ন্যাটো ভাঙলে যুক্তরাষ্ট্র টিকবে কি?

অনলাইন ডেস্ক

ডোনাল্ড ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের ন্যাটো বিরোধী অবস্থান এবং ইরানের সাথে সাম্প্রতিক যুদ্ধের জেরে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর ভবিষ্যৎ এখন এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তনের পর থেকেই জোটের অভ্যন্তরীণ কোন্দল চরম আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে ইউরোপীয় মিত্ররা ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযানে অংশ নিতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানানোর পর থেকে ওয়াশিংটন ও ব্রাসেলসের মধ্যকার সম্পর্কের ফাটল এখন আর গোপন কোনো বিষয় নয়। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কয়েক দশকের পুরোনো এই সামরিক জোট এখন তার ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন টিকে থাকার লড়াইয়ের মুখোমুখি হয়েছে।

চলতি সপ্তাহে ট্রাম্প ইউরোপীয় মিত্রদের এই সিদ্ধান্তকে জোটের গায়ে এক অমোচনীয় কলঙ্ক হিসেবে অভিহিত করেছেন। জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির কথা স্বীকার করে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, বর্তমান সংঘাত ট্রান্স-আটলান্টিক সম্পর্কের ওপর চরম চাপ সৃষ্টি করেছে। এই বাদানুবাদের কেন্দ্রস্থলে এখন একটিই মূল প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে আর তা হলো, যদি যুক্তরাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত নিজেকে এই জোট থেকে সরিয়ে নেয়, তবে ন্যাটো কি আদৌ টিকে থাকতে পারবে। যদিও ন্যাটোর প্রতি এখনও মার্কিন আইনপ্রণেতাদের বড় অংশের সমর্থন রয়েছে, তবুও জোটের প্রধান স্তম্ভ হিসেবে আমেরিকার ভূমিকা নিয়ে এখন বিশ্বজুড়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।

আইনি জটিলতার কারণে ট্রাম্প চাইলেই হুট করে ন্যাটোর সদস্যপদ ত্যাগ করতে পারবেন না কারণ এর জন্য মার্কিন সিনেটের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অথবা কংগ্রেসের বিশেষ আইনের প্রয়োজন হয়। তবে আইনত জোট ছাড়তে না পারলেও ট্রাম্পের হাতে জোটকে অকার্যকর করে দেওয়ার মতো আরও অনেক কৌশল রয়েছে। ন্যাটো চুক্তির অনুচ্ছেদ ৫ অনুযায়ী কোনো সদস্য দেশ আক্রান্ত হলে সম্মিলিত প্রতিরক্ষার বাধ্যবাধকতা থাকলেও, এটি কোনো দেশকেই সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য করে না। ইউরোপীয় দেশগুলোর বড় ভয় হলো, কোনো সংকটের মুহূর্তে ওয়াশিংটন হয়তো তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আর এগিয়ে আসবে না।

সামরিক সক্ষমতার দিক থেকেও যুক্তরাষ্ট্র জোটের ওপর প্রভাব বিস্তার করার অনেক সুযোগ রাখে। বর্তমানে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রায় ৮৪ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে যারা দীর্ঘকাল ধরে মহাদেশটির নিরাপত্তার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। সম্প্রতি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে যে ট্রাম্প ইউরোপ থেকে মার্কিন ঘাঁটিগুলো সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন এবং যেসব দেশ ইরান যুদ্ধে তাকে সহায়তা করেনি, তাদের ওপর থেকে সামরিক নিরাপত্তা সরিয়ে নেওয়ার কথা ভাবছেন। মার্কিন সামরিক সমন্বয় বন্ধ হয়ে গেলে ন্যাটোর বিশ্বাসযোগ্যতা শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে বলে কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার পর থেকে ইউরোপীয় দেশগুলো তাদের প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগ অনেকটা বাড়িয়েছে এবং ২০২৫ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষা ব্যয় প্রায় ৬২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও গোয়েন্দা নজরদারি, উপগ্রহ যোগাযোগ এবং দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ইউরোপ এখনও পুরোপুরি পেন্টাগনের ওপর নির্ভরশীল। ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের রিপোর্ট অনুযায়ী, আমেরিকার এই শূন্যস্থান পূরণ করতে ইউরোপের অন্তত এক ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ এবং এক দশকের বেশি সময় প্রয়োজন হবে। নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এই ধীরগতি ইউরোপকে এক চরম প্রতিকূল পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিয়েছে।

এত সংকটের মধ্যেও কেউ কেউ অবশ্য আশার আলো দেখছেন এবং তারা মনে করেন ন্যাটোর একটি ইউরোপীয় সংস্করণ গড়ে তোলা সম্ভব। সুইডিশ ইনস্টিটিউট অফ ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের বিশ্লেষকদের মতে, ন্যাটো দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে ইউরোপীয় দেশগুলোর সামরিক সহযোগিতার একটি কাঠামো হিসেবে কাজ করেছে। যদি যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে সরিয়েও নেয়, তবুও ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেদের টিকে থাকার স্বার্থেই এই জোটকে ভিন্ন রূপে ধরে রাখবে। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য ন্যাটোর কাঠামোগত ভিত্তি বজায় রাখা ছাড়া ইউরোপের সামনে দ্বিতীয় কোনো সহজ পথ খোলা নেই।

এদিকে রাশিয়ার দিক থেকে আসা সামরিক হুমকির বিষয়টিও এখন সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। জার্মানির সামরিক প্রধান জেনারেল কারস্টেন ব্রুয়ের গত বছরই সতর্ক করেছিলেন যে ২০২৯ সালের মধ্যে মস্কো ন্যাটোর ভূখণ্ডে হামলা করার মতো শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে। অনেক প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞের মতে এই সময়সীমা ২০২৭ সালের মতোই খুব কাছে হতে পারে এবং সে কারণেই ন্যাটোর প্রতিটি সদস্য দেশকে দ্রুত সামরিক সরঞ্জামে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাশিয়ার সম্ভাব্য আগ্রাসন মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্রবিহীন ন্যাটো কতটা কার্যকরী হবে, তা নিয়ে এখন বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

এটিও অনস্বীকার্য যে ন্যাটো থেকে বের হয়ে যাওয়া কেবল ইউরোপের জন্য নয় বরং যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও ক্ষতিকর হতে পারে। যদিও ট্রাম্প দাবি করেন যে ন্যাটো কেবল ইউরোপের স্বার্থ রক্ষা করে, কিন্তু ইতিহাস বলছে ৯/১১ হামলার পর ন্যাটোই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রের পাশে দাঁড়িয়েছিল এবং আফগানিস্তানে হাজার হাজার ইউরোপীয় সেনা প্রাণ হারিয়েছে। তাছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক অভিযানের জন্য ইউরোপের ঘাঁটিগুলো অত্যন্ত কৌশলগত ভূমিকা পালন করে আসছে। ফলে ন্যাটো ভেঙে যাওয়া মানে কেবল ইউরোপের অরক্ষিত হওয়া নয় বরং বিশ্বমঞ্চে আমেরিকার একচ্ছত্র প্রভাব ও মিত্র হারানোর নামান্তর মাত্র।

আল জাজিরার বিশ্লেষণ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights