পশ্চিমবঙ্গে চিনির দাম বেড়ে ৬৫ থেকে ৭০ রুপি, রাজ্যজুড়ে অভিযান

কলকাতা প্রতিনিধি
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে হঠাৎ করেই দাম বেড়েছে চিনির। প্রতিকেজি চিনির সর্বোচ্চ দাম ৭০ রুপিতেও পৌঁছেছে। অথচ দুই সপ্তাহ আগেও এই দাম ছিল ৪৮ রুপিতে। পরিসংখ্যান বলছে, সারা দেশে মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে চিনির দাম বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ।

বিষয়টি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে তোলপাড় শুরু হয়েছে। দাম বৃদ্ধির কারণ যাই হোক, এতে অসুবিধায় পড়েছেন সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষ। চিনি ছাড়া সকালের চা বা কফি যেমন গরম হবে না। তেমনি উৎসব, পার্বণ, মিষ্টির দোকানও চিনি ছাড়া কার্যত অচল। ফলে বাজারে গিয়ে চিনি কিনতে গিয়ে বিপাকে পড়ছেন তারা।

চিনির দাম বৃদ্ধির পেছনে দুইটি কারণ উঠে আসছে। চিনি প্রস্তুতকারকদের সংগঠন ইসমা’র দাবি, খারাপ আবহাওয়ার জন্য আখ চাষে ক্ষতি, উৎপাদন কমে যাওয়া, জোগানের তুলনায় চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি, দাম বৃদ্ধির কারণ মূলত ফাটকাবাজির লক্ষ্যে বেআইনি মজুতদারি।

আরেকটি পক্ষ বলছে, এর পেছনে রয়েছে দেশজুড়ে তোলপাড় তোলা ইথানল-বিতর্ক। ইরান ও রাশিয়ার যুদ্ধের প্রভাবে পেট্রলে ২০ শতাংশ পর্যন্ত ইথানল মেশানোর অনুমতি দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। এই ইথানল তৈরিতে প্রয়োজন চিনি। চিনি ব্যবসায়ীদের একাংশ বলছেন, চলতি বছরে ৩২ লাখ মেট্রিক টন চিনি ইথানল তৈরিতে ব্যবহৃত হয়েছে।

বিরোধীদের অভিযোগ, পেট্রলে ইথানল মেশাতে গিয়ে দেশের খাদ্য সুরক্ষার সঙ্গে আপস করছে কেন্দ্র। যদিও কেন্দ্রের দাবি, চিনির দাম বাড়ার সঙ্গে ই-২০ পেট্রোল তৈরির কোনো সম্পর্ক নেই। দেশটির খাদ্য মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইথানল তৈরির জন্য চিনির ব্যবহার সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কমানো হচ্ছে। ২০২২-২৩ সালে ১২ শতাংশ চিনি ব্যবহার করা হতো ইথানল তৈরির জন্য। ২০২৫-২৬ সালে তা কমে হয়েছে ৯ শতাংশ। তাছাড়া, তিন-চতুর্থাংশ ইথানলই তৈরি হয় ভুট্টার মতো দানাশস্য থেকে।

এ অবস্থায় কালোবাজারি রুখতে গতকাল সোমবার সন্ধ্যা থেকে শুরু করে মঙ্গলবারও বিভিন্ন সময়ে কলকাতার হাতিবাগান, গড়িয়াহাট মার্কেট, হাওড়া, চুঁচুড়া, চন্দননগর, ব্যান্ডেল, রানাঘাট, ডায়মন্ড হারবার, কাটোয়া, শিলিগুড়ি, ঝাড়গ্রাম, কালনা পুরুলিয়া, ব্যারাকপুরসহ একাধিক বাজারে ‘এনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চ’ (ইবি)-এর অভিযান পরিচালনা করা হয়।

বাজারগুলোতে মুদিদোকানে গিয়ে কর্মকর্তারা চিনির দামে, চিনির মজুতের পরিমাণ, পাইকারি ও খুচরা দামের বিষয়ে তদারকি করছেন। হাওড়ার কদমতলায় চিনির গোডাউনে অভিযান পরিচালনা করেছে ইনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চ, খাদ্য দফতর ও পুলিশ কর্মকর্তারা। বর্তমানে খোলা বাজারে মান অনুযায়ী প্রতিকেজি চিনি বিক্রি হচ্ছে ৬৫ থেকে ৭০ রুপিতে।

চিনি বিক্রেতা ধর্মেন্দ্র সাউ জানান, ‘তদন্তকারী কর্মকর্তারা এসে অভিযান চালিয়ে গেছেন। আমাদের বলা হয়েছে, চিনি বেশি মজুত রাখা যাবে না। আমি প্রতিকেজি চিনি ৬২.৫০ রুপিতে কিনছি এবং ৬৩.৫০ রুপিতে বিক্রি করছি।’

জেলা ইনফোর্সমেন্ট ব্রাঞ্চ-এর ইন্সপেক্টর শ্রাবণী রায় বলেন, ‘জিনিসপত্রের দাম যাতে আর বেশি না বাড়ে সে কারণে এই অভিযান। চিনির আমদানিতে দাম বাড়ায় খুচরো বাজারে দাম বেড়েছে। তারপরেও জনসাধারণ যাতে কিনতে পারে, সেটা নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য।’

হাওড়া সিটি পুলিশের ডিসি সেন্ট্রাল তৌসিফ আলি আজাহার জানিয়েছেন, ‘চিনির দাম বেড়েছে। সাপ্লাই কম আছে। কী ঠিক আর কী সঠিক নয়, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

পশ্চিম বর্ধমান জেলার জেলাশাসক এস পোন্নামবলম জানান, ‘নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম অত্যধিক বাড়ায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটির সদস্যরা মার্কেট ভিজিট করছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘চিনির দামও অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। কারবারিরা বলছেন, যেখান থেকে চিনি আসছে, সেখানেই দাম বাড়ানো হয়েছে। ফলে তাদেরও কিছু করার নেই। যদিও আমরা গোটা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights