নোয়াখালীতে আদালতের আদেশ অমান্য করে পাকা দালান নির্মাণ, হুমকিতে এলাকায় যেতে পারছেন না জমির মালিক

নোয়াখালী প্রতিনিধি
নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলায় জেলা জজ আদালতের আদেশ অমান্য করে বিরোধপূর্ণ একটি জমিতে পাকা দালান নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে বিএনপি নামধারী মো. নুর উদ্দিনের (৫০) বিরুদ্ধে। অথচ আদালতের নির্দেশে কবিরহাট থানার একজন কর্মকর্তা সরেজমিন গিয়ে ওই ব্যক্তিকে বিরোধপূর্ণ জমিতে কোন ধরণের স্থাপনা নির্মাণের চিঠি দিয়ে এসেছিলেন। চিঠি পাওয়ার পর অভিযুক্ত নুর উদ্দিন ভবনের ছাদের ঢালাইও শেষ করেছেন রাতের অন্ধকারে। বর্তমানে নুর উদ্দিন ও তাঁর সন্ত্রাসী বাহিনীর হুমকিতে জমির মালিকের পরিবারের সদস্যরাও ওই এলাকায় যেতে পারছেন না।

গত ১৮ মার্চ নোয়াখালী সদর অতিরিক্ত ১ম আদালতের সহকারী জজ নিশি আক্তার নালিশি জমিতে কোন পক্ষই যাতে কোন ধরণের স্থাপনা নির্মাণ এবং প্রকৃতি পরিবর্তন না করতে না পারে তা পর্যবেক্ষণ ও তদারকির জন্য কবিরহাট থানাকে আদেশ দেন।

গত রোববার দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার ধানসিঁড়ি ইউনিয়নের নলুয়া গ্রামের ল্যাংড়ার দোকান এলাকার একটি কাঁচা সড়কের পাশের একটি নিচু জমির কিছু অংশ ভরাট করে সেখানে ইটের তৈরী পাকা দালান তৈরী করা হচ্ছে। আশেপাশের জমিতে থেকে মাটি কেটে ঘরের ভিটি বাঁধানো হয়েছে। দালান নির্মাণের কাজ করছিলেন কয়েকজন নির্মাণ শ্রমিক। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলেন, গত মাস খানেক ধরে তাঁরা চুক্তিতে সেখানে দালান নির্মাণের কাজটি করছেন। মানুষজনের কাছ থেকে শুনেছেন জমির মালিকানা নিয়ে দালান নির্মাণকারী নুর উদ্দিনের সঙ্গে এক ব্যক্তির বিরোধ রয়েছে। গত প্রায় দুই সপ্তাহ আগে (২২ মার্চ) কবিরহাট থানা থেকে পুলিশ এসে কাজ বন্ধ রাখতে বলেছেন। কিন্তু নুর উদ্দিন তাদের কাজ বন্ধ রাখতে বলেননি, তাই তারাও কাজ চালিয়ে গেছেন। সর্বশেষ গত শুক্রবার (৪ এপ্রিল) দিবাগত রাতে তারা দালানের ছাদের ঢালাই দিয়েছেন। আদালতের আদেশের বিষয়ে তাঁরা কিছু জানেন না, যিনি দালান নির্মাণ করাচ্ছেন তিনিও তাঁদের কিছু বলেননি।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. শাহেদ মিয়া (৪৫) বলেন, তাঁরা ছোটকাল থেকে দেখে এসেছেন নলুয়া গ্রামের ওই জমিগুলো মো. সামছুল হক নামে এক আইনজীবীর। তিনি স্ব-পরিবারে জেলা শহর মাইজদীতে থাকেন। তাঁর ছেলে-মেয়েরা উচ্চশিক্ষিত হওয়ায় গ্রামে তেমন আসতেন না। বর্গাচাষীদের দিয়ে এই জমিগুলো চাষাবাদ করতেন। কিন্তু গত কিছুদিন ধরে জমিগুলো স্থানীয় নুর উদ্দিন নামে এক ব্যক্তি তাঁর দাবি করে দখল শুরু করেছেন। এরই মধ্যে তিনি জমির কিছু অংশ মাটি ভরাট করে সেখানে নতুন একটি দালানও নির্মাণ করছেন। এলাকার কেউ ভয়ে এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন না।মো. সামছুল হক বলেন, তিনি বিগত ১৯৯০ সালের ২৪ মার্চ তারিখের ৪২৩৭ নম্বর দলিল এবং ১৯৯৫ সালের ৬৬৬০ নম্বর দলিলমূলে দুই একর ৫০ শতাংশ জমি কিনেন। এর পর থেকে তিনি ওই জমি ভোগদখল করে আসছেন। জমির যাবতীয় খাজনাও পরিশোধ করছেন নিয়মিত। কিন্তু বিগত ২০১৮ সালে ওই এলাকার বাসিন্দা নুর উদ্দিন হঠাৎ জমিটি তাঁর বলে দাবি করেন এবং দলবল নিয়ে তাঁর জমির ফসল নষ্ট করেন। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদে তিনি অভিযোগ করলে নুর উদ্দিন তাঁর মালিকানার পক্ষে কোন কাগজপত্র উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হন। তখন থেকে এ নিয়ে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে।

সামছুল হকের ছেলে এহছানুল হক বলেন, নুর উদ্দিন এক সময় স্থানীয়ভাবে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করতেন। সরকার পরিবর্তনের পর তিনি বিএনপির লোকজনের সাথে হাত মিলিয়ে নিজেও বিএনপির লোক পরিচয় দেন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গত ১ মার্চ তিনি দলবল নিয়ে তাঁদের জমি দখল করে সেখানে দালান নির্মাণ শুরু করেন। তিনি ঘটনাস্থলে গিয়ে তাঁকে কারণ জিজ্ঞেস করলে নানা হুমকি-ধমক দিয়ে তাঁকে এলাকা ছাড়া করেন। পরে তাঁরা আদালতে বিষয়টি উপস্থাপন করলে আদালত থেকে মামলার নিস্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ওই জমিতে কোন ধরণের স্থাপনা নির্মাণ না করার আদেশ দেওয়া হয়।

আদালতের আদেশ অমান্য করে স্থাপনা নির্মাণ অব্যাহত রাখার বিষয়ে জানতে চাইলে নুর উদ্দিন বলেন, পুলিশ তাঁকে কাজ বন্ধ রাখতে বলেছিল, কিন্তু আদালতের আদেশের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। নুর উদ্দিন দাবি করেন, ওই জমিটি তাঁর পৈত্রিক। তাঁরা বয়া সূত্রে মালিক। মালিকানা নিয়ে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে।

কবিরহাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শাহিন মিয়া বলেন, আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী থানা থেকে পুলিশ গিয়ে নির্মাণকাজ বন্ধ করেছে এবং উভয়পক্ষকে স্থিতাবস্থা বজায় রাখাতে নোটিশ প্রদান করে। কিন্তু মামলার বিবাদী নুর উদ্দিন আদালতের আদেশ অমান্য করে বিরোধপূর্ণ ভূমিতে স্থাপনা নির্মাণ অব্যাহত রাখেন। যার সত্যতা তাঁরা পেয়েছেন। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে তাঁরা বিষয়টি প্রতিবেদন আকারে আদালতকে অবহিত করবেন। আদালতের নির্দেশনার আলোকে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights