পাকিস্তানের সঙ্গে ‘ন্যাটোর মতো’ চুক্তি, সৌদি গণমাধ্যমে উচ্ছ্বাস

অনলাইন ডেস্ক
(বাঁ থেকে) সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ, সৌদি ক্রাউন প্রিন্স ও দেশটির প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান এবং পাকিস্তান সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ আসিম মুনির। ছবি: সংগৃহীত

পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে দক্ষিণ এশিয়ার পরমাণু শক্তিধর পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্য তথা পশ্চিম এশিয়ার সৌদি আরব। এই চুক্তি নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে সৌদি আরবের গণমাধ্যম।

চুক্তি অনুযায়ী, যেকোনও এক দেশের ওপর আগ্রাসন মানেই উভয় দেশের বিরুদ্ধে হামলা হিসেবে গণ্য হবে।

মূলত এ কারণেই সৌদি-পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত নতুন এই প্রতিরক্ষা চুক্তিকে ‘ন্যাটোর মতো প্রতিরোধমূলক ছাতা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে সৌদি গণমাধ্যম।

তুর্কি সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ড এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।

সংবাদমাধ্যমটি বলছে, সৌদি আরবের সংবাদমাধ্যমগুলো রিয়াদ ও ইসলামাবাদের মধ্যে স্বাক্ষরিত কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তিকে ‘প্রতিরোধমূলক ছাতা’ হিসেবে বর্ণনা করেছে, যা উভয় দেশকে সীমাহীন সামরিক সক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ দেবে।

গত বুধবার রিয়াদে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স ও দেশটির প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ নিজ নিজ দেশের পক্ষে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।

সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ) প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “এই চুক্তির লক্ষ্য হলো- নিরাপত্তা জোরদার করা, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠা, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং যেকোনও আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যৌথ প্রতিরোধ শক্তি গড়ে তোলা।”

চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, “যেকোনও এক দেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসন মানে উভয় দেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসন।”

একজন জ্যেষ্ঠ সৌদি কর্মকর্তা বলেন, “এটি বহু বছরের আলোচনার ফসল। এটি কোনও নির্দিষ্ট দেশ বা ঘটনার প্রতিক্রিয়া নয়, বরং দীর্ঘদিনের গভীর সহযোগিতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া।”

তিনি আরও জানান, “এটি একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিরক্ষা চুক্তি, যা সব ধরনের সামরিক সক্ষমতা অন্তর্ভুক্ত থাকছে।”

সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান (ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের ছোট ভাই) এক্স-এ লিখেছেন, “সৌদি আরব ও পাকিস্তান… যেকোনও আগ্রাসীর বিরুদ্ধে এক ফ্রন্ট… সবসময় এবং চিরকাল।”

সৌদি দৈনিক ওকাজ লিখেছে, “ক্রাউন প্রিন্স ও পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন।” এ উপলক্ষে দেশটির বিভিন্ন শহরের টাওয়ারগুলোতে সৌদি ও পাকিস্তানি পতাকা আলোকিত করা হয়।

ওই পত্রিকায় একটি কলামে লেখক মুতেব আল আউয়াদ চুক্তিটিকে ‘ইসলামি ফ্রন্টের ঐতিহাসিক দুর্গ’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তার মতে, “সৌদির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে পাকিস্তানের পারমাণবিক প্রতিরোধশক্তি যুক্ত হয়ে আঞ্চলিক প্রতিরোধকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে।”

তিনি লেখেন, সৌদি আরবের অর্থনৈতিক শক্তি বৈশ্বিক জ্বালানি স্থিতিশীলতার গ্যারান্টি, উন্নত সামরিক সক্ষমতা তাকে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর অগ্রভাগে রেখেছে, আর ইসলামের পবিত্রতম স্থানগুলোর অভিভাবকত্ব তাকে দিয়েছে আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব।

আউয়াদ বলেন, ভিশন ২০৩০-এর কারণে সৌদি প্রতিরক্ষা শিল্প ও অস্ত্র উন্নয়নে দ্রুত অগ্রসর হয়েছে এবং এখন উপসাগর ও ইসলামী বিশ্বের সম্মুখ সারির প্রতিরক্ষা লাইনে দাঁড়িয়ে আছে।

অন্যদিকে পাকিস্তান হচ্ছে এমন পারমাণবিক শক্তিধর দেশ, যার বিশাল সেনাবাহিনী ও ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারের পাশাপাশি আরব সাগরের তীরে শক্ত অবস্থান রয়েছে। দেশটির জনসংখ্যা ও প্রতিরক্ষা শিল্পের অভিজ্ঞতা যৌথ প্রতিরক্ষা কাঠামোকে শক্তিশালী করেছে।

চুক্তিটি কার্যত ‘দ্বিপক্ষীয় যৌথ নিরাপত্তা ছাতা’ তৈরি করেছে, যাতে থাকবে যৌথ অভিযান পরিকল্পনা, গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগি, সামরিক মহড়া, নৌ ও বিমান সহযোগিতা এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের উন্নয়ন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মুনীফ আম্মাশ আল-হারবি সংবাদমাধ্যম আল-আরাবিয়াকে বলেন, চুক্তিটি উভয় দেশকে সীমাহীন সামরিক সক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ দিয়েছে এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পক্ষগুলোকে বার্তা দিয়েছে।

সৌদি আরবের বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফয়সাল আল-হামাদ বলেন, “এই চুক্তি ন্যাটোর নীতি অনুসরণ করেছে। আর তা হচ্ছে— এক দেশের ওপর আক্রমণ মানেই উভয় দেশের ওপর আক্রমণ।”

পাকিস্তানের সংবাদপত্রগুলোও এই প্রতিরক্ষা চুক্তিকে গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছে। সৌদি প্রেস এজেন্সি জানায়, চুক্তির পর ইসলামাবাদের আকাশচুম্বী ভবনগুলো সৌদি ও পাকিস্তানি পতাকায় আলোকিত করা হয়েছিল।

আল-রিয়াদ লিখেছে, “ক্রাউন প্রিন্স পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন।” আল-মাদিনা শিরোনাম দিয়েছে, “সৌদি ও পাকিস্তানের মধ্যে কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তি।”

এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো কাতারের রাজধানী দোহায় ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলার মাত্র এক সপ্তাহ পর। সে ঘটনায় পাঁচজন হামাস শান্তি-আলোচক ও একজন কাতারি নিরাপত্তা কর্মকর্তা নিহত হন। তখন কাতার, মিসর ও যুক্তরাষ্ট্র মিলে গাজায় যুদ্ধবিরতি ও বন্দি বিনিময় চুক্তির মধ্যস্থতা করছিল। সূত্র: টিআরটি ওয়ার্ল্ড

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights