নীলফামারীর বিএনপিতে হাইব্রিডদের দাপটে ত্যাগীরা কোণঠাসা,এক মিরুকে ঘিরে তৃণমূলে বাড়ছে ক্ষোভ
ক্রাইম রিপোর্টার।।নীলফামারী সদর উপজেলার সংগলশী ইউনিয়ন বিএনপিতে ‘ত্যাগী বনাম হাইব্রিড’ বিতর্ককে কেন্দ্র করে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ ও ক্ষোভ বাড়ছে। দীর্ঘদিন দলের দুঃসময়ে মিছিল-মিটিং, আন্দোলন-সংগ্রাম এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা নেতাকর্মীদের অভিযোগ—সুসময় আসার পর তাদের অনেকেই এখন সাংগঠনিকভাবে কোণঠাসা। বিপরীতে অতীতে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ থাকা কিছু ব্যক্তি বর্তমানে বিএনপির রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে সংগলশী ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান টিকেন্দ্রজিৎ রায় মিরুর নাম।
স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতাকর্মীর অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে মিরু ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে চলাফেরা করতেন। আওয়ামী লীগের বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তাঁর উপস্থিতি ছিল বলেও দাবি করেন তারা। এমনকি আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কর্মসূচি সফল করতে অর্থ, লোকবলসহ বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করার অভিযোগও রয়েছে বলে দাবি তৃণমূল নেতাকর্মীদের।
তাদের অভিযোগ, তৎকালীন সময়ে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা আসাদুজ্জামান নূরের বিভিন্ন কর্মসূচিতে মিরুর উপস্থিতি দেখা যেত। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রভাব দেখিয়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হতো বলেও অভিযোগ করেন স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতা।
ক্ষমতার সময়ে আওয়ামী লীগের পাশে, এখন বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয়?
স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ যখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিল, তখন সংগলশী ইউনিয়নে বিএনপির নেতাকর্মীদের জন্য রাজনৈতিক পরিবেশ ছিল কঠিন। মামলা, হামলা, হয়রানি ও ক্ষমতাসীন দলের চাপের কারণে অনেক ত্যাগী নেতাকর্মী প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতে পারেননি।
তাদের দাবি, সেই সময়ে যারা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে ছিলেন, তারা নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে দলীয় কর্মসূচি পালন করেছেন। অথচ বর্তমানে তাদের অনেকের সাংগঠনিক মূল্যায়ন নেই।
অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ থাকা ব্যক্তিরা এখন বিএনপির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরির চেষ্টা করছেন—এমন অভিযোগে তৃণমূলে প্রশ্ন উঠেছে।
তাদের প্রশ্ন—“বিএনপির দুঃসময়ে যারা রাজপথে ছিলেন, তাদের জায়গা কোথায়? আর যারা ক্ষমতাসীনদের ছায়ায় ছিলেন, তারা কীভাবে এখন বিএনপির পরীক্ষিত নেতা হয়ে উঠছেন?”
ত্যাগীদের ক্ষোভ—রাজনীতি কি শুধু সুসময়ের জন্য?
সংগলশী ইউনিয়নের বিএনপির কয়েকজন তৃণমূল নেতাকর্মী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দলের দুঃসময়ে যারা মামলা-মোকদ্দমা, রাজনৈতিক চাপ ও হয়রানির ঝুঁকি নিয়ে মাঠে ছিলেন, নেতৃত্ব নির্ধারণের সময় তাদের রাজনৈতিক ত্যাগ ও ভূমিকা বিবেচনা করা উচিত।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিএনপি নেতা বলেন,
“দলের কঠিন সময়ে আমরা রাজপথে ছিলাম। তখন অনেকেই প্রকাশ্যে বিএনপির নাম নিতেও ভয় পেতেন। এখন পরিস্থিতি বদলেছে। যারা তখন ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে ছিলেন, তারাই যদি এখন বিএনপির বড় নেতা হওয়ার চেষ্টা করেন, তাহলে ত্যাগী নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হওয়াটাই স্বাভাবিক।”
আরেক নেতা বলেন,
“কার রাজনৈতিক অতীত কী ছিল, সেটা যাচাই না করে কাউকে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বসানো হলে দলের তৃণমূলের মধ্যে বিভাজন আরও বাড়বে। নেতৃত্বের আগে সবার রাজনৈতিক ভূমিকা যাচাই করা প্রয়োজন।”
মিরুকে ঘিরে সংগলশীতে বাড়ছে অসন্তোষ
তৃণমূলের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, সাবেক চেয়ারম্যান টিকেন্দ্রজিৎ রায় মিরু বর্তমানে বিএনপির রাজনীতিতে নিজের অবস্থানকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করছেন। তাঁর অতীত রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও তিনি বিএনপিতে প্রভাবশালী অবস্থান তৈরির চেষ্টা করছেন—এমন অভিযোগ স্থানীয় নেতাকর্মীদের।
তাদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় কারা কোন ভূমিকায় ছিলেন, তা দলীয়ভাবে যাচাই করা উচিত। পুরোনো ছবি, ভিডিও, সংবাদ প্রতিবেদন, দলীয় কর্মসূচির তালিকা এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য যাচাই করলেই প্রত্যেকের রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া সম্ভব।
‘নৌকার রাজনীতি’র অভিযোগ, এখন বিএনপির পরিচয়!
স্থানীয় বিএনপির একটি অংশের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় মিরু নৌকার পক্ষে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ছিলেন এবং ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন কর্মসূচিতে সহযোগিতা করেছেন। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্থানীয় নেতাকর্মীরা যেসব তথ্য-প্রমাণের কথা বলছেন, সেগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
তৃণমূলের প্রশ্ন—রাজনৈতিক সুবিধা অনুযায়ী দল পরিবর্তনের সংস্কৃতি যদি প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন কোথায় থাকবে?
তাদের দাবি, অতীত রাজনৈতিক ভূমিকা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে কারও বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা নয়, বরং তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ মূল্যায়ন করতে হবে।
দলীয় নেতৃত্বের কাছে তৃণমূলের দাবি,সংগলশী ইউনিয়নের তৃণমূল বিএনপির নেতাকর্মীরা চান, ব্যক্তিগত প্রভাব বা আর্থিক সক্ষমতা নয়—দলের প্রতি দীর্ঘদিনের আনুগত্য, আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং দুঃসময়ে নেতাকর্মীদের পাশে থাকার ইতিহাসকে নেতৃত্বের প্রধান মাপকাঠি করা হোক।
তাদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিএনপির রাজনীতিতে কারা সক্রিয় ছিলেন এবং কারা ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে ছিলেন—তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হোক।
একই সঙ্গে দলের দুঃসময়ের ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করে সাংগঠনিকভাবে তাদের যথাযথ জায়গা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে টিকেন্দ্রজিৎ রায় মিরু কাছে জানতে চাইলে
তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
পরবর্তীতে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।
