নীতিকথাগুলো ফিরে আসুক

ইমদাদুল হক মিলন

শৈশবে দুটি বই আমাদের পড়তে হয়েছে। একটি ‘আদর্শ লিপি’, অন্যটি ‘বাল্যশিক্ষা’। ‘আদর্শ লিপি’র কথা আমার খুব মনে আছে। কারণ এই বইটির জন্য নানির হাতে দু-চারবার বেতের বাড়ি খেয়েছি। বইটির প্রচ্ছদে লেখা থাকত ‘আদর্শ লিপি ও সরল বর্ণ পরিচয়’। নিচের দিকে লেখা ‘সীতানাথ বসাক প্রণীত’।

কয়েক দিন আগে কৌতূহল হলো ‘আদর্শ লিপি’ একটু ঘেঁটে দেখি। বই সংগ্রহ করা হলো। মলাটের ওপর দিকের এক পাশে লেখা ‘আদি’, অন্য পাশে লেখা ‘আসল’। অর্থাৎ এই আদর্শ লিপিটি সীতানাথ বসাক প্রণীত ‘আদি ও আসল আদর্শ লিপি’। বইটি এককথায় অসাধারণ। এই একটি বই বাংলা অক্ষর জ্ঞান ও প্রাথমিক শিক্ষার জন্য যথেষ্ট। প্রতিটি বর্ণের সঙ্গে একটি করে নীতিকথা আছে। আমি আসলে নীতিকথাগুলোর জন্যই বইটি সংগ্রহ করেছিলাম। সেই ছেলেবেলায় মুখস্থ করা কোনো কোনো নীতিকথা বেশ মনে আছে।

যেমন, অ—‘অসৎ সঙ্গ ত্যাগ কর’। আ—‘আলস্য দোষের আকর’। এখনকার বইটিতে দেখছি, আ—এর সঙ্গে নীতিকথা লেখা আছে, ‘আলস্য দারিদ্র্যের লক্ষণ’। কথাটি মন্দ না। বোধহয় এ রকম টুকটাক বদল আরো করা হয়েছে। এই ভেবে পুরো বইটি আমি খুবই মনোযোগ দিয়ে ঘেঁটে ঘেঁটে দেখলাম। হ্যাঁ, রদবদল অনেক ক্ষেত্রেই করা হয়েছে। তাতে অবশ্য কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু যে বইয়ের মলাটে আদি ও আসল কথাটা লেখা আছে, সেই বইতে রদবদল করা ঠিক হয়নি। ‘আলস্য দোষের আকর’ লেখা থাকলে কী অসুবিধা ছিল, বুঝতে পারলাম না।

আমার কখনো পাঠশালায় যাওয়া হয়নি। ‘বাল্যশিক্ষা’ সেভাবে পড়া হয়নি। আমি পড়েছি ‘আদর্শ লিপি’। নানির কাছে গ্রামে থাকি। তিনি পুরনো আমলের মানুষ। তাঁদের আমলে মেয়েদের লেখাপড়ার তেমন চল ছিল না। আমার নানি বাড়িতে বসেই বাংলা পড়তে ও লিখতে শিখেছিলেন। আশপাশের বাড়ির মহিলারা তাঁর কাছে ‘বিষাদ সিন্ধু’ পাঠ শুনতে আসতেন। এই অসামান্য গ্রন্থটি পাঠ করতে করতে তিনি নিজে কাঁদতেন, অন্য মহিলারাও কাঁদতেন। নানির কাছে আমার হাতেখড়ি। তিনি ‘আদর্শ লিপি’ পড়াতেন। আর শ্লেটে একটা অক্ষর বড় করে লিখে দিয়ে বলতেন, ‘হাত ঘোরাও’। অর্থাৎ ওই অক্ষরটির ওপর দিয়ে বারবার লেখো। তাতে অক্ষরটি লেখা শেখা হয়ে গেল। অন্যদিকে অক্ষর চেনার সঙ্গে একটি করে নীতিকথা। ‘অসৎ সঙ্গ ত্যাগ কর’। অর্থাৎ খারাপ লোকের সঙ্গে মেলামেশা কোরো না। ‘ঝগড়া করিলে বিপদ ঘটে’। এই নীতিকথাটি নানি আমাকে বিশেষভাবে মুখস্থ করাতেন। নীতিকথাটির অর্থও প্রাঞ্জল ভাষায় বুঝিয়ে দিতেন। যাতে বাড়ির অন্য শিশুদের সঙ্গে ঝগড়া বিবাদ না করি, মারামারি না করি। আমি কাউকে মারলে সেও আমাকে মারবে। অন্যের হাতে মার খাওয়ার ভয়ে এই নীতিবাক্য আমি সারা জীবন মেনে চলেছি।

আমাদের পরের প্রজন্ম হয়তো ‘আদর্শ লিপি’ হাতে নিয়ে বড় হয়েছে। তারপর ধীরে ধীরে বইটি আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে গেছে। এই বই হাতে নিয়ে এখন আর কোনো শিশুর বর্ণ পরিচয় ঘটে না। এই বইয়ের নীতিকথাগুলো শিশুদের আর শেখানো হয় না। আসলে নীতিকথা ব্যাপারটিই আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে গেছে।

নীতিকথা কেন শিখতে হয়? নীতিকথা মনে রেখে বা মেনে কেন মানুষ জীবনের পথে চলে? চলে, মানুষের মতো মানুষ হওয়ার জন্য। চলে, নিজের জীবন সুন্দর করার জন্য। চলে, পরিবার, সমাজ ও দেশের মুখ উজ্জ্বল করার জন্য। আমাদের ছেলেবেলায় বা তারও পরের অনেকগুলো দিন পর্যন্ত দেখেছি, গুরুজনদের পায়ে হাত দিয়ে সালাম করলে সেই শ্রদ্ধেয়জনরা মায়াবী হাতখানি রাখতেন মাথায়। বলতেন, ‘মানুষ হও’। কেন বলতেন? আমরা তো মানুষই! আবার মানুষ হতে হবে কেন! মানুষ জন্মেই মানুষ হয় না। শিক্ষায়, জ্ঞানে, আচরণে আর এ রকম বহু মানবিক গুণাবলিতে তাকে মানুষ হতে হয়। আমার এক শিক্ষক বলতেন, ‘মানুষ হচ্ছে সে, যার মান এবং হুঁশ আছে।’ অর্থাৎ যার সম্মানবোধ আছে, আর যে সচেতন। আমাদের শিক্ষক আর গুরুজনরা এই তথ্য জানতেন। আজকাল গুরুজনদের তেমন করে আর কেউ পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে না। গুরুজনরাও আর মানুষ হওয়ার কথা সেভাবে বলেন না। আমরা সবকিছুই ভুলতে বসেছি।

আমার সঙ্গে গেণ্ডারিয়া হাই স্কুলে পড়ত শাহজাহান। তখন আমরা ক্লাস নাইনে পড়ি। শাহজাহান দুর্ধর্ষ মাস্তান হয়ে উঠেছে। ’৬৯ সালের কথা। গেণ্ডারিয়া স্টেশনের কাছে ডিআইটি প্লট। শাহজাহানদের বাড়ি বোধহয় ওইদিকটাতেই। আমাদের অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার নজরুল স্যারের বাড়িও ওইদিকে। পাড়ায় কিছু একটা গণ্ডগোল করেছে শাহজাহান। স্যারের কাছে বিচার গেছে। পরদিন ক্লাসে এসে শাহজাহানকে ডাকলেন স্যার। তাঁর হাতে জোড়া বেত। আমরা সবাই দম বন্ধ করে বসে আছি। বিস্মিত চোখে দেখছি, শাহজাহানের মতো দুর্ধর্ষ ছেলেটি থরথর করে কাঁপছে। কাঁপতে কাঁপতে স্যারের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। স্যার বললেন, ‘হাত পাত’। শাহজাহান হাত পাতল। শপাং শপাং করে সেই হাতে কয়েকটা বাড়ি মারলেন স্যার। রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললেন, ‘আমার ছাত্র এমন হতে পারে না। বল, আর কোনো দিন তোর নামে বিচার আসবে?’

শাহজাহান শিশুর মতো আকুল হয়ে কাঁদছে। কাঁদতে কাঁদতে দুই হাতে স্যারের পা জড়িয়ে ধরল। ‘আমি আর কোনো দিন এমন করব না, স্যার। আমার নামে আপনার কাছে কোনো বিচার গেলে আপনি আমাকে পিটাতে পিটাতে মেরে ফেলেন, স্যার।’ স্যার গভীর মমতায় শাহজাহানকে টেনে তুললেন। মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, ‘যা বাবা, আর দুষ্টুমি করিস না।’ আমার জানা মতে তারপর আর কখনোই শাহজাহানের নামে নজরুল স্যারের কাছে কোনো বিচার যায়নি।

আজকাল কি এ রকম ঘটনা সম্ভব? আজকাল তো শুনি ক্লাস সেভেনের ছাত্র হেড স্যারকে মারার জন্য চেয়ার তোলে। দুজন ছাত্রকে শাসন করেছেন স্যার, সে কারণে স্যারের মোটরসাইকেলটা পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। স্যারকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে তাঁর রুমে। শিক্ষককে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করছে ছাত্ররা। এ রকম ঘটনা আমরা কোনো দিন শুনিনি। ছাত্রদের কাছে শিক্ষকরা ছিলেন দেবতার মতো। শিক্ষকদের কাছে ছাত্ররা ছিল সন্তানের মতো। সেই অসামান্য সম্পর্কটি কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে! এসব ক্ষেত্রে শুধু ছাত্রদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। আমাদের অনেক শিক্ষকও নষ্ট হয়ে গেছেন। শিক্ষক আর সেই আগের শিক্ষক নেই। আমি ঢালাওভাবে বলছি না। কারো কারো কথা বলছি। শিক্ষকদের অনেক দুর্নীতি আর চরিত্রহীনতার, অনৈতিকতার কথা আমাদের কানে আসে। ছাত্র আর শিক্ষকের যে সম্পর্ক দেখে আমরা বড় হয়েছি, তার লেশমাত্র এখন আর চোখে পড়ে না।

‘আদর্শ লিপি’র কথায় ফিরি। আমাদের শৈশব বর্ণিল আলোয় ভরিয়ে দিয়েছিল এই বইটি। নানি আমাকে বর্ণ চেনাচ্ছেন, সঙ্গে একটি করে নীতিকথা মুখস্থ করাচ্ছেন। কোনো কোনো নীতিকথার অর্থ বুঝি না। নানি বুঝিয়ে দিচ্ছেন। বইয়ের শেষদিকে ‘শতকিয়া’ বলে একটি পৃষ্ঠা আছে। এক থেকে এক শ পর্যন্ত গণনা করতে শেখায়। তারপর আছে গুণের নামতা। আমাদের সময়কার কোন শিশুটি আছে যে, দুলে দুলে ‘আদর্শ লিপি’ থেকে নামতা মুখস্থ করেনি? তারপর আছে ইংরেজি বড় হরফের এ বি সি ডি। বড় ও ছোট হাতের হস্তলিপির অক্ষর। ছোট হাতের ছাপার অক্ষর, রোমান সংখ্যা ইত্যাদি। আমরা একটু বড় হয়ে কে কোন ক্লাসে পড়ি, খাতার ওপর নামের পাশে তা লিখে রাখতাম রোমান সংখ্যায়। সকালবেলা উঠে হাত-মুখ ধুয়ে পড়তে বসা। তারপর স্কুলে যাওয়া। স্কুল থেকে ফিরে এসে সারা বিকেল খেলা। আজানের আগে আগে বাড়ি ফিরে পড়তে বসা। রাত ১০টার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়া। এই তো ছিল আমাদের ছেলেবেলা। এখনকার শিশুদের তো সেই রঙিন শৈশবটিই নেই। তিন বছর বয়স হয়ে সারেনি, স্কুলে দেওয়া হয়েছে। শিশুটির চেয়েও ভারী একটি বইয়ের ব্যাগ তার কাঁধে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার কোনো খেলার মাঠ নেই। টু-থ্রিতে পড়ার সময় থেকেই বাড়িতে প্রাইভেট টিউটর। সেভেন-এইটে পড়ার সময় কোচিং সেন্টার। ছুটির দিন বলে তাদের কিছু নেই। এখনকার ছেলেমেয়েদের জীবন বেঁধে দেওয়া হয়েছে জিপিএ ৫ নামের এক ফাঁদে। একদিকে অভিভাবকরা উঠেপড়ে লাগেন ছেলেমেয়ের জিপিএ ৫ পাওয়া নিয়ে। অদ্ভুত এক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হন তাঁরা। শিক্ষক আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোরও একই অবস্থা। এবার এসএসসির রেজাল্টে দেখলাম, কোনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শতভাগ শিক্ষার্থী জিপিএ ৫ পেয়েছে। পরে রহস্যটা জানা গেল। ওই প্রতিষ্ঠানগুলোর অপেক্ষাকৃত দুর্বল শিক্ষার্থীকে পরীক্ষাই দিতে দেওয়া হয়নি। বিস্ময়কর ব্যাপার! আমাদের কি সবই জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থী লাগবে? সামান্য কম মেধার শিক্ষার্থী দেশে থাকবেই না? রেজাল্ট খারাপ হলে কোনো কোনো অভিভাবক বাড়ির ছেলে বা মেয়েটির জীবন বিষিয়ে তোলেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিক্ষকরাও নিচ্ছেন এ ধরনের ভূমিকা। এই ভার নিতে না পেরে কোনো কোনো শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করছে। এ এক ভয়ংকর প্রবণতা। আসলে আমাদের ছেলেমেয়েরা ঠিকই আছে, নষ্ট হয়ে গেছি আমরা, অভিভাবকরা। চাপে ফেলে ফেলে লেখাপড়ার সুন্দর ও আকর্ষণীয় জগিটকে ছেলেমেয়েদের কাছে আমরা বিষিয়ে তুলেছি। এই অবস্থা থেকে বেরোবার পথ ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক, অভিভাবকদের সচেতনতা, শিক্ষাব্যবস্থার গলদগুলো দূর করা। শিক্ষা যেন আতঙ্কের জায়গা না হয়ে আনন্দের জায়গা হয়, এই মনোভাব তৈরি করা।

নীতিকথার কথা বলছিলাম। শিশুদের নীতিকথা শিক্ষা দেওয়া উচিত আমাদের প্রত্যেকেরই। সেই শিক্ষা এমনভাবে দিতে হবে, শিশুটি যেন তা অন্তরে ধারণ করে এবং সেই মতো চলতে শেখে। ছেলেবেলার শিক্ষা সারা জীবন মনে থাকে। নীতিকথার মধ্য দিয়ে বড় হওয়া মানুষ কখনোই বিপথে যেতে পারে না। কখনোই নষ্ট হতে পারে না। ‘আদর্শ লিপি’ থেকে শেখা একটি পদ্য দিয়ে এই লেখা শেষ করছি। আমরা প্রত্যেকেই যেন প্রতিদিন ঘুম ভাঙার পর এই পদ্যের প্রথম লাইন দুটো মনে করি।

‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি,

সারাদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights