পানি বাড়লেই বন্যা, কমলেই ভাঙন: আতঙ্কে তিস্তাপাড়ের লাখো মানুষ

রেজাউল করিম মানিক,লালমনিরহাট

রংপুর অঞ্চলের তিস্তাপাড়ে পানি বাড়লে বন্যা, আর কমলেই নদীভাঙন—এ দুই দুর্ভোগের মধ্যেই বছরের পর বছর বসবাস করছেন হাজারো মানুষ। চলতি মৌসুমেও একই চিত্র দেখা দিয়েছে। গতকাল বুধবার তিস্তার পানি বেড়ে বিভিন্ন চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হলেও আজ বৃহস্পতিবার সকাল থেকে পানি কমতে শুরু করেছে। তবে পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে নতুন করে নদীভাঙনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

লালমনিরহাট, রংপুর, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার তিস্তাপাড়ের বিস্তীর্ণ এলাকায় বন্যা ও ভাঙনের কারণে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। অনেক পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছে। পানিতে তলিয়ে গেছে রোপা আমনের ক্ষেত। দ্রুত পানি না নামলে ফসলের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন কৃষকেরা।

লালমনিরহাট সদর উপজেলার পশ্চিম হরিনচড়া গ্রামের কৃষক আব্দুল বাকি বলেন, বুধবার দিনভর নদীর পানি বাড়ায় তাদের বাড়িঘরে পানি ঢুকে পড়ে। বিকেলে গবাদিপশু নিয়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে হয়েছে। রোপা আমনের চারা পানিতে তলিয়ে গেছে। কয়েক দিনের মধ্যে পানি না নামলে ধানের ক্ষতি হবে।

গঙ্গাচড়া উপজেলার চর নেহালি গ্রামের কৃষক আকবর আলী বলেন, বুধবার রাতে আমার বাড়িতে হাঁটুসমান পানি ছিল। আমরা ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে চলে গেছিলাম। গত দেড় মাস ধরে তিস্তার পানি বারবার বাড়ছে-কমছে। পানি কমলেই নদীভাঙন শুরু হয়। এক মাসে এ গ্রামে প্রায় ২০০টি বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এখন আমার নিজের বাড়িও ভাঙনের মুখে।

কালীগঞ্জ উপজেলার শৈলমারী চর এলাকার কৃষক হযরত আলী বলেন, বুধবার পানিতে পুরো গ্রাম প্লাবিত হয়। ঘরের ভেতর পর্যন্ত পানি ঢুকে পড়ে এবং গ্রামের সব সড়ক তলিয়ে যায়। আজ সকাল থেকে পানি কমতে শুরু করেছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকাল ৬টায় ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি ছিল ৫২ দশমিক ১০ মিটার, যা বিপৎসীমার ৫ সেন্টিমিটার নিচে। সকাল ৯টায় পানি আরও ২ সেন্টিমিটার কমে। কাউনিয়া ও তারাপুর পয়েন্টেও তিস্তার পানি বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে বুধবার সকালে ডালিয়া পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ১৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের রংপুর অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবীব বলেন, উজানে নতুন করে পাহাড়ি ঢল না এলে তিস্তার পানি বাড়ার আশঙ্কা নেই। গত দেড় মাস ধরে তিস্তার পানি ওঠানামা করছে। এ অঞ্চলে সাধারণত স্বল্পমেয়াদি আকস্মিক বন্যা হয় এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পানি নেমে যায়।

তিনি জানান, চলতি বছরে রংপুর অঞ্চলে তিন দফা বন্যায় পাঁচ শতাধিক বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও নীলফামারী—এই পাঁচ জেলায় তৃতীয় দফার বন্যায় প্রায় ৯ হাজার ৬০০ হেক্টর জমির বিভিন্ন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

রংপুর কৃষি অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। তালিকা অনুযায়ী তাদের প্রণোদনা দেওয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Verified by MonsterInsights