পর্যটন সংকটে নীলফামারী নীলসাগর

আবদুল বারী, নীলফামারী
এক সময়কার ‘বিন্নাদিঘি’ আজকের ‘নীলসাগর’। ইতিহাস, লোককথা আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপূর্ব সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই বিশাল দীঘি একসময় ছিল ভ্রমণপিপাসুদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাবে সেই আকর্ষণ এখন অনেকটাই কমে গেছে।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ঐতিহ্যের নীলসাগরকে ঘিরে রয়েছে বিশাল সম্ভাবনা। প্রয়োজন শুধু পরিকল্পিত উন্নয়ন, পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ও বিনোদনের ব্যবস্থা। এসব নিশ্চিত করা গেলে দেশ-বিদেশের পর্যটকদের আগমন বাড়বে, মুখর হয়ে উঠবে পুরো এলাকা।

জেলা শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে গোড়গ্রাম ইউনিয়নের ধোপাডাঙ্গা গ্রামে অবস্থিত নীলসাগর। এর আয়তন প্রায় ৫৩ দশমিক ৯০ একর। এর মধ্যে প্রায় ৩৩ একরজুড়ে বিস্তৃত জলরাশি, যার গভীরতা ৩০ থেকে ৩২ ফুট। চারপাশে সবুজে ঘেরা পাড়, উঁচু গাছপালা আর শান্ত পরিবেশ সব মিলিয়ে এটি সহজেই হয়ে উঠতে পারে একটি আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র।

জানা যায়, খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম থেকে নবম শতাব্দীর মধ্যে এ দীঘি খনন করা হয়। জনশ্রুতি রয়েছে, মহাভারতের পাণ্ডবদের বনবাসের সময় পানির চাহিদা পূরণে বৈদিক রাজা বিরাট এই দীঘি খনন করেছিলেন। সেই সূত্রে এর নাম হয়েছিল ‘বিরাট দীঘি’। পরবর্তীতে এটি ‘বিন্না দীঘি’ নামে পরিচিতি পায়। আবার অনেকে মনে করেন, রাজার কন্যা বিন্নাবতীর নামানুসারেই ‘বিন্নাদিঘি’ নামটি প্রচলিত হয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭৯ সালে আধুনিকায়নের মাধ্যমে জেলার নাম অনুসারে এর নামকরণ করা হয় ‘নীলসাগর’।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এই স্থানটি পাখির অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষিত হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন।পর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং আধুনিক সুযোগ-সুবিধার ঘাটতির কারণে এখানে সারা বছর পর্যটকের উপস্থিতি খুবই কম।

দর্শনার্থী মিজানুর রহমান বলেন, নীলসাগরে ঘুরতে এসে দেখলাম একটি বিনোদন কেন্দ্র যে রকম হওয়া দরকার সে রকমন নয়। বর্তমানে আধুনিক যুগে নীলসাগরের তেমন কোন উন্নয়ন হয়নি। এখানে পর্যাপ্ত শৌচাগারের অভাব রয়েছে। বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থাও অপ্রতুল। মানসম্মত খাবারের ক্যান্টিন না থাকায় দূর-দূরান্ত থেকে আসা পর্যটকদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। পরিবার নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে সময় কাটানোর মতো পরিবেশ না থাকায় অনেকেই হতাশ হয়ে ফিরে যান।

দর্শনার্থী রকিবুল আলম বলেন, শিশুদের জন্য কোনো বিনোদন ব্যবস্থা না থাকাও একটি বড় সীমাবদ্ধতা। তারা মনে করেন, আধুনিক পার্ক, বিনোদন কেন্দ্র কিংবা আকর্ষণীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে নীলসাগর আবারও প্রাণ ফিরে পেতে পারে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী আদিলুর রহমান বলেন, পর্যটকের অভাবে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও আর্থিক সংকটে পড়েছেন। তাদের আশা,পর্যটক বাড়লে ব্যবসা-বাণিজ্যও সচল হবে, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে গতিশীল করবে। তবে নীলসাগরকে ঘিরে ইতোমধ্যে কিছু উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এসব কাজ সম্পন্ন হলে এখানে পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে। স্থানীয় প্রশাসনের দাবি, পরিকল্পিত উন্নয়ন, পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা এবং বিনোদনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে নীলসাগর দেশের একটি অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে।

নীলফামারী জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নায়িরুজ্জামান বলেন, সারাবছর পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে নীলসাগরকে ঘিরে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে নানা উন্নয়মূলক কাজ। কাজ শেষ হলে পর্যটকের সংখ্যা বাড়বে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights