নির্ধারিত ভাড়া মানছে না কেউ

সুদীপ্ত দাস

গতকাল বিকাল ৪টায় ফার্মগেট থেকে বাসে উঠে ভাড়া নিয়ে বাগ্বিতণ্ডায় খিলক্ষেতে নেমে যান উত্তরার বাসিন্দা ফাহিম ইসলাম। নির্ধারিত দূরত্ব বা কিলোমিটার অনুযায়ী ফার্মগেট থেকে উত্তরার ভাড়া ৩০ টাকা হলেও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার অজুহাত দেখিয়ে হেলপার ৪০ টাকা চান। ফাহিম ৫ টাকা বাড়িয়ে ৩৫ টাকা দিতে চাইলে হেলপার তা নিতে রাজি হননি। ‘সরকারের ওপর দোষ চাপিয়ে’ যাত্রীদের কাছ থেকেই বাড়তি ভাড়া আদায় করতে থাকেন। যাত্রীরা দিতে রাজি না হলে তাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন। এ নিয়ে হেলপারের সঙ্গে কথাকাটাকাটি করে ফাহিম খিলক্ষেতে বাস থেকে নেমে যান। এ বিষয়ে ফাহিম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, গণপরিবহনগুলোতে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার কোনো তোয়াক্কা করা হচ্ছে না। কয়েকজন যাত্রী নতুন ভাড়ার তালিকা দেখতে চাইলে হেলপার তা দেখাতে ব্যর্থ হন। মালিক পক্ষ এখনো নতুন ভাড়ার চার্ট বা তালিকা দেয়নি এই অজুহাত দেখিয়ে হেলপার চম্পট দেন।

যাত্রীদের অভিযোগ, বাসে সঠিক ভাড়ার তালিকা টাঙানো না থাকার সুযোগ নিয়ে অপারেটররা নিজেদের ইচ্ছামতো বাড়তি ভাড়া আদায় করছেন। এতে প্রতিদিনের যাতায়াতে বিভ্রান্তি ও চরম বিপাকে পড়তে হচ্ছে তাদের। গণপরিবহনে হুট করে এভাবে ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় যাতায়াত খরচের পাশাপাশি জীবনযাত্রার অন্যান্য খরচও বেড়ে গেছে। গতকাল রাজধানীর ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার, উত্তরা, খিলক্ষেত, বাড্ডা, নতুন বাজার, বনানী, মহাখালী, শাহবাগ, তেজগাঁও, গুলিস্তান ও মিরপুরের বিভিন্ন এলাকা সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, সরকারি সিদ্ধান্তের তোয়াক্কা না করেই বিভিন্ন বাস ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া আদায় করছে। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি বাস ও মিনিবাসের দৃশ্যমান স্থানে নতুন ভাড়ার তালিকা টাঙানো বাধ্যতামূলক করা হলেও এসব এলাকার কোনো বাসেই ভাড়ার চার্ট দেখা যায়নি। এতে যাত্রী ও পরিবহনকর্মীদের মধ্যে তীব্র বাগ্বিতণ্ডা ও অনাকাক্সিক্ষত হাতাহাতির ঘটনা ঘটছে। এ চিত্র শুধু ঢাকায় নয়, ঢাকা থেকে দূরপাল্লার পরিবহনেও সরকারি তালিকার চেয়ে অনেক বেশি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। জানা যায়, গত সোমবার রাতে জ¦ালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ঘোষণার পর থেকে রাজধানীর বিভিন্ন রুটে বাড়তি ভাড়া নেওয়া শুরু করেন বাস অপারেটররা। মহাখালী থেকে বিজয় সরণি পর্যন্ত ১০ টাকার পরিবর্তে ১৫ টাকা, গুলিস্তান থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত ভাড়া ৬০ টাকা হলেও যাত্রীদের থেকে থেকে ৮০-৯০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া হাঁকাচ্ছেন। সরকার নির্ধারিত ভাড়া শুধু ডিজেলচালিত বাস ও মিনিবাসের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলেও সিএনজিচালিত অনেক বাসও তেলের দাম বাড়ার অজুহাতে যাত্রীদের থেকে বাড়তি ভাড়া নিচ্ছেন। সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর গণপরিবহনের ভাড়াও সমন্বয় করেছে। তবে ভাড়া পুনর্নির্ধারণ করা হলেও এখনো বাসে নতুন ভাড়ার চার্ট না থাকায় পরিবহনকর্মীরা যাত্রীদের কাছ থেকে ইচ্ছামতো বাড়তি ভাড়া আদায় করছে। এ সংক্রান্ত নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরীতে বাসের সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা এবং মিনিবাসের সর্বনিম্ন ভাড়া ৮ টাকা। প্রতিনিয়ত যাতায়াতে বাস ব্যবহার করা যাত্রীদের অভিযোগ, বাসে ভাড়ার তালিকা না থাকায় প্রকৃত ভাড়া কত তা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই বাধ্য হয়েই বাড়তি ভাড়া দিতে হচ্ছে। গতকাল রাজধানীর আসাদগেট থেকে বাসে করে অফিসের উদ্দেশ্যে যমুনা ফিউচার পার্কে নামেন ধানমন্ডির বাসিন্দা মাহবুব আলম। তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘প্রতিনিয়ত ৩০ টাকা দিয়েই আসি। গত সোমবার রাতে যাওয়ার সময় বাড়তি ৫ টাকা বেশি দিতে হয়েছে। কিন্তু আজ আসার সময় ১০ টাকা বাড়িয়ে ৪০ টাকা দিতে হয়েছে।’

বাসের পর বাড়ল লঞ্চভাড়া বাড়ছে না ট্রেনের : জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় বাসের পর লঞ্চভাড়া বাড়িয়েছে সরকার। তবে ট্রেনের ভাড়া বাড়ছে না। গতকাল নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে নৌযান মালিক সমিতি ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান রেলপথ, সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।

তিনি বলেন, ‘প্রতি কিলোমিটারে লঞ্চের ভাড়া ২৩ পয়সা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। আর ১০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে প্রতি কিলোমিটারের ভাড়া ২০ পয়সা করে বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে নৌপথে যাতায়াতে সর্বনিম্ন ভাড়া ৩২ থেকে বাড়িয়ে ৩৫ টাকা করা হচ্ছে।’

রবিবার রাতে জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়িয়েছে সরকার। এরপর মঙ্গলবার বাসভাড়া কিলোমিটারে ১৭ পয়সা বাড়ানো হয় এবং গতকাল বাসভাড়া বাড়ানোর প্রজ্ঞাপন জারি করে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ।

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে চলাচলকারী বাসের প্রতি কিলোমিটারের ভাড়া ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৭০ পয়সা করা হয়েছে। আন্তজেলা ও দূরপাল্লার রুটে চলাচলকারী বাস ও মিনিবাসের ভাড়া ২ টাকা ২৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৪০ পয়সা করা হয়েছে। এ ছাড়া ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে চলাচলকারী মিনিবাস এবং ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) আওতাধীন ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, নরসিংদী, গাজীপুর ও মানিকগঞ্জ জেলায় চলাচলকারী বাস-মিনিবাসের ভাড়া ২ টাকা ৪৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৬০ পয়সা করা হয়েছে। আগের মতোই ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে বাসের সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ এবং মিনিবাসের সর্বনিম্ন ভাড়া ৮ টাকা বহাল রাখা হয়েছে। পাঁচ মাস আগে এপ্রিলে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছিল ১৫ টাকা। তখন বাসভাড়া বেড়েছিল কিলোমিটারে ১১ পয়সা। বেড়েছিল ট্রাকভাড়াও।

বাসের পর গতকাল লঞ্চভাড়াও বাড়ানোর ঘোষণা এলো। লঞ্চভাড়া বাড়ানো নিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম ১৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ বেড়েছে। এর ফলে নৌযান পরিচালনার ব্যয় বেড়েছে। নৌযানের ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং ডলারের দাম বাড়ার কারণে যন্ত্রাংশের দামও বেড়েছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে নৌযানমালিকরা ভাড়া বাড়ানোর দাবি জানিয়েছিলেন। মালিকদের পক্ষ থেকে প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ভাড়া বাড়ানোর দাবি ছিল। যাত্রীদের সক্ষমতা ও জনস্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে ভাড়া বাড়ানোর হার সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।’

জ্বালানির দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নৌযানের ভাড়া বাড়ানো জনজীবনে চাপ তৈরি করবে এ কথা স্বীকার করে মন্ত্রী বলেন, ‘ভাড়া বাড়ানো কখনোই কাম্য নয়। তবে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে যখন ভাড়া বাড়ানো অবধারিত হয়ে যায়, তখন যাত্রীদের ওপর যাতে কম চাপ পড়ে, সে বিষয়টি বিবেচনা করা হয়েছে।’ রেল নিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও এখন পর্যন্ত ট্রেনের ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে ভাড়া না বাড়ালে রেলের লোকসান আরও বাড়বে বলে মন্ত্রণালয় থেকে চাপ রয়েছে।’

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শেখ রবিউল আলম বলেন, ‘গতবার যখন ১৫ টাকা বেড়েছিল ডিজেলের দাম, তখন আমরা ট্রেনের ভাড়া বাড়াইনি। এবার আবার ২০ টাকা যখন বেড়েছে জ্বালানির দাম, ট্রেনের ভাড়া বৃদ্ধির চাপ আছে রেল মন্ত্রণালয় থেকে। রেলে তো আমরা লোকসান করি। জ্বালানির দাম যা বেড়েছে, আর এর সঙ্গে যদি ভাড়া না বাড়াই, আমরা ১০ বছর ট্রেনে ভাড়া বাড়াইনি। তার জন্য কি কেউ ধন্যবাদ দিয়েছেন? ১০ বছর ভাড়া বাড়াইনি। আবার গতবার তেলের দাম বেড়েছে, বাড়াইনি। তার মানে কী হচ্ছে, জনগণের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতাও যেমন আছে, মনোযোগটাও আছে।’ মন্ত্রী বলেন, ‘এবার ট্রেনের ভাড়া বাড়ানোর খুব চাপ রয়েছে। তা না হলে লোকসান আরও বাড়বে। তার পরও এখনো ভাড়া বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। আমরা চাইব যে ভাড়াটা যাতে না বাড়িয়ে অ্যাডজাস্ট রাখা যায়। এটা এখন পর্যন্ত উদ্যোগ নেওয়া হয়নি, ওই ভাড়া থাকছে। দেখা যাক, আর কিছুদিন অপেক্ষা করি, চাপটা কেমন হয়।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights