পরমাণু সক্ষমতার পথে ইরান?

অনলাইন ডেস্ক

দশকব্যাপী পশ্চিমা অবরোধ এবং সাম্প্রতিক বিধ্বংসী সংঘাতের মুখে দাঁড়িয়ে ইরান তার কৌশলগত অবস্থানে এক আমূল পরিবর্তন এনেছে। ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের ‘পারমাণবিক জুজু’ শেষ পর্যন্ত বাস্তব রূপ নিতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। গত মাসে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি ঘোষণা করেছেন, তেহরান এখন থেকে তার পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিকে জাতীয় সম্পদ হিসেবে রক্ষা করবে। দীর্ঘকাল শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের কথা বললেও, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ইরানকে এই কঠোর পথে হাঁটতে বাধ্য করেছে।

পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন আধিপত্যের অবসান ঘটেছে দাবি করে আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি বলেছেন, ওয়াশিংটন এই অঞ্চলে লজ্জাজনক পরাজয় বরণ করেছে। ‘জাতীয় পারস্য উপসাগর দিবস’ উপলক্ষে দেওয়া এক বার্তায় তিনি জানান, হরমুজ প্রণালী এবং এই জলসীমায় এখন এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, হাজার মাইল দূর থেকে আসা বহিরাগতদের আর এই অঞ্চলের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করতে দেওয়া হবে না।

ইরান এখন হরমুজ প্রণালীতে নতুন আইনি কাঠামো ও ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি চালুর ঘোষণা দিয়েছে। এই নতুন ব্যবস্থার আওতায় প্রতিবেশী দেশগুলোকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিচ্ছে তেহরান। গত ২ মে ইরান ঘোষণা করেছে যে, যুদ্ধকালীন ক্ষতিপূরণ প্রদান না করা পর্যন্ত কোনো ইসরায়েলি জাহাজকে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে যেতে দেওয়া হবে না। ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মতে, হরমুজ প্রণালী বর্তমানে তেহরানের হাতে থাকা একটি “পারমাণবিক বোমার সমতুল্য” দরকষাকষির হাতিয়ার।

২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার সংঘর্ষে দেশটির শীর্ষ নেতৃত্ব হারানোর পর মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক সমীকরণ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপর। দেশটি আকস্মিকভাবে তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংগঠন ওপেক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আবুধাবির এই সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যের পুরনো মিত্রদের মধ্যে ফাটল এবং মার্কিন নিরাপত্তার ওপর অনাস্থার বিষয়টিই স্পষ্ট করে তুলছে।

আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ খোলাখুলিভাবেই বলেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করার দিন শেষ হয়ে গেছে। তার মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি তার নিজের দেশকেই রক্ষা করতে না পারেন, তবে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে কীভাবে নিরাপত্তা দেবেন? এই সংশয় থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখন নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে।

কূটনৈতিক ফ্রন্টে তেহরান এখন মস্কো এবং বেইজিংয়ের দিকে ঝুঁকছে। সম্প্রতি ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সেন্ট পিটার্সবার্গে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। পুতিন এই অঞ্চলে দ্রুত শান্তি ফেরানোর স্বার্থে ইরানকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন। একই সঙ্গে আরাঘচি চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-র সাথেও বৈঠক করেছেন, যা এই সংকটে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের ইঙ্গিত দেয়।

বর্তমানে পাকিস্তান ও ওমানের মধ্যস্থতায় তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে আলোচনার চেষ্টা চললেও তা অচলাবস্থায় রয়েছে। ইরান শর্ত দিয়েছে যে, হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া এবং পরমাণু আলোচনার আগে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে। সেই জব্দকৃত অর্থ ফেরত এবং সামরিক আগ্রাসন বন্ধের গ্যারান্টি চেয়েছে তারা। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের এই প্রস্তাবকে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

সংকট সমাধানে কূটনীতি এখন এক অন্ধগলিতে আটকে আছে। ট্রাম্প প্রশাসন বারবার যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ালেও তেহরানের দাবিগুলোকে ‘আত্মসমর্পণের প্রস্তাব’ হিসেবে অভিহিত করে প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। বিশ্লেষকদের মতে, এই অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে ভয়াবহ অস্থিরতা তৈরি হতে পারে, যার প্রভাব পড়বে ভারতসহ সারা বিশ্বের অর্থনীতিতে।

আরটির বিশ্লেষণ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights