই যখন উন্মাদনায় ব্যস্ত, তখনই এলো এ শোকের খবর। এ তো শুধু শোক নয়, ক্রীড়াঙ্গনের বাতিঘরই নিভে যাওয়া।

ক্রীড়াঙ্গনে একজন অভিভাবক হারালাম। যা আর ফিরে পাবে না দেশ। আবদুস সাদেক শুধু দিয়েই গেছেন। বিনিময়ে জাতি তাঁকে কী দিতে পেরেছে? শুধুই কিছু পুরস্কার। পুরস্কার দিয়ে কি রত্ন চেনা যায়? আমরা চিনিনি। ঠিকই চিনেছিলেন আন্তর্জাতিক হকি ফেডারেশনের সভাপতি আন্দ্রে নেগ্রে। ২০১৭ সালে নেগ্রে ঢাকা এসেছিলেন। এক অনুষ্ঠানে তিনি আবদুস সাদেককে কাছে পেয়ে খুশিতে রীতিমতো চিৎকার দিয়ে উঠেছিলেন। বললেন, ‘কতদিন পর বন্ধুর দেখা পেলাম’। এরপর মাইক হাতে নিয়ে বললেন, ‘যে দেশে সাদেকের মতো এক্সপার্ট আছে সেখানে বাংলাদেশের হকির এই আবস্থা কেন? সাদেকের বুদ্ধি কাজে লাগাও, ঠিকই এগিয়ে যাবে।’ আমরা কি তাঁর বুদ্ধি কাজে লাগাতে পেরেছি। দেওয়া হয়েছে কি তাঁর কাজের সম্মান। না, আমরা তাঁকে সম্মান জানাতে পারিরি। আর দিতে পারিনি বেলেই তো হকিতে এত হাহাকার।

১৯৭২ সালে আবাহনীতে তারকা ফুটবলারের অভাব ছিল না। সে ক্ষেত্রে আবদুস সাদেককে অধিনায়ক হিসেবে বেছে নেওয়া হলো কেন? বড় দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো সব গুণাবলি ছিল বলেই তো তাঁর নেতৃত্বেই মাঠে আবাহনীর অভিষেক হয়েছিল। হকিতে ছিল ইব্রাহিম সাবের, আবদুর রাজ্জাক সোনা মিয়া, সাব্বির ইউসুফ ও প্রতাপ শংকর হাজরার মতো খেলোয়াড়। তার পরও যাঁকে নেতা মানা যায় সেই আবদুস সাদেকের হাতে উঠেছিল ক্যাপ্টেনের আর্ম ব্যান্ড। তিনিই হয়ে ওঠেন ক্রীড়াঙ্গনের বটগাছ। নিভে গেল সেই বাতিঘর। এখন কে জ্বালিয়ে রাখবে সেই বাতিঘর। আফসোস, একসঙ্গে ক্যামেরায় বন্দি করা গেল না তাঁদের। তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights